১৯৭১-এর জানুয়ারিতে আমি হলি ক্রস স্কুলে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হই। আমরা তখন বাস করছি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায়। আমার বাবা জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা তখন ছিলেন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ। বেশি দিন হয়নি আমরা এই বাড়িতে এসেছি। কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে গেল কত ঘটনা।
খুব বেশি দিন হয়নি আমরা এসেছি, তবু এরই মধ্যে বাবা আমাদের এক তলায় ফ্ল্যাটের পেছন দিকে বাগানটা গুছিয়ে ফেলেছেন। বাগানে সবুজ ঘাস গজিয়েছে, এক সারি নানা বর্ণের ডালিয়া, তার পরের সারিতে হলুদ গাঁদা ফুল ও তার পরে বিদেশি ডায়ান্থাস ও সাদা রঙের এলিসামের বর্ডার। পথচারীরা থেমে তাকিয়ে দেখত নানা রঙের এলিসামের বর্ডার। পথচারীরা থেমে তাকিয়ে দেখত নানা রঙের এই শোভা। আর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠত, একুশের আগের রাতে এই ফুল কি আর রাখা যাবে। সুতরাং ঠিক হলো আগের দিন বিকেলে সব ফুল কেটে বাড়ি বাড়ি বিলি করা হবে যাতে যারাই শহীদ মিনারে যাবে, তারা কিছূ ফুল নিয়ে যেতে পারবে। তখনকার ঢাকার বাজারে ফুল এত সহজলভ্য ছিল না। এভাবেই আমার কিশোর মনে '৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি দাগ কেটে রেখেছে।
এক রাতে স্বপ্ন দেখলাম, আমার মামা বাড়িতে বোমা পড়েছে কিন্তু ঘরবাড়ি ধ্বংস না হয়ে কেবল ছিদ্র হয়েছে। অন্যদিন দেখলাম, মুজিব, ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলি ভুট্টো, আমার বাবা, সন্তোষ ভট্টাচার্য (যিনি '৭১-এর ডিসেম্বরে শহীদ হন) সবাই কারাগারে বন্দি আর এও দেখলাম, ইন্দিরা গান্ধী হুইলচেয়ারে। এসব স্বপ্নের অন্তর্নিহিত বাণী নিয়ে অনেক রসালো গল্প, জল্পনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ চলল আমাদের বাড়িতে। কিন্তু সবকিছুই স্তব্ধ করে দিল ২৫ মার্চের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। আন্দোলনের সময় বাবা প্রায়ই বলতেন, আমরা একেবারেই 'তোপের মুখে' এসে পড়েছি। কিন্তু এর পরিণাম যে কী হবে তার লেশমাত্রও যদি আমরা অনুভব করতে পারতাম।
২৫ মার্চের রাতে আমি যে ঘরে ঘুমুতে গেলাম, সে ঘরেই বাবা টেবিলে পরীক্ষার খাতা দেখতে বসলেন। আমার একটু তন্দ্রা আসতে না আসতেই বিকট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখলাম বাবা ও মা এদিক-ওদিক ছুটছেন এবং আমাকে মাঝের ঘরে (যে ঘরটি রাস্তা থেকে দূরে) গিয়ে শুয়ে থাকতে বলছেন। গোলাগুলির আওয়াজ ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠল। মনে হলো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য প্রতি রাতে কিছু না কিছূ গোলাগুলির আওয়াজ পেতাম কয়েক সপ্তাহ ধরে। সে রাতের আওয়াজটা অনেক বেশি মনে হয়েছিল। আমার মা ও বাবার নিষেধাজ্ঞা না শুনেই আমার ঘরের জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে উঁকি দিয়ে দেখি, গোলাগুলি হচ্ছে জগন্নাথ হলকে ঘিরে। আর একটি মিলিটারি জিপ আমাদের গেটে এসে হাজির। সঙ্গে সঙ্গে জওয়ানগুলো বন্যার স্রোতের বেগে আমাদের ৩৪নং বিল্ডিংয়ের সব তালায় উঠে গেল। আর প্রতিটি ফ্ল্যাটে জোরে লাথি মারতে লাগল। মাকে আমরা জোর করে জানালা