সহজে অতি মুনাফার উদ্দেশ্যে অভিনব কৌশলে নকল পণ্য তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এক সময় হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য নকল হতো কিংবা অবৈধভাবে বাজারে আসত। কিন্তু এখন নকলের তালিকায় যোগ হচ্ছে নিত্যনতুন পণ্য। এর আগে বিভিন্ন অভিযানে প্রসাধনী, ওষুধ, পানীয়সহ কিছু পণ্যের নকল ধরা পড়ত। এখন খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত অনেক ধরনের নকল পণ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। এদিকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অভিযানের কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল পণ্য উৎপাদনের জায়গা বদল করছে। জেলা পর্যায়ে ছোট কারখানায় ছড়িয়ে পড়ছে। পণ্য বিক্রিতে অপরাধীরা পাইকারি বড় বাজারকে টার্গেট করছে। এ ছাড়া অনলাইনে নকল পণ্য বিক্রির অপতৎপরতা বেড়েছে।

যেসব পণ্য বেশি নকল হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো কসমেটিকস বা প্রসাধনী। জীবন রক্ষাকারী ওষুধও নকল হচ্ছে। মোবাইল হ্যান্ডসেট, অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্য ও বৈদ্যুতিক তারের মতো পণ্য হরহামেশাই নকল হচ্ছে। নকল হচ্ছে সরকারের রেভিনিউ স্ট্যাম্প। সিগারেটের ট্যাক্স-স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল নকল ও পুনর্ব্যবহার করে সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত ঠেকানো না গেলে তা একদিকে অর্থনীতিকে আরও ক্ষতির মুখে ফেলবে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। এজন্য নকল পণ্য উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে অপরাধীদের শাস্তি বাড়াতে হবে।

জানা যায়, এখন নকল পণ্যের তালিকা বেশ বড়। তালিকায় যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, মশার কয়েল, টাইলস, সিরামিকসহ নানা পণ্য। চা, চিপস, চকলেট, চানাচুর, নুডলস, বেভারেজ, ঘি, বাটার অয়েল, সস ও মধু নকল হচ্ছে। নকলের তালিকায় নতুন পণ্য যুক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রধান খাদ্যপণ্য চালের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের মোড়ক নকল করে নিম্নমানের চাল বাজারে ছাড়ছে একটি চক্র। দেশে রশিদ ব্র্যান্ডের চাল বেশ পরিচিত। তাদের মোড়কে অন্য চাল বিক্রি বন্ধে অধিদপ্তরে আবেদন করেছে রশিদ এগ্রো।

সরকারি সংস্থাগুলোর অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, আগে অভিযানে রাজধানীর পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক নকল পণ্য তৈরির কারখানা ধরা পড়লেও এখন ঢাকার আশপাশেসহ সারাদেশে কারখানা সরিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, শ্যামপুর, বাড্ডা, সাভার, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, নেত্রকোনা ও রাজশাহী বিভিন্ন জেলায় নকল পণ্য উৎপাদনের কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, খাদ্য পণ্য নকল হওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। নকল ও ভেজাল রোধ করতে বাণিজ্য, শিল্প, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আর শুধু রমজান ঘিরে তৎপর না হয়ে বছরব্যাপী উৎপাদন থেকে বাজার পর্যায়ে অভিযান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তাদের আরও সচেতন হতে হবে।

অভিযানে যা ধরা পড়ছে :বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএসএফএ), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে নতুন নানা ধরনের নকল পণ্য ধরা পড়ছে। ভোক্তারাও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন। এমনকি বিভিন্ন ব্র্যান্ড নকল বন্ধে পদক্ষেপ নিতে আবেদন করছে।

সম্প্রতি রাজধানীর কাফরুলের দক্ষিণ ইব্রাহীমপুরের আলী আজগর নামে এক ব্যক্তির কারখানায় অভিযান চালায় বিএসটিআই ও র‌্যাব। এই অভিযানে নকল ঘি, বাটার অয়েল ও সস তৈরির প্রমাণ পায়। আড়ং, মিল্ক্ক ভিটা, প্রাণ, রেড কাউসহ নানা ব্র্যান্ডের নকল পণ্য পাওয়া যায়। এ অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ৪০ লাখ টাকার নকল পণ্য ধ্বংস করা হয়। গত জানুয়ারিতে এক অভিযানে উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরের একটি শপিংমলের দোকানে বিদেশি ব্র্যান্ডের জুস, চকলেট, কফি, চা পাতাসহ নানা নকল পণ্য ধরা পড়ে। এসব পণ্যে বিএসটিআইর কোনো অনুমোদন ছিল না। রাজধানীর ভাটারায় একটি কারখানায় নকল ও নিম্নমানের জুস ও চকলেট তৈরির কারখানায় অভিযান চালায় বিএসটিআই।

