করোনাকালেও অপ্রতিরোধ্য মাদকের বিস্তার। 'বন্দুকযুদ্ধ', আত্মসমর্পণ, ঝটিকা অভিযান, 'গায়েবি হামলা', গ্রেপ্তার, মামলা- এসব 'ওষুধ' ব্যর্থ। নতুন কৌশলে এখন আরও চাঙ্গা সর্বনাশা মাদকের এই বাজার। বিশেষ করে ইয়াবার ছোট্ট বড়ি, প্লাস্টিকের বোতলভর্তি ফেনসিডিল কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও বহু আগে থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' জারি আছে।

এরপরও কেন, কী কারণে মাদক কারবার অপ্রতিরোধ্য; সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এর আদ্যোপান্ত। দেশে প্রচলিত বৈধ মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলে মাদকের অর্থ এক হাত থেকে অন্য হাতে যাচ্ছে। পরিচয় গোপন করে মাদক কারবারিরা মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মালিকানা নিয়ে নির্বিঘ্নে টাকা পাচার করছে। এ ছাড়া আরেকটি চক্র সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে মিয়ানমারে থাকা ইয়াবা-মহাজনদের কাছে হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে মাদকের অর্থ পাঠাচ্ছে।

বহুধাপ বিপণন পদ্ধতি (এমএলএম) ও উগ্রপন্থিদের আদলে 'কাট-আউট' কৌশলে দেশে মাদক কারবার চলছে। মাদকের এ চেইনের নিচের দুই স্তরে রয়েছে বাহক ও ছোট কারবারি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থার আওতায় আসছেন তারাই। রোজগারের নেশায় বারবার জীবনের ঝুঁকি নেন তারা। তবে মাদকের উচ্চধাপে যারা আছেন তারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা অনেকে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। কেউ অর্থ বিনিয়োগকারী। আছেন মহাজন বা পাইকারি বিক্রেতা। তারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা পান। উচ্চ পর্যায়ের এই সিন্ডিকেট দেশে-বিদেশে নিয়ন্ত্রণ করছে অতি লাভজনক মাদক ব্যবসা।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সদরে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইয়াবার চালান জব্দ করে পুলিশ। সাত বস্তাভর্তি ১৪ লাখ বড়ি পাওয়া যায়। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে র‌্যাব বিভিন্ন অভিযানে ১৯ লাখ ১২ হাজার ৬৮১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে- পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ সব সংস্থা মিলে ২০২০ সালে দেশে ৩ কোটি পিস ইয়াবা বড়ি জব্দ করে। ২০১৯ সালে ৩ কোটি ৪ লাখ, ২০১৮ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ, ২০১৭ সালে ৪ কোটি ৭৯ হাজার পিস জব্দ করা হয়।

জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশে যত মাদক ঢুকছে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। এই হিসাবে গত বছর দেশে ৩০ কোটি ইয়াবা বড়ি বিক্রি হয়েছে। গড়ে প্রতি বড়ি সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা হিসাবে এর বাজারমূল্য ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই অর্থের বেশিরভাগ চলে গেছে ইয়াবার মূল উৎসস্থল মিয়ানমারে। হিসাব ও গবেষণা বলছে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজার।

