বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ১০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। ইঞ্জিনগুলোতে যে ধরনের যন্ত্রাংশ সংযোজনের শর্ত দেওয়া হয়েছিল, তা যুক্ত না করেই সেসব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা তাই ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ না করে ফেরত পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু শর্ত পূরণ না করা নিম্নমানের ইঞ্জিনগুলোই নিতে চায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। এগুলো যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে উপযুক্ত কিনা মন্ত্রণালয় 'যাচাই করে' দেখতে বলেছে। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, যাচাইয়ের নামে ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, লোকোমোটিভগুলোতে দরপত্রের কারিগরি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান (ক্যাপিটাল কম্পোনেন্ট) ইঞ্জিন, অল্টারনেটর ও ট্রাকশন মোটর সংযোজিত হয়নি। তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে। তবু বুধবার রেলমন্ত্রী ও সচিবের উপস্থিতিতে সভায় ইঞ্জিনগুলোর সক্ষমতা খতিয়ে দেখতে 'যাচাই কমিটি' গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এই ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ ডলারে (প্রায় ৩২৩ কোটি টাকা) দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানির কাছ থেকে কিনেছে রেলওয়ে। গত আগস্টে এগুলো দেশে আসে। করোনার কারণে ইঞ্জিন দেশে আনার আগে প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন (প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন) হয়নি। দেশে আনার পর দেখা যায়, ইঞ্জিনগুলোতে দরপত্রের শর্তানুসারে যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়নি। অভিযোগ ওঠে, হুন্দাই রোটেম ও তাদের স্থানীয় এজেন্ট সিসিআইসি এ অনিয়ম করেছে। তাদের সঙ্গে রেলের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাও জড়িত। সদ্য সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মঞ্জুর-উল-আলমও অনিয়মে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে।
কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদারকে আগেই ২৫ শতাংশ বিল দিয়েছে রেলওয়ে। সরবরাহের পর চুক্তিমূল্যের আরও ৬৫ শতাংশ ছাড় করিয়ে নিতে চেষ্টা করে হুন্দাই রোটেম। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী যন্ত্রাংশ সংযোজন না করার বিষয়টি ধরা পড়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে রেল মন্ত্রণালয়। কিন্তু কমিটিতে রাখা হয় যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সেই অতিরিক্ত মহাপরিচালককেই। পরে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের আপত্তিতে কমিটি পরিবর্তন করা হয়।
রেলের অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুকুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে গত ১৯ জানুয়ারি তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা করা হয়। রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক (মেকানিক্যাল) এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুহ. মাহবুবুর রাজ্জাক কমিটির সদস্য। গতকালের বৈঠকে তদন্ত প্রতিবেদন পড়ে শোনান রেল সচিব সেলিম রেজা। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও সচিবের বক্তব্য জানা যায়নি।
বুয়েটের অধ্যাপক মাহবুবুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী যন্ত্রাংশ দেওয়া হয়নি। হুন্দাই রোটেম দাবি করছে, তারা যেসব যন্ত্রাংশ দিয়েছে, সেগুলো দরপত্রের স্পেসিফিকেশনে উল্লেখিত যন্ত্রাংশের চেয়ে ভালো।
