করোনা সংক্রমণের কারণে দেশের সবকিছু যখন স্থবির, তখনও সচল ছিল কৃষির চাকা। দুঃসময়ে কৃষিই সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। শুধু করোনা সংকটে নয়, গত ৫০ বছরে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে কৃষি বার বার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এসেছে বিস্ময়কর সাফল্য ও অভাবনীয় উন্নতি।
এক সময় বলা হতো 'দুধে ভাতে বাঙালি' কিংবা 'মাছে ভাতে বাঙালি'। সেই স্লোগানও এখন বদলে গেছে। কৃষি এখন শুধু দুধে ভাতে বা মাছে ভাতে সীমিত নয়, পুষ্টিতেও এদেশ বিশ্বদরবারে প্রশংসিত হচ্ছে। অপ্রচলিত নানা কৃষিপণ্যে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। প্রযুক্তির ছোঁয়া পেয়েছে কৃষি। বদলে যাওয়া এই সময়ে কৃষিতে যুক্ত হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণরাও। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অনন্য উদাহরণ।
কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের অগ্রগতিতে প্রধান ভূমিকা কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদের। তাদের সাফল্যের কারণে খাদ্যঘাটতি থেকে আজ খাদ্যে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৯৭১-৭২ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ, তা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। তারপরও বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, গরু-ছাগল উৎপাদনে দ্বিতীয়, মৌসুমি ফলের মধ্যে কাঁঠাল উৎপাদনে প্রথম, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম। ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনেও ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশ।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকেই কৃষকদের সব বকেয়া খাজনার সুদ মওকুফ করে দেন। তিনি কৃষিবিপ্লব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যুগোপযোগী ভূমি সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেন। জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি ও খাসজমি ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেন। পাকিস্তানি আমলে দায়ের করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেন।
মন্ত্রী বলেন, গঙ্গা নদী থেকে অধিক পানিপ্রাপ্তি, সেচ ব্যবস্থার প্রসার, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশকের ব্যবহার, নানা ধরনের প্রণোদনা এবং সার্বিক কৃষকবান্ধব নীতির ফলে কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতির ধারা সূচিত হয়েছিল। এরপর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
কৃষি গবেষকরা মনে করেন, কৃষকের এই অবদানকে বাঁচিয়ে রাখতে উৎপাদিত পণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন। সর্বোচ্চ উৎপাদনের পাশাপাশি সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শফিক উজ জামান বলেন, বাংলাদেশের কৃষি খাতকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৃষিপণ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। না হলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১ কোটি ৬০ লাখ কৃষক পরিবার সবজি চাষে জড়িত। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে ১ কোটি ৬২ লাখ টন সবজি উৎপাদন হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ পরিবার প্রতিবছর ১ কোটি ৫ লাখ হেক্টর একর জমিতে ধান চাষ করছে। গত ৫০ বছরে ধানের জমি কমলেও উৎপাদন বেড়েছে। ১৯৭১-৭২ সালে ধান উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টন। ২০০৯-১০ সালে দেশে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ টন, সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টনে পৌঁছেছে। করোনার মধ্যেও বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ডাল, তেলজাতীয় শস্য, শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদনও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। ২০০৬ সালে দেশে ২ কোটি ৬১ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিল, যা ২০১৯-২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৩ হাজারে উন্নীত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, কৃষি খাতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চফলনশীল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার, সেচব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ জমিতে বোরো চাষের সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে ভর্তুকি প্রদান, কৃষিঋণ পদ্ধতির সহজীকরণ, ফসলের বহুধাকরণ, কৃষির লাগসই যান্ত্রিকীকরণ, উচ্চফলনশীল ফসল, তরিতরকারি, মাছ, হাঁস-মুরগি ও ফলমূল চাষের ব্যাপক প্রচলন, আধুনিক রাসায়নিক সার, বীজ ও কীটনাশকের সহজলভ্যতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসবের ফলে দেশে একটি কৃষিবিপ্লবের সূচনা হয়েছে।
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে করোনার শুরু থেকেই সরকার নানা পদক্ষেপ নেয়। ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ধানকাটার যন্ত্রপাতি বিতরণ ও হাওর অঞ্চলসহ সারাদেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কৃষিশ্রমিকের যাতায়াতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সারাদেশে ১৭৫২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপারসহ কৃষিযন্ত্রপাতি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা হয়। কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ২৬২ কোটি টাকার চারা, বীজ ও কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়। ২ লাখ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধান চাষের জন্য ৭৬ কোটি টাকার হাইব্রিড বীজ বিনামূল্যে এবং বোরো ধান বীজে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হয়। সেচের মূল্য ৫০ শতাংশ কমানো হয়। এছাড়া, পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য ২৫ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। ১৯৭০ সাল থেকে দেশি জাতকে উন্নত করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবন করছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ১০৫টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) করেছে ১৮টি ধানের জাত। ১১৫টি হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) ৪১৭টি জাত অবমুক্ত করেছে। বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) এ পর্যন্ত অবমুক্ত করেছে ২৬টি জাত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও এরই মধ্যে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কৃষির ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। বাংলাদেশের আজকের অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে কৃষি উন্নয়ন, শিল্প এবং কৃষিতে প্রযুক্তির সংযোজন।
কৃষিখাতে অভূতপূর্ব সাফল্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফসল বলে দাবি করেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, সরকার প্রথম থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তরিক ছিল। বর্তমান সরকার যেভাবে কৃষিখাতে আর্থিক সমর্থন ও নীতিগত সহায়তা দিয়েছে তা অন্য যে কোনো সময়ের থেকে বেশি। কৃষিখাতে এ অভূতপূর্ব সাফল্য সরকারের সহায়তা ছাড়া সম্ভব ছিল না।

মন্তব্য করুন