করোনায় আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবস্থা 'খুবই স্থিতিশীল ও তিনি যথেষ্ট ভালো আছেন' বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিমের প্রধান মেডিসিন ও বক্ষ ব্যাধি এ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী। 

তিনি বলেন, এভাবে যদি আরো এক সপ্তাহ পার হওয়া যায় তাহলে আমরা বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে যাবো। এরপরও প্রয়োজন হলে তাকে যে কোন সময়ে হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি আছে। খালেদা জিয়া দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন বলেও তিনি জানান।

সোমবার বিকেলে গুলশানের বাসা 'ফিরোজায়' বিএনপি চেয়ারপারসনকে দেখে আসার পর মেডিকেল বোর্ড তথা তার চিকিৎসক টিমের প্রধান সাংবাদিকদের একথা জানান। এসময়ে চিকিৎসক টিমের সদস্য বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুস শাকুর খান, ইউরোলিজিস্ট অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন ও ডা. মো. আল মামুন পাশে ছিলেন। বিকাল ৫টায় মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসভবন 'ফিরোজায়' প্রবেশ করে এক ঘন্টা সেখানে অবস্থান করেন।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসক টিমের এই বৈঠকে অনলাইনে আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অংশ নেন। এছাড়া লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানও ভার্চুয়ালি বৈঠকে অংশ নেন।

অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়া আমাদের মেডিকেল টিমের সামনে সামনাসামনি কথা বলেন। আমি তার পালস্‌ অক্সিমিটার দিয়ে দেখেছি, চেস্ট অলকোটেক করে দেখেছি। যেভাবে যা যা দেখা দরকার সেভাবে দেখেছি। অর্থাৎ আমাদের দেখা-পরীক্ষার কোনো কিছুর মধ্যে কোনো রকমের গাফিলতি করি নাই, আমরা খুব সিরিয়াসলি এটা দেখছি।

খালেদা জিয়াকে কি হাসপাতালে নেয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা এরকম প্রশ্ন করা হলে চিকিৎসক টিমের প্রধান বলেন, কোভিডে অপ্রত্যাশিত বিষয় আছে। পৃথিবীর কেউ বলতে পারবে না যে, করোনা প্রথম সপ্তাহে কেমন থাকবে, দ্বিতীয় সপ্তাহে কী করবে। কারো পক্ষে বলা সম্ভব না। সেজন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে। আমরা যদি কখনো মনে করি, আমাদের বিন্দুমাত্র মনে হয় যে, তাকে হাসপাতালে নেওয়া দরকার। আমরা সেই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে যাবো- সেই ধরনের প্রস্তুতি আমরা রেখেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী বলেন, মেডিকেল বোর্ডে আমাদের অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রয়েছেন। সবচেয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে, লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানও সব সময় খোঁজ খবর রাখছেন। আমরা একটা টিম ওয়ার্ক হিসেবে আলোচনা করে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করছি। কোথাও কোনো গ্যাপ বা কোথাও কোনো রকমের সন্দেহের কিছু অবকাশ নেই।

৭৫ বছর বয়েসী খালেদা জিয়ার স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, এখন পর্যন্ত তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো আছে বলে মনে হচ্ছে।

বাসভবনের অন্যরা কেমন আছেন বিষয়ে অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী বলেন, সবাই কোভিড পজেটিভ। তাদের প্রত্যেককে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভালো দিক হচ্ছে প্রথম দিকে ১/২ জনের জ্বর ছিলো। তাদের এখন জ্বর নাই, সবাইকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। সবারই চিকিৎসা করা হচ্ছে। খালেদা জিয়া নিজে তাদের বিষয় তদারকি করছেন।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সবাই যেন তার জন্য দোয়া করেন। সবাই যেন সাবধানে থাকে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।

গত শনিবার খালেদা জিয়া নমুনা পরীক্ষা শেষে রোববার তার করোনা পজেটিভ শনাক্ত হয়। মেডিসিনের বিশেষ চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তার ব্যক্তিগত চিকিতসক টিম বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা শুরু করে। ফিরোজার বাসায় বিএনপি চেয়ারপারসন ছাড়াও আরো ৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারাও বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

৭৫ বছল বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুই মামলায় দণ্ডিত। ২০১৮ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে যেতে হয়। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু পর পরিবারের আবেদনে সরকার গত বছরের ২৫ মার্চ 'মানবিক বিবেচনায়; শর্তসাপেক্ষে' তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়। তখন থেকে তিনি গুলশানে নিজের ভাড়া বাসা ফিরোজায় থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ সীমিত।

দোয়া ও প্রার্থনা: এদিকে খালেদা জিয়া করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ শুনে নেতা-কর্মীরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। বিভিন্ন জায়গায় নেতাকর্মীরা নেত্রীর রোগমুক্তির জন্য দোয়া করছেন। তার আশু রোগমুক্তি কামনা রাজধানীসহ সারাদেশের মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিল হয়েছে বলে দলের কেন্দ্রীয় দফতর শাখা জানিয়েছে। ঢাকায় পল্টন জামে মসজিদে বাদ জোহর দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আবদুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু, নাজিম উদ্দিন আলম, রফিক শিকদার প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। দোয়া মাহফিলে মোনাজাত পরিচালনা করেন ওলামা দলের আহবায়ক শাহ নেছারুল হক।

গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়েও খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এই দোয়া মাহফিলে ছিলেন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন নসু, ওলামা দলের মাওলানা আবদুল খালেক, মাওলানা মো. ইব্রাহিম, মাওলানা সোবহানসহ চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বিকালে খালেদার রোগমুক্তির কামনায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা সভা হয়। আজ মঙ্গলবার কমলাপুরের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা সভা করবেন দলের নেতাকর্মীরা।