করোনাভাইরাস সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় আগামী সোমবার থেকে আবারও এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ নিয়েই কথা হলো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। খিলক্ষেত এলাকার মাঝ বয়সী রিকশাচালক দবিরুল বললেন, 'ভাই, আমি দিনে আনি দিনে খাই। রিকশার চাকা বন্ধ থাকলি খুব কষ্ট হয়। এইডা কেমনে বোঝাই।' 

গতবারের লকডাউনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, 'নিজের গাড়ির চাকা বন্ধ, বড় ছেলেটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করত, তারেও কাজ থেকে ছাড়ায়ে দিল। দু-একদিন এক প্যাকেট রুটি, এক সের চাউল পাইছি। তিন মাস এক বেলা, দুই বেলা খায়ে কেমনে থাকছি, তার খবর তো কেউ রাখে নাই। এখন লকডাউনের খবর শুনতেছি। করোনা-ফরোনা বড়লোকের ব্যাপার। লকডাউন হইলে তাদের কষ্ট নাই, কষ্ট করি আমরা।'

বেসরকারি চাকরিজীবী শহীদুল ইসলাম বললেন, 'করোনা যে হারে বাড়ছে, সরকারের লকডাউন না দিয়ে তো উপায় নেই। সমস্যা হচ্ছে অফিস করা নিয়ে। আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। রাস্তায় গাড়ি না থাকলে যাতায়াতের খুব সমস্যা।' কথা হলো মুদি দোকানি আজীজের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'গত বছর একবার পথে বসেছি। এবার আবার কী হবে, কে জানে। করোনা জীবনটা শেষ করে দিল রে ভাই।'

গার্মেন্ট কর্মী খুশী জানালেন, লকডাউনে কারখানা খোলা থাকুক, এটাই চান। কারখানা বন্ধ হলেই চাকরি যাওয়ার ভয় আছে। লকডাউন দিলে তাদের জন্য কারখানার গাড়িতে যেন আনা-নেওয়া করা হয়, এটাই দাবি তার।

চট্টগ্রাম নগরের বাদুরতলা আরাকান সোসাইটির বাসিন্দা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, 'করোনা নিয়ে আমাদের সবার মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা ছিল। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকলেও একপর্যায়ে করোনার ঊর্ধ্বগতিতে সবাই উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় কঠোর সিদ্ধান্তের বিকল্প ছিল না। তবে সরকারকে মানুষের জীবিকার দিকটিও নজর দিতে হবে। না হলে লকডাউন ফলপ্রসূ হবে না।'

রাস্তার পাশে ভ্যানে শাক বিক্রি করেন মো. কাউসার। তিনি বলেন, 'লকডাউনে কী লাভ হবে জানি না। তবে আমাদের পেটে লাথি পড়বে।' নগরের দেবপাহাড় এলাকার গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার বলেন, 'লকডাউনের খবর শুনে ভয়ে আছি। ছেলেপেলে নিয়ে কীভাবে বাঁচব।'

সিলেট নগরীর বালুচর এলাকার কলোনির বাসিন্দা রিকশাচালক মতিন মিয়ার কপালেও চিন্তার ভাঁজ। তিনি বলেন, 'লকডাউনে সবকিছু বন্ধ থাকলে রাস্তায় যাত্রী পাওয়া যাবে না। আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে।' জিন্দাবাজারের তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী আতিক বলেন, 'গতবারের মতো এবারও ঈদের সময় সব বন্ধ থাকলে পথে বসতে হবে।'

বরিশাল মহানগর দোকান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি স্বপন দত্ত বলেন, 'আবার লকডাউন দেওয়ায় ওই পরিবারগুলোতে গভীর দুশ্চিন্তা নেমে এসেছে। দোকান কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে সোমবার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে কর্মচারীদের বেতন পাওয়া নিশ্চিতের দাবি জানানো হবে।' মৎস্য ব্যবসায়ী জহির সিকদার বলেন, 'এক বছর ধরে করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। এ অবস্থায় লকডাউন দেওয়া হলে মালিক-শ্রমিক সবাইকে পথে বসতে হবে।'

রাজশাহী নগরীর চা দোকানি মো. সোহেল বলেন, 'লকডাউন দিলে তো ক্ষতি। কাস্টমার পাব না। এই দোকানটাই আয়ের উৎস। দোকান বন্ধ রাখলে উপার্জন করার মতো কোনো কাজ থাকবে না।'

রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরের বটগাছ তলে বসে থাকা ভ্যানচালক আফজাল হোসেন বলেন, 'সউগ বন্ধ হয়্যা গেলে হামরা কী করি খামো। বাজার-ঘাট খুলবার ন্যায়, দোকানপাট বন্ধ থাকপে। কায় হামাক এক সপ্তাহের খাবার দেবে।'

শনিবার দুপুরে খুলনার আদালতের সামনের সড়কে চায়ের দোকানে বসে চা পানের সময় সরকারি কর্মচারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'যেভাবে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে লকডাউন খুবই যৌক্তিক।' তার কথা শুনে চায়ের দোকানি নূর ইসলাম বলেন, 'লকডাউন হলে তো আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। অসুবিধা হবে আমাদের মতো গরিবের।' 

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ব্যুরো ও রংপুর অফিস।