১৫ কোটি টাকার লেনদেন: অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এক হাত থেকে অন্য হাতে মাদকের অর্থ নিরাপদে পৌঁছে দিতে মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। ইয়াবার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের আর্থিক চ্যানেল সামলাতে সোহেল রানা ইকবাল ও সাইদ ইশতিয়াক আহমেদ নামে দুই বড় কারবারি রূপালী ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং 'শিওরক্যাশের' এজেন্টশিপ নেন। তাদের দু'জনের বাড়ি কক্সবাজারের করিম শিকদার পাড়ায়। বৈধ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট পরিচয়ে মাত্র ১২ মাসেই সাইদ ও ইকবাল শিওরক্যাশের দুটি হিসাবে (১৩৩৯০২০০০৩৩৫৫ ও ১৩৩৯০২০০০৩৩৪৪) মাদক কেনাবেচায় লেনদেন করেন ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৯৬ টাকা। সাইদ ও ইকবালের এই চক্রে রয়েছেন কক্সবাজার সদরের আরেক বাসিন্দা মো. শরীফ। তিনি মূলত মিয়ানমারের পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়াবা বড়ি সংগ্রহ করেন। দেশে ঢোকার পর ছোট-বড় কারবারির কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এসব কারবারির কাছ থেকে শিওরক্যাশের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে আসছিল এই সিন্ডিকেট। কক্সবাজার ও টেকনাফকেন্দ্রিক আরও বেশকিছু মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টও নেপথ্যে ইয়াবার অর্থ স্থানান্তরে বড় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া মোহাম্মদপুরের টিক্কাপাড়ার ১৩/১ নম্বর বাসার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম তার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ০১৭১০-৯১২৬৭৮ ও ০১৮৮১-৯২৫৯৪০ নম্বরে মাদকের অর্থ লেনদেন করছেন। একই আদলে মাদকের অর্থ স্থানান্তর করছেন ভোলার লালমোহনের মো. আলামিন। ঢাকায় তিনি ২২/৮ বিজলী মহল্লায় বসবাস করেন।

নেপথ্যে যারা: ইয়াবা ছাড়া দুই ধরনের মাদকসেবীর সংখ্যা দেশে বেশি। ফেনসিডিল ও গাঁজাখোর। রাঘববোয়ালদের মধ্যে দীর্ঘদিন পলাতক থেকে ইয়াবার কারবার সামলাচ্ছেন মো. করিম। তার বাড়ি টেকনাফের লেদায়। করিমের দুই সন্তান নিগার সুলতানা ও হাসানুজ্জামান রাজও একই কারবারে জড়িত। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে খিলগাঁওয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি অপারেশনে নিগার ও রাজ ধরা পড়লেও তাদের বাবা এখনও অধরা।

বড় কারবারি কিন্তু কখনও আলোচনায় আসেননি এমন তালিকায় আছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর অহিন আলী নবীন ওরফে রবিন, নোয়াখালীর চাটখিলের বিল্লাল হোসেন, কুমিল্লার তেলকুপি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ইউপি সদস্য ইদন ও বেনাপোলের মধ্যপাড়ার মনিরুজ্জামান, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের আমতলী এলাকার নির্মল কান্তি সাহা ও তার ভাই মৃণাল কান্তি। ভারতে বসে দেশব্যাপী গাঁজার কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন নির্মল ও মৃণাল। এ ছাড়া ইয়াবার বড় পাইকারি বিক্রেতা মোহাম্মদপুরের ইশতিয়াক হোসেন ও তার ম্যানেজার মোল্লা আরশাদ। ২০১৮ সালে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন টিম ইশতিয়াকের 'ডান হাত' হিসেবে পরিচিত জয়নাল আবেদীন ওরফে পাচু ও তার স্ত্রী 'মাদকসম্রাজ্ঞী' হিসেবে পরিচিত পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তবে এখনও বিদেশে বসেই মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুর ও কামরাঙ্গীরচরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিষ্যদের মাধ্যমে মাদক কারবার চালাচ্ছেন ইশতিয়াক। তার বিরুদ্ধে ১৪টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দুদকও তার সম্পদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

এ ছাড়া তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজারের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি, তার সৎভাই মৌলভী মুজিবুর রহমান, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন ও তার ভাই বাহারছড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিন, সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ও তার ছেলে শাহজাহান মিয়া রয়েছে। তাদের কেউ আত্মসমর্পণ করেননি। তাদের অধিকাংশের মাথার ওপর রাজনৈতিক ছত্রছায়া আছে বলে জানা যায়।

তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের মধ্যে বাহারছড়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিন সমকালের কাছে দাবি করেন, 'আমার বাপ, দাদা সবাই আলেম। মাদক আমরা মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। ষড়যন্ত্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মাদক কারবারির তালিকায় আমার নাম তুলে দেয়। এছাড়া আমি এলাকার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। কেন আমি মাদক কারবারে জড়াতে যাব?

