করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে সংঘবব্ধ প্রতারক চক্র দেশজুড়ে নকল পণ্যের জাল বিস্তার করেছে। দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর কিছু দিন পর থেকেই তারা রমরমা কারবার চালাতে থাকে। এর পর বিভিন্ন জায়গায় অভিযানে নামে পুলিশ-র‌্যাব। তবে এখনও তৈরি হচ্ছে নকল সুরক্ষা সামগ্রী। প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানও চালান। এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারও করেন। এর পরও অনেকে বেপরোয়া।
র‌্যাব সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, গত বছরের ৬ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় এ-সংক্রান্ত ১০৯টি মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১০ জনকে। মোট জরিমানা করা হয়েছে এক কোটি ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সমকালকে বলেন, নকল পণ্যের বিরুদ্ধে র‌্যাব সবসময় সোচ্চার। যদি করোনাকে পুঁজি করে কেউ অনৈতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযানও চালায় র‌্যাব।
পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি বিপ্লব বিজয় তালুকদার সমকালকে বলেন, করোনার শুরুর দিকে নকল সামগ্রী তৈরির সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে প্রায়ই অভিযোগ পেতাম। এসব চক্রের অধিকাংশ ছিল মিটফোর্ডকেন্দ্রিক। এ ছাড়া কামরাঙ্গীরচর, পুরান ঢাকা ও মিরপুরের অনেক বাসাবাড়িতে বসে নকল পণ্য তৈরি করা হতো। বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে নকল জীবাণুনাশক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ করোনার সুরক্ষা সামগ্রী জব্দ করা হয়। এখনও আমরা সতর্ক রয়েছি, যাতে কেউ নকল পণ্য তৈরি করতে না পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, একটি নামিদামি প্রতিষ্ঠানও করোনার নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজারজাত করেছিল। ইথাইল অ্যালকোহলের পরিবর্তে বিষাক্ত মিথাইল অ্যালকোহল দিয়ে তারা স্যানিটাইজার তৈরি করেছিল। অন্তত ৩৫ হাজার স্যানিটাইজার তারা বাজারেও ছেড়ে দিয়েছিল। পরে একটি সংস্থার পরীক্ষায় এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। এর পর নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তারা বাজার থেকে তুলে নেয়। তবে তুলে নেওয়ার আগেই দুই-তিন হাজার নকল স্যানিটাইজার খুচরা ক্রেতার কাছে চলে যায়।
র‌্যাব সূত্রে আরও জানা গেছে, গত বছরের মাঝামাঝিতে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় অভিযান চালায় র‌্যাব-১০ ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্দ করা হয়। এর পর তা ধ্বংস করেছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ধ্বংস করা কাঁচামালের বাজারমূল্য চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা। একটি বাসায় ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই স্পিরিট, রং, জেল এবং লেমন ফ্লেভার দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করছিল মেসার্স কাজী ম্যানুফ্যাকচারার নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ওই ঘটনায় চারজনকে সাজা দেওয়া হয়। তারা হলেন- কাজী মুন্না, শান্ত, সাব্বির সরদার ও আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া। প্রথম তিনজনকে ঔষধ আইনের বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করায় দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদ এবং আব্দুল মান্নানকে দুই লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদ দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে দেড় লক্ষাধিক পিস হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও নকল সুরক্ষা সামগ্রী জব্দের পর ধ্বংস করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় এখনও করোনার সুরক্ষা সামগ্রীর স্বল্পতা রয়েছে। আর এই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু কারবারিরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে পুরান ঢাকার অলিগলিতে তৈরি হচ্ছে নকল পণ্য। আবার কেউ কেউ বিদেশ থেকে মানহীন পণ্য এনে অভিজাত ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারজাত করছে। নকল পণ্য বিক্রি করেই বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল সংগ্রহ করে রং মেশানো পানি ভরেও বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। বেশিরভাগ পণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদের কোনো তারিখ নেই।
গত বছরের মে মাসে চাঁদপুরের একটি চক্রের খোঁজ মেলে। সেখানে ৫০০ কনটেইনার ভেজাল ও নকল স্যাভলন, ৫০০ পিস হ্যান্ডওয়াশ ও স্যানিটাইজার পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় কলিম নামে একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। এ ছাড়া গত বছর পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক আরেকটি চক্রকে শনাক্ত করেছিল র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে অন্তত চার হাজার পিস হ্যান্ডরাব, ৫০ কেজি ওজনের ১৪টি ড্রামে খোলা হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্দ করা হয়। নকল পণ্য বিক্রির কারণে লক্ষ্মী পারফিউমারির মালিক জনিকে দুই লাখ টাকা, কামাল পারফিউমারি ও কেমিক্যালের মালিক মো. কামাল হোসেনকে পাঁচ লাখ টাকা, দীন পারফিউমারির মালিক তাজুল ইসলামকে ৫০ হাজার টাকা, সুমি এন্টারপ্রাইজের মালিককে দুই লাখ টাকা, আজতারা পারফিউমারির মালিক শামসুল ইসলামকে এক লাখ টাকা, জসিম পারফিউমারির মালিক মো. সেন্টুকে এক লাখ টাকা, দি বোরহান পারফিউমারির মালিক আবদুর রহমানকে ছয় লাখ টাকা এবং বোরহান পারফিউমারি হাউসের মালিক মোহাম্মদ রেজাউলকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া কামাল কেমিক্যালসের মালিক কামালকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদ এবং একই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আবু কাওসারকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদ সহ দুটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। এ ছাড়া গত বছর বাংলামটরকেন্দ্রিক একটি চক্রের খোঁজ পায় পুলিশ। যারা সাধারণ মাস্ককে এন-৯৫ বলে কয়েকগুণ দামে বিক্রি করছিল। ওই ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তারও হয়।