আধুনিক সভ্যতার অন্যতম উপাদান বিদ্যুৎ। উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তাই বলা হয়, বিদ্যুতের শক্তি অপরিসীম। একটা সময় ছিল, যখন সারাদেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। জেলার পর জেলা থাকত অন্ধকারে। বিদ্যুতের অভাবে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিভিন্ন উপকেন্দ্রে হামলা করত। হরতালসহ বড় আন্দোলনও হতো এই বিদ্যুতের দাবিতে। সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। দেশ এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ। ৯৯ শতাংশ মানুষ বর্তমানে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়। মাথাপ্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টা। তবে বিদ্যুৎ বিতরণে এখনও কমবেশি সমস্যা রয়েছে। ফলে কোনো কোনো স্থান থেকে এখনও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর আসে।
৫০ বছর আগের কথা :একাত্তরের মার্চে শুরু হলো বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হলো বাংলাদেশ। ফলে ইতিহাসে এই সালে ঠিক কত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, তার বিশ্বাসযোগ্য সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র ৪৭৫ মেগাওয়াট। ১৯৭২ সালে দেশে স্থাপিত বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫০০ মেগাওয়াট। তবে এই ক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎও উৎপাদন করা যেত না। এই সামান্য পরিমাণ বিদ্যুৎ নিয়েই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এখন উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে সংযোগ চাহিদা আছে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতা দ্বিগুণ।
ব্রিটিশ আমলের কথা :বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, আজ থেকে প্রায় ১২৫ বছর আগে ব্রিটিশ শাসিত পূর্ববঙ্গে গাজীপুর জেলার ভাওয়াল পরগনার রাজা প্রথম বিদ্যুতের ব্যবহার করেন। তিনি বিলাত থেকে একটা জেনারেটর আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রাজবাড়ি আলোকিত করেন। এর পর ১৯০১ সালে ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহর বাসভবনে একটি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পর্যায়ক্রমে ঢাকার কয়েকটি অভিজাত ভবনকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ :উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি বিদ্যুৎ হলেও এ খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। স্বাধীনতার আগে থেকেই বিদ্যুৎ খাত ছিল সরকারনির্ভর। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ছিল না। ফলে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ছিল অত্যন্ত ঢিমেতালে। আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা এ খাতে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এ খাতে কমবেশি বিনিয়োগ শুরু হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন সময়সাপেক্ষ। ফলে রাতারাতি এ খাতে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এ সময় বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি মালিকানার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আইপিপি অর্থাৎ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার নীতিমালা করা হয়। এ সরকারের আমলেই দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগ হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। বেসরকারি খাত থেকেই ১২৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি করা হয়। বিদ্যুৎ খাতে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর পর ক্রমেই উৎপাদন বাড়তে থাকে। বর্তমানে বেসকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ৮৯; উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৩৬৪ মেগাওয়াট। আর সরকারি খাতে কেন্দ্রের সংখ্যা ৫৪; উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৫৪৪ মেগাওয়াট।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড :সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে গঠিত হয় আরইবি অর্থাৎ রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ড। উদ্দেশ্য ছিল দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করা। এটি বিদ্যুৎ খাতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এ সংস্থার দায়িত্ব ছিল পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন নির্মাণ করা। এই বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করতে থাকে। কিন্তু উৎপাদন ঘাটতি থাকার কারণে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল খুবই কম। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে পল্লী অঞ্চলে বিতরণ অবকাঠামোও দ্রুত বাড়তে থাকে। এখন সারাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আছে। শুধু পাহাড়ি ও দুর্গম কিছু এলাকা ছাড়া সারাদেশেই পল্লী বিদ্যুতের লাইন আছে। বর্তমানে আরইবির গ্রাহকই ৩ কোটি ১১ লাখ। ৮০টি সমিতির মাধ্যমে সারাদেশের গ্রামাঞ্চলে এ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
