স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাস শুরু হয়েছে, ডিসেম্বরে আমরা পৌঁছাব বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে। যে কোনো জাতির জন্য এটা অনেক বড় একটা গৌরবের বিষয়। এ গৌরবের একজন অংশীদার হিসেবে রাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ নাগরিক নারীসমাজের অর্জন-অনার্জন নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার এই সংক্ষিপ্ত লেখা।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পরও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের মুখে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকেন। কিন্তু ১ মার্চ আকস্মিক এক বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু হরতাল আহ্বান করলে ২ মার্চ হরতালে অচল ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। স্লোগান ওঠে- 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো'। মানুষ বুঝে যায়, রাজনৈতিক কৌশলের পথ ধরে আর এগোনো যাবে না। তখনই নির্ধারিত হয়ে যায় যে স্বাধিকার অর্জনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের দিকেই আমাদের যেতে হবে, যে সংগ্রাম ক্রমে রূপ লাভ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে।

৩০ লাখ শহীদ ও পাঁচ লাখ নারীর যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়াসহ জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে বাংলার আপামর আবালবৃদ্ধবনিতার অংশগ্রহণে আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করি, যা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম বঞ্চনা ও বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে। সরকারি চাকরি ও আর্মিতে লোক নিয়োগ; অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ; ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে যে বৈষম্য শুরু হয়েছিল, সেসব বৈষম্যের বিরুদ্ধেই বাঙালিসহ এই ভূখণ্ডের সব মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য যে, এই বঞ্চনার শুরু হঠাৎ করে হয়নি, হয়েছিল অনেক আগে থেকে। যে জন্য পাকিস্তানি শাসকদের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একে একে সংঘটিত হয় ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ও শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনসহ রাজনৈতিক আন্দোলন।

স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়, যার ফলে এ দেশ সামরিক শাসনের নিগড়ে চলে যায় এবং এ দেশের উল্টো পথে হাঁটতে শুরু হয়। দু-দুটি সামরিক শাসনামল পেরিয়ে ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে মানুষ এই জাঁতাকল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের সুযোগ পায়।

সামরিক শাসনের দীর্ঘ কালো ছায়ায় শাসকরা তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করে নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে এ দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, মৌলবাদী ও পাকিস্তানপন্থিদের পুনর্বাসিত করাসহ তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। এর মধ্য দিয়ে তারা নারীসহ ধর্মীয়ভাবে অন্য পরিচয়ের সংখ্যায় অল্প জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের সমানাধিকারের বিষয়টি আবারও রাজনৈতিকভাবে কবর দিয়ে দেয়। সামরিক শাসনকালে অর্থ ব্যয় করে ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পাকিস্তানি কায়দায় ছাত্র রাজনীতিকেও কলুষিত করা হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক এবং ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠীর অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি পঁচাত্তরের অব্যহিত পর এবং জেনারেল জিয়া হত্যার পর অনেকগুলো সামরিক ক্যুর মাধ্যমে জেনারেল মঞ্জুরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়।

এসবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই এ দেশের মানুষ আবার নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে। যদিও সামরিক শাসন চলার সময় প্রবর্তিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছায়া আমরা এখন পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে দেখতে পাই। প্রশাসনকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির আজ্ঞাবহ করার যে সংস্কৃতি সামরিক শাসনামলে শুরু হয়েছিল, তা এখনও চলছে।

আমাদের এতসব মন্দ অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্জনও কম নয়, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। যার ফলে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের জিডিপির আকার বেড়েছে, শহর ও যানবাহন বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে। তারপরও যে প্রশ্নটি মোটাদাগে থেকে যায় তা হলো, যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা বলি, আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তা যথেষ্ট পরিমাণে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা, বিশেষ করে নারীর সমানাধিকারের ক্ষেত্রে। যদিও আমরা বলি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকার পদে এবং মন্ত্রিসভায় নারীদের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সংখ্যক উচ্চপদে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। গার্মেন্টে প্রচুর নারী কাজ করছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিক্ষেত্র ও মৎস্যচাষের সঙ্গে অনেক নারী যুক্ত হয়েছেন। স্থানীয় সরকারে আমাদের নারীরা সরাসরি অংশ নিয়ে নির্বাচনে জিতে আসছেন।

এতসব সাফল্যের পরও আমরা নারী-পুরুষে বৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারিনি। এর কিছু প্রমাণ উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২১ ইনডেক্সে'। উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে সমতা, মজুরি, বিবাহ, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব, উদ্যোগ, সম্পদ ও পেনশন- এই আটটি সূচকের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সূচকগুলোতে গড়ে বাংলাদেশ যে মান অর্জন করেছে (৪৯.৪), তা পাকিস্তানের থেকেও কম (৫৫.৬)।

নাগরিকদের ৫০ শতাংশ নারীর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ যেখানে ৫০ শতাংশ হওয়ার কথা, সেখানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে 'আরপিও'তে বর্ণিত ৩৩ শতাংশ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করতেও দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতাকে পুরস্কৃত করে এই শর্ত শিথিল করে নতুনভাবে আইন করা হয়েছে। উত্তরাধিকারে নারীদের জন্য এখনও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির বৃহদাংশই আমরা এখনও বাস্তবায়ন করে উঠতে পারিনি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেটিং শুরু হলেও নারী উন্নয়নে বরাদ্দকৃত বাজেট কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, সরকারিভাবে তার কোনো অডিট হয়নি। আমরা এ-সংক্রান্ত কোনো রিপোর্টও দেখিনি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় এখনও তথাকথিত অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে আমরা নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। অন্যদিকে নারীকে 'দাসী' ও 'ভোগের বস্তু' হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে ধর্মের নাম করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ মসজিদের খুতবায় ও ওয়াজ মাহফিলে প্রতিনিয়ত যে বিষোদ্গার করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যেখানে এসব ঘৃণ্য কার্যকলাপ স্পষ্টভাবেই সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, আমাদের নাগরিক সমাজের সদস্যদের সরকারের বিরুদ্ধে যেভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের সেভাবে সরব হতে দেখা যায় না। গণতন্ত্রকে তারা কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখিয়ে জনগণের মধ্যে ভুল ধারণা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু মৌলবাদী ও ফতোয়াবাজ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের আওয়াজ তেমন শোনা যাচ্ছে না। অথচ কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না, সেটা আমরা নিকট অতীতের বিভিন্ন উদাহরণ থেকেই জানতে পারি। আমরা দেখেছি, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও ট্রাম্প বা মোদির মতো লোকদের নির্বাচিত হতে। এ দুটি দেশের নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট দক্ষ ও শক্তিশালী বলেই আমরা জানি।

সত্যিকার গণতন্ত্রের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন যেমন দরকার, তেমনি দরকার নারী, ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে জনমানুষের চিন্তায় সমতার ধারণার কার্যকর প্রতিফলন ঘটানো। সংবিধানে ঘোষিত সব নাগরিকের সমানাধিকারের প্রত্যয় বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করা না গেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন বাস্তবায়িত হবে না, তেমনি ৩০ লাখ শহীদের প্রতি আমাদের দায়ও শোধ হবে না।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী; নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