১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ। বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এতে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ছাত্র ইউনিয়ন তার তৎকালীন যুক্ত মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে প্রতিবাদ মিছিল বের করে। বন্দুকযুদ্ধের এক পর্যায়ে ছাত্রদলের ছোড়া এক গুলিতে শহীদ হন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মঈন হোসেন রাজু। শহীদ রাজুর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির শহীদ বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা ও সমাবেশের রাজু দিবস পালন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। 

দিনটি উপলক্ষে ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি ফয়েজউল্লাহর নেতৃত্বে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায় সংসদ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ, ঢাকা কলেজ সংসদ এবং রাজু সংসদের নেতাকর্মীরা রাজুর স্মৃতিফলকে ফুল দেন। রাজুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান তার সেই মিছিলের সাথী এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। এসময় তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কর্মী এবং শহীদ রাজুর মিছিলে সাথী চিররঞ্জন সরকারের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন শহীদ রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং মিছিলের সাথী আবদুল্লাহ মাহমুদ খান।

শহীদ রাজুর স্মৃতিচারণ করে আবদুল্লাহ মাহমুদ খান বলেন, আমি আর রাজু বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র ছিলাম। রাজু সবসময় একটা কথা বলত, ‘বিজ্ঞান পড়ার চাইতে বিজ্ঞান মনস্ক হওয়া জরুরি।’ সেই সময়টাকে আমি মনে করতে চাই। আমরা যেদিন প্রথম ক্লাস করি। সেদিনই জহুরুল হক হল ও মহসিন হলে গোলাগুলি হয়। সেদিন থেকেই আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাই ক্যাম্পাসের এই পরিবেশের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ওই সময় ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের প্রতি প্রীতি এবং ভীতি কাজ করত। সেসময় আরো একটা বড় সমস্যা ছিল, সেটি হচ্ছে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সামগ্রিক বিষয়গুলো নিয়ে রাজু খুবই তৎপর ছিল। তারই অংশ হিসেবে সেদিনের সেই মিছিলটি ছিল। সেই মিছিলটা ছিল একটা সাহসী মিছিল। সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠছিল তাকে বন্ধ করতেই রাজুকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। রাজু যে কারণে, যার বিরুদ্ধে রাজু তার জীবন উৎসর্গ করলো সেটির প্রতীক রাজু ভাস্কর্য আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেই পথ দেখাবে। 

সমাবেশ শেষে তারা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি টিএসসির শহীদ বেদী থেকে শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে শেষ হয়।

এদিকে, সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে একটি মিছিল বের করে ছাত্র ইউয়িনের নেতৃবৃন্দ। মিছিলটি মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে কলা ভবন, রোকেয়া হল হয়ে টিএসসি প্রদক্ষিণ করে সড়ক দ্বীপে শহীদ বেদীতে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফয়েজউল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদক খাইরুল হাসান জাহিনের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য  দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুমাইয়া সেতু।

সমাবেশে ফয়েজউল্লাহ বলেন, ছাত্রদল-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়ে তাদের গুলিতে ছাত্র ইউনিয়নের মঈন হোসেন রাজু শহীদ হন। আমরা আজও দেখতে পাই সেই ছাত্রলীগ প্রত্যেকটা হল ও ক্যাম্পাসে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ছাত্রলীগের আগের সেই অস্ত্রবাজী দেখা না গেলেও পেশি শক্তির প্রয়োগ তারা জারি রেখেছে। আমরা প্রগতিশীল সংগঠনসমূহ তাদের আধিপত্য রুখবো।

তিনি বলেন, ডিজিটাল আইনের মাধ্যমে সরকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে ৬৮টি ধারা, তার প্রত্যেকটি মানুষের বাক-স্বাধীনতা হরণ করছে। এসময় তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানান।

১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজুসহ সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলনের সকল শহীদের স্মরণে নির্মিত সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ.কে. আজাদ চৌধুরী উদ্বোধন করেন। এই ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী ও তার সহযোগী গোপাল পাল। ভাস্কর্যটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

বিষয় : শহীদ রাজুকে স্মরণ শহীদ রাজু রাজু ভাস্কর্য

মন্তব্য করুন