বন্ধের ঠিক ৩৭৭ দিন পর আগামী ৩০ মার্চ সারাদেশের বন্ধ থাকা সব বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয় খুলে দেওয়া হচ্ছে। অতিমারি করোনার কারণে টানা এক বছর বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আনুষ্ঠানিক পাঠদান। গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ১৭ মার্চ বন্ধ করে দেওয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তখন থেকে দেশের কওমি মাদ্রাসা বাদে বাকি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই চলছে টানা ছুটি।

টানা বন্ধের কারণে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অন্তত দেড় বছরের সেশনজট। পরীক্ষাজটও লেগেছে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজগুলোতে। করোনায় বাতিল করতে হয়েছে সর্বশেষ এইচএসসি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেটের (জেএসসি) মতো পাবলিক পরীক্ষা। বাতিল হয়েছে বিদ্যালয়গুলোর ২০২০ সালের বার্ষিক পরীক্ষাও।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, আনুষ্ঠানিক ক্লাস না হওয়া, দীর্ঘকাল ঘরবন্দি থাকাসহ নানা কারণে গত বছরের পাঠ্যসূচির বহু কিছুই শিক্ষার্থীরা রপ্ত করতে পারেনি। চলতি শিক্ষাবর্ষে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে সেসব পুষিয়ে দেওয়া জরুরি।

প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন চলছে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ধোয়া-মোছার কাজ। নড়েচড়ে বসেছেন শিক্ষকরা। স্বস্তি ফুটেছে অভিভাবকদের চোখেমুখে। শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্লাসরুমে ফেরার।

করোনায় শিক্ষার ক্ষতি: করোনার কারণে ২০২০ ও ২০২১ শিক্ষাবর্ষে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে শিক্ষাসূচি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সারাদেশের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির (২০১০) সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান সমকালকে বলেন, 'নিঃসন্দেহে বলা যায়, করোনায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। করোনার কারণে একশ্রেণির পড়া ঠিকমতো না পড়েই শিখনশূন্যতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে উঠেছে। এই ভয়াবহ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উদ্যোগ নিতে হবে।'

স্কুল-কলেজের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায়। মে মাস থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা ও জুলাই থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকা, দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির উচ্চমূল্যের কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষেই অনলাইনে ক্লাস করা সম্ভব হচ্ছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন ব্যাচের ভর্তিও পিছিয়ে গেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অন্তত ৫০০ পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, করোনাকালে শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রাম-শহর ও ধনী-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য এখন সুস্পষ্ট। শহুরে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস করছে। এমনকি পরীক্ষাও দিচ্ছে। ধনী পরিবারের সন্তানরা স্কুল-কলেজের অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন বা সরাসরি প্রাইভেট পড়ছে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পুরোপুরিই পড়ালেখার বাইরে রয়েছে। মফস্বলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের টেলিভিশন, স্মার্টফোন বা অনলাইন ক্লাসের জন্য অন্য কোনো ডিভাইস নেই। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন করে বৈষম্য দেখা দিয়েছে।

গত এক দশক পূর্বনির্ধারিত শিক্ষাসূচি অনুযায়ী চলছিল শিক্ষা প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হতো পাবলিক পরীক্ষা। প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও ১ এপ্রিল এইচএসসির সূচি ছিল সব শিক্ষার্থীরই জানা। নির্দিষ্ট সময়ে ফল প্রকাশ পেলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতো শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নেমে এসেছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাসূচি এলোমেলো হয়ে গেছে। যে কারণে চলতি ২০২১ শিক্ষাবর্ষেরও এসএসসি ও এইচএসসির সিলেবাস কমিয়ে আনতে সরকার বাধ্য হয়েছে।

খোলার প্রস্তুতি: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক জানিয়েছেন, স্কুল-কলেজ খুলে দিতে তাদের নানা প্রস্তুতি রয়েছে। এরই মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক দূরত্ব রেখে ক্লাস নিতে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বহু প্রতিষ্ঠানে ঢোকার মুখেই হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ নতুন করে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফাস্ট এইড বক্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক লাখ স্কুলশিক্ষককে সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের ওপর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ে এসে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকা কোনো শিশুর কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা হলে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারবেন তারা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে অন্তত এক ডজন প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকারের শিক্ষাসংশ্নিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়। ৩০ মার্চের আগেই শিক্ষকদের টিকা দেওয়ার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাই শিক্ষা বিভাগের জন্য ১২ লাখ টিকা রিজার্ভ রাখা হয়েছে।

আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে ২৪ মে থেকে। ১৭ মে খোলা হবে আবাসিক হল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আবাসিক হলগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। প্রসঙ্গত, দেশের ৪৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২০টি আবাসিক হল আছে। সেগুলোতে এক লাখ ৩২ থেকে ৩৫ হাজার আবাসিক ছাত্রছাত্রী আছে।

মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য, সিলেবাস, কারিকুলাম ইত্যাদি বিষয়েও সরকারের নানা সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠান খোলার পর চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পাঠ গ্রহণ শুরু করবে। এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত করা বিশেষায়িত সিলেবাসের ওপর ৬০ কর্মদিবস ক্লাস নেওয়া হবে। এরপর দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে নেওয়া হবে এসএসসি পরীক্ষা। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হবে ৮০ কর্মদিবস। একই সঙ্গে শুরু হবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন এবং মুদ্রণ কার্যক্রম।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কোনো কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দুটি পিছিয়ে গেলে এ বছর জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এসএসসি জুলাইয়ে শুরু না হলে এইচএসসিও পেছাবে। সে হিসাবে আগস্টে এসএসসি হলে এইচএসসি অক্টোবরে চলে যাবে। এমন হলে এবার জেএসসি পরীক্ষা হবে না। সে ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নেবে।