গত ৪ মার্চ বংশালের আবুল হাসনাত রোডে ও খিলগাঁওয়ের দুটি কারখানায় অভিযান চালায় বিএসটিআই ও র‌্যাব। আখতার হোসেন ও আমানা হোসেন নামে দুই ব্যক্তির কারখানায় নকল নারিকেল তেল তৈরির প্রমাণ পায়। নামিদামি ব্র্যান্ডের মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকোর প্যারাসুট ব্র্যান্ড ছাড়াও কুমারিকা, ডাবর আমলা, কিউটসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল নারিকেল তেল জব্দ করা হয়। প্রতিষ্ঠান দুটিকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা এবং কারখানা সিলগালা করা হয়।

সম্প্রতি বাজারে নকল নুডলস আসার কথা জানান বিক্রেতারা। মিরপুর ১নং বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি বলেন, প্রত্যেক ব্র্যান্ডের নুডলস পরিবেশকদের মাধ্যমে দোকানে আসে। সম্প্রতি পরিবেশকদের বাইরে অনেকেই নিয়ে আসছেন। সম্প্রতি বসুন্ধরা ও কোকোলা এ দুই ব্র্যান্ডের নুডলস মিরপুরের আনসার ক্যাম্পের পাশে ফুটপাতে ভ্যানে মোড়কের গায়ের লেখা খুচরা দরের চেয়ে অর্ধেক কমে বিক্রি হতে দেখা যায়। এ প্রতিবেদক জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, ওই দুই কোম্পানির প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি তার কাছে এসব পণ্য সরবরাহ করেছেন। বেশি লাভ হওয়ায় তিনি বিক্রি করছেন।

সম্প্রতি নুডলস নকল হওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ দিয়েছে কোকোলা নুডলস কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটি নকল পণ্য তৈরি বন্ধে অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার অভিযানে গুডনাইট, এসিআইসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মশার কয়েল, নকল মোবাইল হ্যান্ডসেট ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, তার, নানা ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, স্যানিটারি পণ্যসহ বিভিন্ন নকল পণ্য তৈরির প্রমাণ পেয়েছে।

সরকারি সংস্থার বক্তব্য :বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আব্দুল কাইউম সরকার সমকালকে বলেন, খাদ্যপণ্য নকল করার প্রবণতা রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সারাদেশের বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করছে। নমুনা পরীক্ষার পরে যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া রমজানে বাজারে খাদ্যপণ্যের বেচাকেনা বেড়ে যায়। এ সুযোগে যাতে নকল পণ্য বিক্রি বেড়ে না যায়, তার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নকল প্রতিরোধে ভোক্তাদের আরও সচেতন হতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক রিয়াজুল হক বলেন, উৎপাদন ও বাজার পর্যায়ে নকল পণ্য বন্ধে বিএসটিআই নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে অনলাইনে নকল পণ্য বিক্রি রোধে ভোক্তাদের আরও সচেতন হতে হবে। বিএসটিআইর হটলাইনে নকল ও ভেজাল পণ্যের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভোক্তারা সচেতন হলে নকল রোধ করা সহজ হবে। তিনি জানান, নকল পণ্য বন্ধে বিএসটিআই কিউআর কোড ও বার কোডে বিএসটিআইর লোগো সংযুক্ত করার বিষয়ে কাজ করছে। এর বাস্তবায়ন হলে ভোক্তারা যাচাই করে পণ্য কিনতে পারবেন।

সহজ মাধ্যম অনলাইন :নকল পণ্য বিক্রিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন অনলাইনকে বেছে নিচ্ছে। বাজার পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার হওয়ায় তারা এদিকে ঝুঁকেছে। এ বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। তিনি বলেন, নকল পণ্য রোধে ভোক্তাদের বিএসটিআইর মানচিহ্ন ও বার কোড যাচাই করে কিনতে হবে। নকল পণ্য রোধে অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।