মাদকের সঙ্গে জড়িত রাঘবোয়ালরা আরও কয়েকজনের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়ায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

'বাহক-বীমা': একাধিক মাদক কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারে যারা মাদকের বড় গডফাদার তারা 'রাজা' বলে পরিচিত। সাগরে একেকজন রাজা ৪০-৫০ লাখ ইয়াবার চালান নিয়ে অবস্থান করতে থাকেন। সুযোগ মতো ছোট-বড় চালান বিশ্বস্ত বাহকের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের দিকে পাঠিয়ে দেন। রাজাসহ বড় কারবারিদের সঙ্গে বাহক ও মধ্যম সারির কারবারিদের অঘোষিত 'বীমা' থাকে। এতে বলা হয়- ধরা খেলেও বড় কারবারি ও রাজার নাম প্রকাশ করা যাবে না। এটা মানতে পারলে আইনি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জামিনে ছাড়িয়ে আনার যাবতীয় খরচ বহন করা হবে। এমনও চুক্তি থাকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালে মাদকের কোনো বাহক সিন্ডিকেটের অন্যদের নাম প্রকাশ করে দিলে তার শাস্তি নির্ধারণে বিচার বসানো হয়। এই বিচারে রায় ঘোষণা করেন মাদকের গডফাদাররা।

ভরসা হুন্ডি: মিয়ানমারে উৎপাদিত ইয়াবার বড় বাজার বাংলাদেশ। ২০০৬ সাল থেকে সেখান থেকে ইয়াবা দেশে আসছে। তবে এক সময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে ইয়াবা সরবরাহ করত মিয়ানমার। ২০১২ সালে চীন ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির পর দেশ দুটিতে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এখন বাংলাদেশই মূল টার্গেট। মিয়ানমারের শান প্রদেশে অধিকাংশ ইয়াবার কারখানা রমরমা। মূলত ইয়াবার এই বাণিজ্যের সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর একটি অংশ ও পুলিশের অসাধু কিছু কর্মকর্তা, একাধিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতারা জড়িত। বিশেষ করে ওয়া ও কোকাং আদিবাসী সম্প্রদায় এর অগ্রভাগে রয়েছে। মিয়ানমারের বড় কারবারি ও বাংলাদেশে রাঘববোয়ালরা সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে ইয়াবা কেনাবেচার অর্থ সেখানে চলে যায়। সেখান থেকে পরে অর্থ যায় মিয়ানমারে। অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে এই কারবার করতে হয় না। অলিখিত চুক্তি থাকে, বিক্রির পর অর্থ পরিশোধ করা যাবে। তাই অনেকে ঝুঁকি নিয়েই ব্যবসা চালান। আবার কোনো চালান ধরা পড়লেও মূল মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় না। মিয়ানমারে বর্তমানে প্রতি পিস ইয়াবার দাম ১০-১২ টাকা। প্রতি ধাপে যখন এই বড়ি হাতবদল হয়, তখন দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। এতে প্রতি পিস ইয়াবায় সাধারণত লাভ থাকে ১০ টাকা। মাদকসেবী পর্যায়ে ঢাকাসহ সারাদেশে এখন প্রতিটি ইয়াবার দাম বর্তমানে ১৫০-২০০ টাকা। মূলত যে ব্যক্তি সর্বোচ্চ ধাপে থেকে মিয়ানমারের পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন, তিনি হুন্ডির মাধ্যমে ইয়াবা বিক্রির অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে দেন। দুবাই বসে অনেক বছর ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমারকেন্দ্রিক ইয়াবার কারবারের অর্থ নেটওয়ার্কে জড়িত আছেন জাফর আহমেদ ওরফে টিটি জাফর। তার গ্রামের বাড়ি টেকনাফের জালিয়াপাড়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। কক্সবাজার ও আশপাশ এলাকার যারা সৌদি আরব ও দুবাইয়ে প্রবাসী হিসেবে বসবাস করছেন তাদের অনেকের তালিকা তার কাছে রয়েছে। অপ্রচলিত চ্যানেলে যেসব প্রবাসী দেশে টাকা পাঠান তাদের টার্গেট করেন তিনি। দেশে কার পরিবারকে কত টাকা দিতে হবে তা জানিয়ে দেন টিটি জাফর। এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট কমিশনসহ অর্থ টিটি জাফর আগেই বিদেশে তার নিয়োগ করা এজেন্টদের মাধ্যমে প্রবাসীদের কাছ থেকে তুলে রাখেন। মূলত টিটি জাফরের সাঙ্গোপাঙ্গরা দেশে মাদক কেনাবেচার অর্থ থেকে প্রবাসীদের পরিবারকে অর্থ সরবরাহ করেন। এভাবে হুন্ডির মাধ্যমে ইয়াবার চ্যানেলে টাকা ঢুকছে। আরও বেশি প্রবাসী আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।

