কয়েকশ সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যালোচনা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারি-বেসরকারি অন্তত ৪২টি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও হামলাকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু স্পটে হামলার নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের একজন হলেন সাইফুল ইসলাম। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বুদল ইউনিয়ন শিবিরের সাধারণ সম্পাদক। পুলিশের ভাষ্য, গত রোববার সাইফুল জেলার বিশ্বরোডের হাইওয়ে থানায় আক্রমণ ও আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার বাবা মাওলানা লিয়াকত আলীও জামায়াতের নেতা। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে তাণ্ডবের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত জেলায় ২০টি মামলা হয়েছে। ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে শিবির নেতা সাইফুলও রয়েছেন। তদন্তে একটা বিষয় দেখা যাচ্ছে, হেফাজত ছাড়াও জামায়াত-শিবিরের অনেকে এই নৈরাজ্যে সরাসরি জড়িত ছিল। কে কোন স্পটে হামলায় নেতৃত্ব দেয় তা বের করা হচ্ছে। ভয়ংকর এই নাশকতায় জড়িত কেউ কেউ এরই মধ্যে এলাকা থেকে পালিয়েছে। তবে দীর্ঘসময় পালানোর পথ তারা পাবে না। অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঘুরে দেখা যায়, শহরজুড়েই ধ্বংসস্তূপের ছাপ। জনমনে এখনও আতঙ্ক আর উদ্বেগ। জেলা সার্কিট হাউস ভবনের নিচতলার সব গ্লাস ভাঙা। ভবনের পাশে পার্কিংয়ে থাকা ৮টি গাড়ি লণ্ডভণ্ড। হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত 'মোবাইল থেরাপি ভ্যান-১৯'ও। সার্কিট হাউসের সামনে এসআই পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, '১৩ বছরের চাকরি জীবনে এমন নৃশংসতা দেখিনি। ৩-৪ হাজার ব্যক্তি পুলিশ লাইন্সে একযোগে আক্রমণ করেছিল। তাদের সবার হাতে ছিল নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্র। পুলিশ লাইন্সের দিকে বৃষ্টির মতো ইটের টুকরো নিক্ষেপ করছিল তারা। সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে এখনও আঁতকে উঠি।'

হেফাজতের কর্মসূচিতে হামলার শিকার হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের জেলার স্টাফ রিপোর্টার রিয়াজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ঘটনার দিন প্রেস ক্লাবের অদূরে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে অবস্থান করছিলাম। আশপাশে শত শত লোক। হঠাৎ কয়েকজন চিৎকার করে বলছিল, 'প্রেস ক্লাবের সভাপতি যাচ্ছে। ও আওয়ামী লীগের লোক। ধর, ওকে শিক্ষা দিতে হবে।' এরই পরপরই লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার ওপর হামলা হয়। পরে কয়েকজন সহকর্মী আমাকে রক্ষা করেন।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনি বলেন, বারবার ধর্মান্ধ একটি গোষ্ঠী মুক্তবুদ্ধি আর শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার কেন্দ্রে হামলা করছে। অতীতেও একাধিকবার একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। সেই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে তারা বারবার হামলা করার দুঃসাহস দেখাত না। এখন এলাকার জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে হলে দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি কক্ষে আগুনে পোড়া ছাই ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই। চোখের সামনে প্রিয় সংগীতাঙ্গন পুড়তে দেখেন সাজন সরকার নামে এক তরুণ। তিনি বলেন, শহরজুড়ে জ্বালাও-পোড়াও হচ্ছে এটা জানার পর আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনের সামনে আসি। দেখি কয়েকশ লোক ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ভয়ে পাশের হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নিই। সেখান থেকে প্রিয় প্রতিষ্ঠানটি পুড়তে দেখি। তবে কিছু করার ছিল না- এই আক্ষেপ সারা জীবন বয়ে বেড়াব।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের নাশকতার পর সিসিটিভির ফুটেজ দেখে প্রথমে সাইফুলের চেহারা শনাক্ত করা হয়। এরপর তার পূর্ণ নাম-ঠিকানা বের করে পুলিশ। সাইফুল ছাড়াও ফুটেজ দেখে এরই মধ্যে আরও কয়েকজন নাশকতাকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাশকতায় সামনের সারিতে থাকা আরেক শিবির নেতারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ওই নেতার গ্রামের বাড়ি সরাইলে। তদন্তের এই পর্যায়ে তার নাম প্রকাশ করতে চাননি সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ওই দিনের ঘটনায় হেফাজতের উগ্র সমর্থকদের পাশাপাশি জামায়াত-শিবির, বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা। এছাড়া সরকার সমর্থক বা আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত কেউ এসব অপকর্মে কোনোভাবে ইন্ধন দিয়েছে কিনা তাও দেখা হচ্ছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে ওই জেলায় হেফাজতকে গোপনে অর্থ ও পরামর্শ জুগিয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দিয়ে আসছেন একজন জামায়াত নেতা। তিনি পেশায় চিকিৎসক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার ক্লিনিক রয়েছে। এবারও হেফাজতকে নানাভাবে তিনি সহযোগিতা করেছেন। তার ভূমিকার বিষয়টি নিয়ে আরও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে একাধিক সংস্থা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারী ও নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এসব এলাকার একাধিক মাঠ কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীরা প্রায়ই ঢুকে যায়। হেফাজতের পাশাপাশি তারাও জ্বালাও-পোড়াওয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকে। বিশেষ করে হেফাজত কর্মসূচি দিলেই জামায়াত-শিবিরের একটি গ্রুপ বারবার সুযোগ নিচ্ছে। হেফাজতের সঙ্গে মিলেমিশেই সরকারি স্থাপনা তারা টার্গেট করে।

জানা যায়, হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৪৫টি মামলায় ২০ হাজারের বেশি আসামি করা হলেও গতকাল পর্যন্ত সংগঠনটির কোনো বড় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এমনকি এসব মামলায় হেফাজতের কোনো নেতার নামও উল্লেখ করা হয়নি।