একবিংশ শতকের শুরু :একবিংশ শতকের শুরুতে ২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক উন্নয়নের গতি আবারও শ্নথ হয়ে পড়ে। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা, দুর্নীতির কারণে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় মাত্র নতুন ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। যদিও প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকে। ঘাটতির কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ২০০৬ সালের মে মাস নাগাদ ১ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করে। এ সময় বিদ্যুতের দাবিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে। একই সময় রাজধানীর শনিরআখড়ায় হাজার হাজার এলাকাবাসী বিদ্যুৎ ও পানির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, আগুন, ভাঙচুর ছিল নিয়মিত ঘটনা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছর :সেনা সমর্থিত এ সরকারের আমলেও এ খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে বারবার পরিবর্তন আসে। কিন্তু এ খাতের চেহারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর এ সরকার জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার। ২০০৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। প্রকৃত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল যদিও ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট (৬ জানুয়ারি, ২০০৯)। এর পরই বিদ্যুৎ খাতে এক প্রকার বিপ্লব সূচিত হয় এ সরকারের আমলেই।
বিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব :স্বাধীনতার পর গত ৩৮ বছরে যা হয়েছে; গত ১২ বছরে বিদ্যুৎ খাতে তার চেয়ে অনেক গুণ উন্নতি হয়েছে। গত ১২ বছরে এ খাতে যুগান্তকারী উন্নয়ন হয়েছে। সে ধারা এখনও চলমান। এই ১২ বছরকে বিদ্যুৎ খাতের সোনালি অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। এর পর বিদ্যুৎ খাতের চেহারা দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। ২০০৯ সালের শুরুতে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল মাত্র ২৭টি। বর্তমানে ১৪৪টি। ১২ বছরে বেড়েছে ১১৭টি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট। বেড়েছে ২০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সঞ্চালন লাইন ছিল ৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার; বর্তমানে ১২ হাজার ৬৯২ কিলোমিটার। বেড়েছে ৪ হাজার ৬৯২ কিলোমিটার। গ্রিড উপকেন্দ্র ছিল ১৫ হাজার ৮৭০টি। বর্তমানে ৪৯ হাজার ৩৮৪টি। বেড়েছে ৩৩ হাজার ৫১৪টি। বিতরণ লাইন ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে ৬ লাখ ৩ হাজার কিলোমিটার। বেড়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার কিলোমিটার। বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিল ১ কোটি ৮ লাখ। বর্তমানে ৩ কোটি ৯৬ লাখ। বেড়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ। সিস্টেম লস ছিল ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বর্তমানে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ :বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও এ অবধি সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট। ব্যাখ্যা হলো- বিদ্যুৎ এমনই একটা পণ্য, এটা মজুদ করা যায় না। যখন যতটুকু উৎপাদন হয়, তখন ততটুকুই বিতরণ হয়ে যায়। সারাদেশে বর্তমানে যে সংযোগ আছে (আবাসিক, বাণিজ্য, শিল্প মিলিয়ে), সেখানে সংযোগ চাহিদা ওই ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ কাঠামো সর্বোচ্চ ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ কোনো একদিন সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও বর্তমানে এর দ্বিগুণ পরিমাণ উৎপাদন করার সুযোগ আছে। বর্তমানে চাহিদা বাড়লেও তা পূরণ করা কোনো সমস্যা হবে না। কারণ ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। বিশ্নেষকরা জানান, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উৎপাদন ক্ষমতা সব সময় কিছুটা উদ্বৃত্ত রাখা হয়। কারণ যে কোনো সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি অচল হয়ে পড়তে পারে। তবে আমাদের দেশে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ। হাজার হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ অলস বসে থাকলে তার জন্য আর্থিক ক্ষতি হয়। চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করে উৎপাদন সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণ হয়নি বলেই এ অবস্থা হয়েছে বলে বিশ্নেষকরা মনে করেন।
জ্বালানির বহুমুখীকরণ :বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন বহুমুখী জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ নীতি অনুসরণ করা হয়। কারণ বিশ্ববাজারে বিভিন্ন রকম জ্বালানির মূল্য ওঠানামা করে। আমাদের দেশে এক সময় অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। এখন গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা, ফার্নেস অয়েল, পারমাণবিক শক্তি, ডিজেল, পানি, সৌরশক্তি, বায়ু ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির কথা বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সোলার বা সৌর, বায়ু, পানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাস্টারপ্ল্যান :বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যানে ভিশন-২০৩০ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ মুখ্য জ্বালানির উৎস তৈরি করতে হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৫০ শতাংশ জ্বালানির চাহিদা মেটাতে হবে, যার ২৫ শতাংশ হবে কয়লা, ২০ শতাংশ হবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বাকি ৫ শতাংশ হাইড্রো ও নবায়নযোগ্য শক্তি।
বর্তমানে অর্থাৎ ২০২১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ৫২ শতাংশ, ফার্নেস অয়েল ২৭ শতাংশ, ডিজেল ৬ শতাংশ, কয়লা ৮ শতাংশ, জল ১ দশমিক ১ শতাংশ, গ্রিড সোলার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, বিদ্যুৎ আমদানি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ভিশন ২০৩০-এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিবেশ দূষণ ও এসডিজির দিকে লক্ষ্য রেখে সরকার মাস্টারপ্ল্যানে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।




বিষয় : বিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব

মন্তব্য করুন