কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পলাতক প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের সহযোগী হিসেবে নাম আসার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে গ্রেপ্তার না করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীম সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার এ বিষয়ে এক শুনানিতে বলেন, এস কে সুর ও শাহ আলমের নাম বিভিন্ন মাধ্যমে আসছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে দুদক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে তারা এ বিষয়ে আদেশ দিতে বাধ্য হবেন।

এর আগে পিকে হালদারের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলাদেশে ব্যাংকের দুটি পৃথক প্রতিবেদন পুলিশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়। পুলিশের প্রতিবেদনে পিকে হালদার পালিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোল ও শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের কতজন দায়িত্বে ছিলেন, কারা কারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের ভূমিকা কী ছিল, সেই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে গত এক যুগে ঋণ প্রদান ও তদারকি সংক্রান্ত তিন বিভাগে কারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নাম ও পদবি তুলে ধরা হয়েছে। 

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান। আর বাংলাদেশে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তানজীব-উল আলম ও খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।

শুনানির এক পর্যায়ে হাইকোর্ট দুদকের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, পি কে হালদারের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার যারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন এবং সেই জবানবন্দিতে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের বিষয়ে দুদক কী পদক্ষেপ নিয়েছে। 

জবাবে দুদকের আইনজীবী বলেন, জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের কাউকে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কেউ কেউ পলাতক। তখন হাইকোর্ট বলেন, এস কে সুর ও শাহ আলমের নাম বিভিন্ন মাধ্যমে আসছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? জবাবে দুদকের আইনজীবী বলেন, কমিশনের চিঠির ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফিনেনশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেছে। এ সময় দুদককে হুঁশিয়ার করে হাইকোর্ট বলেন, আপনারা পদক্ষেপ না নিলে আদেশ দিতে বাধ্য হব। আগে তাদের ধরেন। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে মেহমানদারি করতে পারেন না। তাদের অবশ্যই কারাগারে নিতে হবে।

এর আগে এ মামলায় পিকে হালদারের দুই সহযোগী ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হক ও পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী বিচারিক আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন তাতে এস কে সুর ও শাহ আলমের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছিলেন।

পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই দুই সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আসছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ আমানতকারীর আবেদনে হাইকোর্ট গত ৫ জানুয়ারি ২৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যাদের মধ্যে এস কে সুর চৌধুরীর নামও ছিল। অভিযোগ ওঠার পর ইতিমধ্যে শাহ আলমকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আর এস কে সুর চৌধুরী ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে অবসরে গেছেন। এছাড়া বিদেশে পালিয়ে থাকা পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। 

ভুয়া ও কাগুজে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৫১ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও আত্মসাতের অভিযোগে পি কে হালদারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করে দুদক।

হাইকোর্টে দুই প্রতিবেদন: পাসপোর্ট জব্দে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকার পরও পি কে হালদার কীভাবে দেশ থেকে পালিয়েছে, তা জানতে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইমিগ্রেশন পুলিশ প্রতিবেদন দিয়ে জানিয়েছে কীভাবে পিকে হালদার পালিয়েছে। 

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর বিকেল পৌনে ৪টায় যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তিনি (পি কে হালদার) দেশ ত্যাগ করেন। সেদিন ইমিগ্রেশন পুলিশের ৫৯ জন সদস্য বেনাপোল স্থলবন্দরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে তাদের কোনো ব্যর্থতা বা গাফিলতি ছিল না। কারণ পি কে হালদারের বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত দুদকের চিঠি তারা পেয়েছেন সে পালিয়ে যাওয়ার পরে। এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী আদালতকে জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে কমিশনের কোনো গাফিলতি ছিল না।

পরে আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, দুদকের লিখিত কপিটা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক রিসিভ করেছেন ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে। সেটা আরও কনফার্ম করতে সেই চিঠিটা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয় ২টা ৪৩ মিনিটে। সেটা যে তারা রিসিভ করেছেন, সেটিও দুদকের কাছে আছে। সুতরাং দুর্নীতি দমন কমিশনের এখানে কোনো অবহেলা ছিল না।

এদিকে অর্থপাচার রোধ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ (আইএডি), আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ (এফআইআইডি) ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাজার বিভাগে (ডিএফআইআইডি) ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কোন কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের নাম, পদবি, ঠিকানা সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএডিতে গত এক যুগে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৭৫ জন কর্মকর্তা, এফআইআইডিতে দায়িত্ব পালন করেছেন ৫০ জন এবং ডিএফআইআইডি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন ১২৯ জন। মোট ৩৫৪ জন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তিন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

প্রতিবেদনে অর্থপাচার রোধে এসব কর্মকর্তার দায় বা অবহেলা এবং ভূমিকা কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন বলেন, এসব বিষয় জানাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তাদের সাত সপ্তাহের সময় দিয়েছেন। আগামী ৬ এপ্রিল বিষয়টি পরবর্তী শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসবে।