গত সাড়ে পাঁচ বছরেও বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশনেরও পাঁচ বছর অতিবাহিত হলো। তবে এ সময়ে একটি মামলার চার্জশিটও আদালতে পেশ করা হয়নি। ওই কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৬টি মামলা করেছিল এর আগের কমিশন।

দুদুক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বিদায়কালে রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ মামলার চার্জশিট না দিতে পারার দায় স্বীকার করেছেন। বিদায়ের আগের দিন সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ব্যাংকের অর্থ কীভাবে আত্মসাৎ হয়েছে ও সেই অর্থ কোথায় গেল তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ কারণে আদালতে চার্জশিট পেশ করা সম্ভব হয়নি।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয় মিলনায়তনে ওই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ায় দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ ও কমিশনার এএফএম আমিনুল ইসলাম আজ মঙ্গলবার বিদায় নিচ্ছেন। ২০১৬ সালের ৯ মার্চ তাদের নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। তারা যোগদান করেছিলেন ১৪ মার্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদক সূত্রে জানা গেছে, কীভাবে অবিশ্বাস্য জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটির অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে- তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এর প্রমাণও আছে। জালিয়াতি করে কারা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, ব্যাংক থেকে কাদের হিসাবে টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে, আত্মসাতে কারা সহায়তা করেছে- প্রমাণসহ তাদের সবার নামও আছে। মামলাগুলোর চার্জশিট পেশ করার ক্ষেত্রে এসব প্রমাণই যথেষ্ট। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে দুদকের প্রতি সুপ্রিম কোর্টেরও তাগিদ ছিল। তবে কোনো মামলার চার্জশিট আদালতে দেওয়া হয়নি।

মতবিনিময় সভায় বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ৫৬টি মামলার চার্জশিট বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, 'এটি একটি পুরোনো প্রশ্ন। চার্জশিট কিংবা মামলা হবে কিনা আমি বলতে পারি না, আপনিও বলতে পারেন না। তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন একবার কমিশনে জমা হয়েছিল। আমরা রিপোর্ট গ্রহণ করতে পারিনি।'

তিনি বলেন, 'যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রিপোর্টে তাদের নাম থাকলেও অর্থ কীভাবে আত্মসাৎ হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় গেল তা উল্লেখ ছিল না। আমরা এই বিষয়টি এখনও ফলো করছি। অর্থ কোথায় গেল- এ নিয়ে অনেক লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে কিনা জানি না। '

বিদায়ী চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, 'পাঁচ বছর আগে এমনি এক বসন্তে আপনাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছিলাম। আরেক বসন্তে আপনাদের কাছ থেকে হাসিমুখেই বিদায় নিচ্ছি। মানুষ আসে চলে যাওয়ার জন্য। এটাই নিয়ম।'

তিনি বলেন, 'জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী হয়তো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তবে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়- সমাজের সর্বস্তরে এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে চেয়েছি এবং সেটা পেরেছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।'

গত পাঁচ বছর স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন বলে সাংবাদিকদের জানালেন ইকবাল মাহমুদ। তার দাবি, দায়িত্ব পালনকালে কেউ কোনো তদবির করেনি। সরকার থেকে কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।

দুদক শক্তিশালীকরণ বিষয়ে তিনি বলেন, 'দুদকের নখ-দাঁত নেই, সেটি অনেক পুরাতন কথা। দুদক এখন যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে দুদকের। আইনি ম্যান্ডেট রয়েছে। এই আইন দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। হয়তো আমরা অনেক কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু আমরা চেষ্ট করেছি। এই চেষ্টার যদি কোনো ত্রুটি থাকে সেই ত্রুটি আমার।'

ইকবাল মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে- এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে তিনি দূরে ছিলেন। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সব সময় তার কাছে প্রথম ছিল। দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা যায় কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা কেবিনেট ডিভিশন, মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করতে হবে। তারই ধারাবাহিকতায় দুদকেও কার্যকর হবে। ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর হিসাব নেওয়ার জন্য একটা আইন দরকার।

তিনি বলেন, 'ব্যক্তিগত লাভের জন্য কোনো কাজ করিনি। অনিচ্ছাকৃত ভুল হলে জনগণের কাছে ক্ষমা চাই। বিবেকের সঙ্গে কখনই প্রতারণা করিনি। নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। আইনের বাইরে কোনো কাজ করিনি।'