থেকে ফিরিয়ে আনলাম। তখন বোধ হয় একজন সৈন্য আমাদের জানালার জাল বেয়নেট দিয়ে ছিঁড়ে পর্দা উঠিয়ে দেখে নিয়েছে, আমাদের ঘরে লোকজন আছে। তার ঠিক পরেই আমাদের পেছনের বাগানের গেট দিয়ে হাজির হয় তারা। রান্নাঘরের দরজায় জোর আঘাত হচ্ছে। স্বর্ণ মাসি যে আমাদের সঙ্গে আমার জন্মের আগে থেকেই আছেন এবং রান্নাবাড়ার কাজ করতেন। গেট খুলতেই তাকে ধাক্কা দিয়ে বাগানে ফেলে দেয়। সেখান থেকে দৌড় দিয়ে সে চলে যায় ড্রাইভারদের কোয়ার্টারে, যেখানে গোপাল আমাদের গাড়ির ড্রাইভার তার ঘর থেকে সৈন্যদের সব দেখেছিল এবং চিৎকার করছিল যাতে আমরা দরজা না খুলি। কিন্তু হায় তার গলায় স্বর গোলাগুলি ও বোমার শব্দে হারিয়ে যায়।
মিলিটারিদের ঘরে চলে আসতে দেখে বাবা আমাকে ড্রইং রুমে গিয়ে শুয়ে থাকত বললেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি, সামনের দরজায় জওয়ানরা এত বিকটভাবে লাথি দিচ্ছে, সেখানে থাকার জো নেই। মা চেষ্টা করেও দরজা খুলতে পারেননি। কেননা দরজা ধাক্কা দিতে দিতে ওরা জ্যাম করে ফেলেছে। এমন সময় দুটি জওয়ানকে নিয়ে একটি অফিসার প্রবেশ করল। আমার মা আলনা থেকে আমার বাবাকে পাঞ্জাবি হাতে তুলে দিয়ে বলল, 'তোমাকে নিশ্চয়ই অ্যারেস্ট করতে এসেছে।' বাবা পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে নিথরভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। মা সৈন্যদের সামনে গেলেন। ওরা বলল, 'প্রফেসার সাব হ্যায়?' মা বললেন, হ্যায়। ওরা বলল, 'উনকো লে জায়েগা।' বলে বাবার দিকে অগ্রসর হলো। মা পিছে পিছে যেতে যেতে বললেন, 'কাঁহা লে জায়েগা?' অফিসার কেবল বলল, 'লে জায়েগা।' আর বাবার হাত ধরল। বাবা কেবল বলল, 'উহ।' বাবাকে নিয়ে যাওয়ার পরেই আমি টেলিফোনের দিকে দৌড় দিলাম। সৈন্যরা তখন সবাই চলে গেছে। বাবার সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল। ভারি গলায় বললেন, 'আমাকে আমার নাম জিজ্ঞেস করেছে, তারপর ধর্ম। আমি হিন্দু বলতেই গুলি করার অর্ডার দিয়েছে। গুলি আমার ঘাড় ও কোমরে লেগেছে। আমি আমার পা নাড়াতে পারছি না; শরীর প্যারালাইসিস হয়ে গেছে।' এরপর ক'টা দিন হাসপাতালে ছিলেন বাবা। তারপর আকাশের তারা হয়ে গেলেন।
এত বছর পর যখন ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চের মতো দিনগুলো উদযাপিত হয়, নেহাতই আনুষ্ঠানিকতার পুরু ফ্রেমে তখন খুঁজে পাওয়া যায় না সেই অপার বেদনাবোধ, বুকে বুকে জেগে ওঠা স্বজন হারানোর দাহন। অথচ সেই দাহন, সেই বোধ কি নিঃশেষ হয়ে গেছে? বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, যারা দেখেননি কিন্তু বড় হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে হারানো স্বজনের স্মৃতি লালন করে, যাদের দৈনন্দিন জীবনের মোড়ই ঘুরে গেছে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে, তাদের সবার মধ্যেই রয়েছে সেই বোধ। কোনো চাপিয়ে দেওয়া মতাদর্শ নয়। কোনো আরোপিত মূল্যবোধ নয়, কোনো সরকারি আনুষ্ঠানিকতা নয়, নেই বেদনাবোধ থেকেই জন্ম নেবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ- এটাই আমার বিশ্বাস। আর বাবার বন্ধু পরলোকগত কবি আব্দুল হাজারির ভাষায়- 'এই বিশ্বাসই আমার জ্ঞান/ আমার জ্ঞানই আমার ঈশ্বর।'



বিষয় : স্বাধীনতার ক্ষতচিহ্ন

মন্তব্য করুন