তিনি বলেন, যন্ত্রাংশগুলো ভালো না খারাপ এ বিষয়টি তদন্ত কমিটি দেখেনি। রেল যে যন্ত্রাংশ চেয়েছে তা দেওয়া হয়নি- এটিই আসল কথা।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে এসেছে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী লোকোমোটিভে ইএমডিএস-৮-৭১০জি৩বি-টি১ মডেলের ইঞ্জিন সংযোজন করার কথা। কিন্তু দেওয়া হয়েছে কম ক্ষমতার ইঞ্জিন ইএমডিএস ৮-৭১০জি৩বি-ইএস। টিএ১২-সিএ৯ মডেলের অল্টারনেটর সংযোজনের শর্ত ছিল। কিন্তু দেওয়া হয়েছে টিএ৯-১২সিএস৯এসই মডেলের অল্টারনেটর। এ২৯০৯-৯ মডেলের ট্রাকশন মোটর সংযোজনের শর্ত ছিল। দেওয়া হয়েছে ২৯০৯ মডেলের ট্রাকশন মোটর। লোড বক্স টেস্টিং প্লান্টের আওতায় ১১ ধরনের যন্ত্রাংশ সরবরাহের চুক্তি ছিল। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক নূর আহাম্মদ হোসেন মন্তব্য করতে রাজি হননি। যদিও ২ ফেব্রুয়ারি তিনি চিঠি দিয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ককে জানিয়েছিলেন, ঠিকাদার হুন্দাই রোটেম তাদের ইচ্ছানুযায়ী বিধিবহির্ভূতভাবে যন্ত্রাংশ সংযোজন করে ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। এসব ইঞ্জিন বাংলাদেশে পাঠানো এবং কমিশনিং কমিটি অগ্রহণযোগ্য প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে রেলের সদ্য সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম অবৈধভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এসব ইঞ্জিনে নির্ধারিত মানের ইঞ্জিন, অল্টারনেটর ও ট্রাকশন মোটর সংযোজন না থাকায় রেলের ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনার যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে উপযোগী নয়। হুন্দাই রোটেম আগে টি-১২-এর পরিবর্তে টি-৯ মডেলের অল্টারনেটর সংযোজনের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে তা বারবারই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিদ্যমান রেললাইনগুলো পর্যায়ক্রমে ব্রডগেজে উন্নীত করা হচ্ছে। এ কারণে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতার ইঞ্জিন কেনার লক্ষ্য ছিল। যাতে ভবিষ্যতে শুধু বগি পরিবর্তন করে এই ইঞ্জিনগুলো দিয়ে ব্রডগেজ ট্রেন চালানো যায়। কিন্তু নিম্নমানের ইঞ্জিন, অল্টারনেটর, ট্রাকশন মোটর সংযোজন না করায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে। লোড বক্স টেস্টিং সরবরাহ না করার বিষয়ে জবাব চাওয়া হলেও হুন্দাই রোটেম তা দেয়নি। চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রাংশ সংযোজন না করায় ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। এসব ইঞ্জিনে দরপত্রের শর্তানুযায়ী যন্ত্রাংশ সংযোজন না করা পর্যন্ত গ্রহণেরও সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামানের বক্তব্যও জানা যায়নি। ইঞ্জিনগুলো দেশে আসার পর পরীক্ষা ছাড়া বন্দর থেকে খালাস না করার মতামত দেওয়া হয়েছিল প্রকল্প থেকে।
রেল সূত্র জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রাংশ সংযোজন করা না হলেও ইঞ্জিনগুলো দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আনার পর সমুদ্রবন্দরে ফেলে রাখার জরিমানা এড়াতে এবং ইঞ্জিনগুলোতে কী কী ঘাটতি রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের নির্দেশে জাহাজ থেকে খালাস করে কমিশনিংয়ের কাজ শুরু হয়। ইঞ্জিনগুলো এখন রেলের চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে রয়েছে কমিশনিংয়ের জন্য। ইঞ্জিনগুলো খালাসের পর হুন্দাই রোটেমের দেশি এজেন্ট সিসিআইসি দুই ধরনের পিএসআই সার্টিফিকেট দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একটিতে দাবি করা হয়, ইঞ্জিনগুলো টেস্টিং, ট্রায়াল রান ও কমিশনিং সন্তোষজনক। পরে একই তারিখে এসব বাদ দিয়ে আরেকটি সার্টিফিকেট দেয়। ইঞ্জিন তৈরির সময় রেলের পরিদর্শন দলের দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে যেতে পারেনি। গুণগত মান নিশ্চিতের দায়িত্ব ছিল হুন্দাই রোটেমের দেশি এজেন্ট সিসিআইসির। কিন্তু তারা কখনোই রেলকে জানায়নি দরপত্রের শর্তানুযায়ী ইঞ্জিন তৈরি হয়নি।
গতকালের বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, হুন্দাই রোটেম ও তাদের দেশি এজেন্টের প্রতিনিধিরা ভুল তথ্য দিয়ে ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করতে বলে। তখন প্রকল্পের পক্ষ থেকে চুক্তির মূল কপিসহ অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয় রেলের মেকানিক্যাল বিভাগ, বুয়েটের একজন অধ্যাপক, সাবেক প্রকল্প পরিচালক হাসান মনসুরের সমন্বয়ে একটি যাচাই কমিটি করা হবে। এ কমিটি দেখবে ইঞ্জিনগুলো বিদ্যমান যন্ত্রাংশ দিয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সক্ষম কিনা।

বিষয় : নিম্নমানের ইঞ্জিনই নিতে চায় রেল!

মন্তব্য করুন