গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খবর আসছে যে, টিকা নেওয়ার পরও করোনায় অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। কেন আক্রান্ত হচ্ছেন, সে ব্যাপারে কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আমরা পাচ্ছি না। ফলে জনমনে যে ধারণা জন্মাচ্ছে, তা হলো- করোনার টিকা আসলে কোনো কাজ করে না। সুতরাং এত কষ্ট করে লাইন দিয়ে টিকা দেওয়ার কী দরকার। এর পাশাপাশি কন্সপিরেসি থিওরি, যেমন টিকার মধ্যে মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দেওয়া, টিকার নিম্নমান এসব মিথ্যা প্রচারণা তো আছেই। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার প্রচারণায় স্বাভাবিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, চলমান টিকা দেওয়া কার্যক্রমেও তা খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। জনমনের এই বিভ্রান্তি কাটানো তথা কী কারণে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হতে পারে, তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা তুলে ধরলেই মানুষের বোধকরি ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর হবে।

আমরা বর্তমান সরকারের সুব্যবস্থাপনায় ও সুলভে ব্রিটিশ ও সুইডিশ প্রযুক্তির কল্যাণে সুইডিশ অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির কভিড-১৯ ভ্যাকসিন 'কোভিশিল্ড' টিকা হিসেবে নিচ্ছি। টিকাটি আমাদের দেশে সরবরাহ করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট। উৎপাদনের তারিখ থেকে ছয় মাস আয়ুসম্পন্ন এই ভ্যাকসিন অন্যান্য ভ্যাকসিনের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী তো বটেই। উপরন্তু ভ্যাকসিনটি সুবিধাজনক ২ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সংরক্ষণ বা পরিবহন করা সম্ভব। সেদিক দিয়ে তুলনা করলে ফাইজার বলা মডার্নার ভ্যাকসিন ইচ্ছে থাকলেও নেগেটিভ তাপমাত্রার কারণে আমাদের দেশে তার মোটেও ব্যবহার উপযোগী ছিল না। বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত ইপিআই কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা আর একই তাপমাত্রায় সংরক্ষণের সুবিধা থাকায় ভ্যাকসিনটি আমাদের দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতায় দেশের সম্মুখসারির যোদ্ধা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ৩০ মিলিয়ন ডোজ টিকা আমাদের পাওয়ার কথা। ৯ মিলিয়ন বা ৯০ লাখ ডোজ টিকা আমাদের হাতে থাকলেও ভারতে আশঙ্কাজনকহারে কভিড বিস্তার লাভ করায় তারা ভবিষ্যতে রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়তে পারে এবং ভ্যাকসিন সরবরাহে স্বাভাবিকভাবেই ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সরকার আগাম ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়ার স্পুটনিক অথবা চীনের সিনোভ্যাক, যার প্রযুক্তি কৌশল অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের সাযুজ্যপূর্ণ হওয়ায় তা বিকল্প ব্যবস্থাপনায় রাখার চিন্তাভাবনা করছে।

আমাদের ওপর প্রয়োগকৃত কোভিশিল্ডের আলোচনায় আবার ফিরে আসা যাক। এই ভ্যাকসিনটির আশাপ্রদ দিক হলো- ভারতের দায়িত্বশীল সরকারি মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তা নতুন ইউ, কে স্ট্রেইন আর ব্রাজিলিয়ান স্ট্রেইনের ওপর একই মাত্রায় কার্যকর। আর সাউথ আফ্রিকান স্ট্রেইনের ওপর এর কার্যকারিতা কতটুকু, সে বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ প্রথম ডোজ দেওয়ার সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ পর টিকা গ্রহণকারী ৭৬ শতাংশ মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি (ইমিউনিটি) তৈরি হয়। অর্থাৎ টিকা নেওয়ার পর প্রথম তিন সপ্তাহে যে কেউ এবং তিন সপ্তাহ পর (১০০-৭৬) = ২৪ শতাংশ ব্যক্তি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে পারেন।

এখন পর্যন্ত অধিকাংশ গবেষণা বলছে, ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া উত্তম। বাংলাদেশ সবদিক বিবেচনা করে প্রথম ডোজের আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ প্রস্তাবিত জনগোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ করে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই ডোজের মাঝে চার সপ্তাহের ব্যবধানে আরও শক্তিশালী ইমিউনিটি তৈরি হয় ৮২.৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে। সে ক্ষেত্রে পূর্ণ ডোজ নেওয়ার পরও (১০০-৮২) = ১৮ শতাংশ মানুষ কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে পারেন।

তাহলে কি এই ভ্যাকসিন নিরাপদ নয়?

আমেরিকান FDA-এর হিসাবে যে ভ্যাকসিন কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মানুষকে ইমিউনিটি দেবে, সেটাই কার্যকরী ভ্যাকসিন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার উপযোগী। তাহলে এই ১৮ শতাংশ মানুষ কি সবসময় অজানা আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকবে? না, তারাও নিরাপদে থাকবে। কারণ, ৮২ শতাংশ মানুষের ইমিউনিটি তৈরি হলে সেটা হয়ে যাবে হার্ড ইমিউনিটি, যা করোনা সংক্রমণের চেইন ভেঙে দেবে এবং করোনা নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। অন্যথায় সম্ভবত এক বছর পর আমাদের আবার এই টিকা নিতে হবে।

এখন কথা হলো, করোনার দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর আবার মাস্ক কেন পরতে হবে? কারণ, আমি-আপনি যে কেউ এই ১৮ শতাংশের একজন হতে পারি, যাদের শরীরে টিকা দেওয়ার পরও ইমিউনিটি তৈরি হয়নি। আর যদি ইমিউনিটি তৈরি হয়েও থাকে, তারপরও মাস্ক পরতে হবে। কারণ, আমাদের শরীরে ইমিউনিটির জন্য করোনাভাইরাস সুবিধা করতে না পেরে কিছুদিন পর দুর্বল হয়ে যেতে পারে। পরে সুযোগ মতো আমাদের শরীর থেকে ইমিউনিটি বিহীন অন্য কারও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সেই মানুষটি আপনার কাছের কেউ হতে পারে। করোনাভাইরাস এভাবে ছড়ানোর সুযোগ পেলে তা আর কোনোদিন পৃথিবী ছেড়ে যাবে না। কভিড-১৯-এর ঢেউয়ের পর ঢেউ চলতেই থাকবে। প্রতি বছর আমাকে, আপনাকে এ জন্য ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে, নিয়মিত হাত সাবান পানি বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

তাই টিকার ওপর আস্থা রাখুন এবং ধৈর্য ধরুন। নিজে টিকা নিন, অন্যকে টিকা নিতে উৎসাহিত করুন এবং পৃথিবী থেকে করোনার পরিপূর্ণ বিদায়ের আগে বা টার্গেট জনগোষ্ঠীর (৮০-৯০ শতাংশ) ইমিউনিটি অর্জন না করা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সেটাই আমাদের বেঁচে থাকার পথে দেখাবে।

মন্তব্য করুন