করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ না করলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র হয়তো অনেকটা অন্ধকারেই থেকে যেত। করোনাকালে চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষের নির্মম মৃত্যু দৃশ্যমান হচ্ছে। এই করোনা বছরের পর বছর হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রীর সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনাসহ স্বাস্থ্য খাতে চলা দুর্নীতির ক্ষতচিহ্নকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। গত পাঁচ দশকে ধাপে ধাপে স্বাস্থ্য খাতের যে উন্নয়ন হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গড় আয়ু বেড়েছে, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমার পাশাপাশি পোলিওর মতো অনেক রোগ থেকে মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। গড়ে উঠেছে বড় বড় হাসপাতাল ভবন, বেড়েছে কলেবর। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সব সময়ই বাজেট বরাদ্দে পিছিয়ে থেকেছে স্বাস্থ্য খাত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম বাংলাদেশে।
এমনকি বিশ্বের অনুন্নত কয়েকটি দেশের তুলনায়ও বরাদ্দ কম। যতটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে।
গত এক দশকে সার্বিকভাবে দেশের অবকাঠামো খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। একের পর এক সড়ক-মহাসড়ক, ফ্লাইওভারের পাশাপাশি হাতিরঝিলের মতো নয়নাভিরাম স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় স্থাপনার কাজ চলমান। দেশের উন্নয়নে এসব স্থাপনার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু করোনাকালে প্রশ্ন উঠেছে, মানুষের জীবন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন স্বাস্থ্য খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে, নাকি এসব উন্নয়ন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?
ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, করোনাকালে বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষার প্রতিদান দিয়েছে স্বাস্থ্য খাত। মানুষ ভর্তির জন্য হাসপাতালে শয্যা পাচ্ছে না। আইসিইউ সংকটে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে রোগী মারা যাচ্ছে। কিন্তু শুরু থেকে এই খাতটিকে গুরুত্ব দিলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। জেলা সদরের হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন। কারণ গ্রাম থেকে চিকিৎসা না পেয়ে মানুষ ঢাকায় ভিড় করে। সুতরাং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে বরাদ্দের পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়ে এগিয়ে নিতে হবে স্বাস্থ্য খাতকে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে না। আর মানুষের নিজের পকেট থেকে ব্যয় কমাতে হবে। কারণ চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষ এখনও ৬৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে। এই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্য বেড়েছে। সুতরাং বরাদ্দ বাড়িয়ে জনমুখী ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য খাত গড়ে তুলতে হবে।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য, সাবেক সভাপতি, বিএমএ



মন্তব্য করুন