যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক আর পথ যত বন্ধুরই হোক না কেন, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলবোই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১০ দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঘোষিত হয়েছে এই প্রত্যয়।
দেশের ইতিহাসের এই অনন্য উদযাপনে অংশ নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিংসহ বিশিষ্টজন জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ এখনও বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষের অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ অগ্রগতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এই ১০ দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজনের শেষ দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিটি কাজে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। সকল ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে এক করে দেখলে চলবে না।
শেষ দিনের এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে দক্ষিণ এশিয়াকে উন্নত-সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারত এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ দেশ। একটি স্থিতিশীল ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে ভারতকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমরা যদি পরস্পরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসি, তাহলে আমাদের জনগণের উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবী। ভেদাভেদ ভুলে জনগণের মঙ্গলের লক্ষ্যে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে 'মুজিব চিরন্তন' প্রতিপাদ্যে ১০ দিনের এই অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। যা গতকাল শেষ হয়েছে। শেষ দিনের আয়োজনের থিম ছিল 'স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা'।
এদিন বিকেল পৌনে ৫টার কিছু পরে ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর পর 'মুজিব চিরন্তন' প্রতিপাদ্যের ওপর টাইটেল অ্যানিমেশন ভিডিও, মুজিব শতবর্ষের আবহ সংগীত এবং 'স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা' থিমের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন শেষে শুরু হয় আলোচনা পর্ব।
আলোচনা পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। স্বাগত সম্ভাষণ প্রদান করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে পাঠানো যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস-এর ভিডিওবার্তা প্রচার করা হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শুভেচ্ছাবার্তা পাঠ করে শোনানো হয়।
আলোচনা পর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের বক্তব্যের পর সম্মানিত অতিথিদের হাতে 'মুজিব চিরন্তন' শ্রদ্ধা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। সভাপতির বক্তব্য দেওয়ার পর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর লোগো উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আলোচনা পর্ব শেষে আধা ঘণ্টার বিরতি দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্ব শুরু হয়- যা চলেছে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ছাড়াও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী দর্শকসারিতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
বঙ্গবন্ধুর 'গান্ধী শান্তি পুরস্কার' নিলেন তার মেয়ে
জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানমালার শেষ দিনের অনুষ্ঠানমঞ্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভারত সরকারের দেওয়া 'গান্ধী শান্তি পুরস্কার' তার ছোট মেয়ে শেখ রেহানার হাতে তুলে দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে নরেন্দ্র মোদির হাত থেকে এই পুরস্কার নেন শেখ রেহানা।
পরে সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এটা ভারতের জন্যও গর্বের যে, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গান্ধী শান্তি পুরস্কার দিতে পেরেছি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২০২০ সালের জন্য 'গান্ধী শান্তি পুরস্কার' দেওয়া হয়েছে। এই পুরস্কারের বিচারকম লীর প্রধান ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার বাংলাদেশ সফরের আগেই গান্ধী শান্তি পুরস্কারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষণা করে ভারতের সরকার। গান্ধী পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি রুপি; সঙ্গে দেওয়া হয় মানপত্র ও ঐতিহ্যপূর্ণ হস্তশিল্প সামগ্রী।
দেশ ও জনগণের উন্নয়ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের একক দায়িত্ব নয় :রাষ্ট্রপতি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেন, দেশ ও জনগণের উন্নয়ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের একক দায়িত্ব নয়। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এটা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। স্বাধীনতা মানুষের অধিকার। অধিকারকে অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলেই স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে ওঠে। আবার অধিকারের অপপ্রয়োগ স্বাধীনতাকে খর্ব করে।
তিনি বলেন, আজকের দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের, গর্বের ও সম্মানের। কারণ ১৯৭১ সালে মার্চের এই দিনের প্রথম প্রহরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই স্বাধীনতা এক দিনে বা হঠাৎ করে আসেনি। অনেক ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু শুধু বঙ্গের বন্ধু হয়েই থাকেননি, হয়ে উঠেছেন বিশ্ববন্ধু। সারাবিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের আপনজন। বঙ্গবন্ধুকে জানা ও বোঝার জন্য জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এই উদযাপনকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর জীবন-কর্ম এবং তার নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাভাষা ছাড়াও বিদেশি বিভিন্ন ভাষায়ও যাতে বঙ্গবন্ধুকে আন্তর্জাতিক পরিম লে যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গবেষক, ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তুলে ধরে আবদুল হামিদ বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধু অনুসৃত 'কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব' নীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে কূটনৈতিক অঙ্গনে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকর ও সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। আশা করি, অচিরেই অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যুরও সুষ্ঠু এবং মর্যাদাপূর্ণ নিষ্পত্তি হবে।
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ভারতের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করে আবদুল হামিদ বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বমানবতার ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। আশা করি, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানেও ভারতসহ বিশ্ব সম্প্রদায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, 'গৌরব ও ত্যাগের অনুপম বীরত্বগাথা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। আমরা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জনকারী জাতি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সুবর্ণ আলো দেখতে পাই। জাতির পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাব- মুজিব জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণে এটাই হোক আমাদের চাওয়া-পাওয়া।'