'বন্দুকযুদ্ধ': ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে র‌্যাব। এরপর পৃথকভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালায় পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এরপর একের পর এক 'বন্দুকযুদ্ধে'র ঘটনা ঘটে। অভিযানে অংশগ্রহণকারীও 'বন্দুকযুদ্ধ'কে মাদক নির্মূলের সমাধান ও শেষ ভরসা হিসেবে মনে করা হয়। তবে হিসাব মেলেনি। 'বন্দুকযুদ্ধ' সমাধান নয়- এটা পুরোপুরি মানছেন মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যও। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাদকবিরোধী অপারেশনে 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা গেছেন ৫৬১ জন। গত বছরের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। তার মৃত্যুর পর প্রদীপের মাদক বাণিজ্য ও বৈধ সরকারি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপটে কিছুদিন 'বন্দুকযুদ্ধে'র ঘটনা কম ছিল।

বিশেষজ্ঞ মত: সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, যে কলাকৌশল প্রয়োগ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা কেন কাজে আসছে না তা বিশ্নেষণ করা দরকার। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে জোরালো আন্দোলন গড়তে হবে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, 'বন্দুকযুদ্ধ' দিয়ে মাদক সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। শুধু পুলিশ-র‌্যাব নয়, মাদক নির্মূলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নতুবা ফল আসবে না। এ ছাড়া কারাগারে বন্দি মাদকাসক্তদের ঘিরেও আলাদা কর্মসূচি নিতে হবে।

মাদকের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ইমদাদুল হক। তিনি সমকালকে বলেন, উপমহাদেশে মাদকের সমস্যা বহু পুরোনো। ব্রিটিশ সরকার এখান থেকে যে রাজস্ব আহরণ করত তার ৫০ শতাংশ ছিল মাদকনির্ভর। রাষ্ট্রীয় ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তারা এখানে এককভাবে আফিমসহ অন্যান্য মাদক কারবারে জড়িত ছিল। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে ভেন্ডরের মাধ্যমে আফিম, গাঁজা ও ভাং বিক্রি করার বৈধতা ছিল। এরপর এটা নিষিদ্ধ করা হয়।

বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ ফয়সল হাসানও সমকালকে বলছেন, শুধু 'বন্দুকযুদ্ধে'র মধ্য দিয়ে মাদক কারবার বন্ধ করা যাবে না।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, যারা বড় মাদক কারবারি তাদের অর্থ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। নগদ অর্থ না থাকলেও মানি লন্ডারিং করে তারা বেনামে সম্পদ গড়েছে। এটার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে।