শর্ত ভেঙে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন প্রকল্পের ১২টি কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানির পর তৎপর হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি মেসার্স তানভীর ট্রেডার্স নামে বেবিচকের তালিকাভুক্ত ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া কাজও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ)-২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০০৮ এর বিধান অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানকে অর্থবছরের শুরুতেই বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রস্তুত করে অনুমোদন করাতে হয়। তবে বেবিচক তা প্রস্তুত না করেই বছরের বিভিন্ন সময়ে অনিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে। সুনির্দিষ্ট ক্রয় পরিকল্পনা না থাকায় একটি একক প্রকল্পকে বিধিবহির্ভূতভাবে কখনও কখনও একাধিক ভাগে বিভক্ত করেও বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বেবিচকের তালিকাভুক্ত শতাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বছরে সব কাজ চিহ্নিত ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করে আসছেন।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকাতে অনেক সময় ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পদ্ধতিতে বিভিন্ন দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, বেবিচকের সংশ্নিষ্ট প্রকৌশল শাখার এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর কারণে তাদের মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একাধিক কাজ পাচ্ছে।

ভুক্তভোগী বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, বেবিচকের গেট নির্মাণ, জেনারেটর ক্রয়, মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ১৮ প্রকৌশলীসহ ২২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তদন্ত করছে মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিব স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন বেবিচকে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, বেবিচকের তালিকাভুক্ত মেসার্স তানভীর ট্রেডার্সকে কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন শাখা থেকে ১২টি প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়। এসবের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর, ই/এম বিভাগ-১ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩টি কার্যাদেশের বিপরীতে ২ কোটি ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৮১৩ টাকা ১৩ পয়সা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১টি কার্যাদেশের বিপরীতে ৬৬টি লাখ ৪০ হাজার ৮০০ টাকা ১৬ পয়সা, ই/এম বিভাগ-২ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪টি কার্যাদেশের বিপরীতে ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮০৮ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১টি কার্যাদেশের বিপরীতে ১৬ লাখ ১ হাজার ৬৭ টাকা, সিভিল ডিভিশন-১ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২টি কার্যাদেশের বিপরীতে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৯ টাকা ৩১ পয়সা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮টি কার্যাদেশের বিপরীতে ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৯৭ হাজার ৭৪০ টাকা ৮৬ পয়সা এবং বেবিচক সদর দপ্তর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩টি কার্যাদেশের বিপরীতে ২ কোটি ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪৯ টাকা ৯৫ পয়সার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সর্বমোট ১২টি কার্যাদেশের বিপরীতে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৪১০ টাকা ৩৯ পয়সা ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০টি কার্যাদেশের বিপরীতে ৭ কোটি ৭১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৮ টাকা ২ পয়সার কার্যাদেশ ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিমান ও সিএ) জনেন্দ্র নাথ সমকালকে বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেবিচকের নেওয়া সব প্রকল্প এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত নেওয়া প্রকল্পগুলোর বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা থেকে প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প যথাযথভাবে প্রস্তুতকরণ, প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের গোপনীয়তা রক্ষা, ই-জিপিতে টেন্ডার সম্পাদন, বিধি অনুসারে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, কাজ শেষের পর চূড়ান্ত বিল দেওয়ার সময় বিধি অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে বিল দেওয়া হয়েছে কিনা, তা যাচাই এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে নেওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ১০ শতাংশ প্রকল্পের সরেজমিন যাচাই করে কাজের মান/পরিমাণ বিষয়ে তদন্ত করে মতামত দেওয়ার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব কাজ বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় বেবিচককে।

বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল মালেক সমকালকে বলেন, যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের শর্ত পূরণ করে, তাদের কাজ দেওয়া হয়। এখানে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। তিনি বলেন, ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ নেই। বর্তমান সরকারের সময় বেবিচকের নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে উন্নয়ন কাজ চলছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পে কারও বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।