দক্ষিণ এশিয়াকে উন্নত-সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর
সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে আমরা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছি। গত ১২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ অর্জন করেছে। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের এই শুভ মুহূর্তে আসুন প্রতিজ্ঞা করি, সব ভেদাভেদ ভুলে আমরা জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করব। দক্ষিণ এশিয়াকে উন্নত-সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি তিনি স্বপ্ন দেখতেন অর্থনৈতিক মুক্তির। এজন্য পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা এবং সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালায় অংশগ্রহণ এবং সাম্প্রতিক করোনা সংকটসহ সবসময় বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকার জন্য দেশটির সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। সেইসঙ্গে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার এবং সেদেশের জনগণের অসামান্য ত্যাগ ও সহযোগিতাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাধীনতা সম্মাননা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়িকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননাসহ ২২৫ জন ভারতীয় নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ভারত সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এই শুভ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মর্যাদাশীল 'গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০'-এ ভূষিত করার জন্য। আমি মনে করি, তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করার মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একজন যোগ্য নেতা এবং গান্ধীজির প্রকৃত অনুসারীকেই সম্মানিত করল।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতে শরণার্থী জীবনযাপনের কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের জনগণ এবং সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমার পিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমরা দু'বোন জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যাই। সে সময় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান আমাদের দেশে ফিরতে বাধা দিলে আমরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ি। আমার পরিবার এবং ছোট বোন শেখ রেহানাকে ভারত সরকার তখন আশ্রয় দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত শুধু নিকটতম প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রই নয়, ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত এবং ভৌগোলিক সেতুবন্ধ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে ভারতের সরকার এবং সেদেশের জনগণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বর্তমানে আমাদের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদিজির 'প্রতিবেশী সর্বাগ্রে' নীতির প্রশংসা করি। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের টিকা পাঠানোর মাধ্যমে মোদিজির এই নীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বেড়েছে। ভারত আমাদের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য সম্প্রতি ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে। এই রাজ্যগুলো এখন চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবে।
বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজন :'স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা' শীর্ষক গতকালের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার শুরুতে ভারতের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ পি ত অজয় চক্রবর্তীর পরিবেশনায় বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে নবনির্মিত রাগ 'মৈত্রী' পরিবেশিত হয়।
এরপর একে একে 'পিতা দিয়েছে স্বাধীন স্বদেশ, কন্যা দিয়েছে আলো' শীর্ষক থিমেটিক কোরিওগ্রাফি, 'বিন্দু থেকে সিন্ধু' শীর্ষক তিনটি কালজয়ী গান এবং ঢাক-ঢোলের সমবেত বাদ্য ও কোরিওগ্রাফি সহযোগে 'বাংলাদেশের গর্জন আজ শুনুক পুরো বিশ্ব' পরিবেশিত হয়। সবশেষে ফায়ার ওয়ার্কস ও লেজার শোর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
শেষ হলো ১০ দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজন :স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মবার্ষিকীর দিন থেকে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে 'মুজিব চিরন্তন' প্রতিপাদ্যের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। গতকাল মহান স্বাধীনতা দিবস ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে এটি শেষ হয়েছে।
১০ দিনের অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী পাঁচটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সশরীরে যোগ দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের ভিডিওবার্তা অথবা শুভেচ্ছাবার্তা পাঠ করে শোনানো হয়েছে। অনেক নেতা লিখিত অভিনন্দন বার্তাও পাঠিয়েছেন।
প্রতিদিন আলাদা আলাদা থিমের ওপর আলোচনা পর্ব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল এবং অন্যান্য বিশেষ পরিবেশনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। স্মরণ করা হয়েছে স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও ছিল মনোমুগ্ধকর।
১৭ মার্চ প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের থিম ছিল 'ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়'। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। সম্মানিত অতিথি ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। ১৮ মার্চ দ্বিতীয় দিনে 'মহাকালের তর্জনী' থিম নিয়ে ছিল থিমভিত্তিক আলোচনা। তৃতীয় দিন ১৯ মার্চ 'যতকাল রবে পদ্মা যমুনা' থিমের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে।
চতুর্থ দিন ২০ মার্চ ছিল 'তারুণ্যের আলোকশিখা' থিমের অনুষ্ঠান। পঞ্চম দিন ২১ মার্চের অনুষ্ঠানের থিম ছিল 'ধ্বংসস্তূপে জীবনের গান'।
ষষ্ঠ দিন ২২ মার্চ 'বাংলার মাটি আমার মাটি' থিমের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সম্মানিত অতিথি ছিলেন নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী।
সপ্তম দিন ২৩ মার্চ ছিল 'নারীমুক্তি, সাম্য ও স্বাধীনতা' থিমের অনুষ্ঠান। অষ্টম দিন ২৪ মার্চের অনুষ্ঠানের থিম ছিল 'শান্তি, মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত'। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। নবম দিন ২৫ মার্চের অনুষ্ঠানের থিম ছিল 'গণহত্যার কালরাত্রি ও আলোকের অভিযাত্রা'।
শেষ দিন গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল 'স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা'। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
১০ দিনের এই অনুষ্ঠানমালায় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চুং সেয় কিউন, ভ্যাটিকানের পোপ দ্বিতীয় ফ্রান্সিস, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভ, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসেফ আল ওথাইমিন, ইউনেস্কোর মহাপরিচালক অড্রে আজুলে, ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী, ফ্রান্সের সিনেটর জাকুলিন ডেরোমেডিসহ অনেকেই। এ ছাড়া আরও অনেক দেশের নেতারা শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছেন।

বিষয় : জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

মন্তব্য করুন