শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় নিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হোসেন তৌফিক ইমাম। তিনি এইচ টি ইমাম নামেই বেশি পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টার মৃত্যুতে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা ও শোক জানিয়েছেন।

বুধবার রাতে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ৮২ বছর বয়সে মারা যান এইচ টি ইমাম। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

বৃহস্পতিবার সকালে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে এইচ টি ইমামের মরদেহ ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় নেওয়া হয়। বেলা ১১টায় উল্লাপাড়া আকবর আলী সরকারি কলেজ মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ ঢাকায় এনে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। বিকেলে গুলশান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তার আগে এইচ টি ইমামকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

উল্লাপাড়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জানাজার আগে সকালে এইচ টি ইমামের মরদেহ উল্লাপাড়া আকবর আলী কলেজ মাঠে রাখা হয়। এ সময় হাজারো মানুষ তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। জানাজার আগে বক্তব্য দেন উল্লাপাড়ার সংসদ সদস্য ও এইচ টি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মমিন মণ্ডল প্রমুখ।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এইচ টি ইমামকে নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলিতে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরীর পক্ষে শ্রদ্ধা জানানো হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগ নেতারা। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের মধ্যে শ্রদ্ধা জানান কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। এ ছাড়া গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ. কে. আজাদ প্রমুখ।

গুলশানে দ্বিতীয় জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি।

জানাজা শেষে তানভীর ইমাম জানান, আগামী ৮ মার্চ গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে বাদ আসর এইচ টি ইমামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।

এইচ টি ইমামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার চেয়ারম্যান বি. চৌধুরী, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিয়ষক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক), ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ প্রমুখ। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকেও শোক জানানো হয়েছে।

এইচ টি ইমামের জন্ম ১৯৩৯ সালে টাঙ্গাইল শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি নেন। রাজশাহী সরকারি কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের চাকরি ছেড়ে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি এ পদে ছিলেন। তিনি লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক, যোগাযোগ সচিব, পরিকল্পনা সচিব, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসর নেওয়ার পর আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন এইচ টি ইমাম। ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর প্রথমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা, পরে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হন।