গঞ্জুদের গঞ্জু হওয়ার গল্পটা শুনিয়েছিলেন হরেন্দ্রনাথ সিং। হরেনের গল্প বলার ধরন যথেষ্ট মনোহর। আরও অনেক আদিবাসীর মতো বাংলা ভাষাটা তাকে শিখে নিতে হয়েছে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে। তবে পাহাড় কিংবা মধুপুর গড়ের আদিবাসীদের মতো আড়ষ্ট নয় তার বাংলা। কারণটা সহজ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের প্রায় সবার নিজ নিজ ভাষা থাকলেও বাঙালি অধ্যুষিত জনপদে বাংলা ভাষার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে বলে তারা বাংলাটা বেশ ভালোই জানে। তার ওপর আমাদের হরেন আবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যুক্ত ছিলেন উচ্চারণ, আবৃত্তি ও গান চর্চার সঙ্গে। আদিবাসী শিল্পীদের গানের দল মাদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ছিলেন জাতীয় আদিবাসী ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বর্তমানে রয়েছেন আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে।
বিষুষ্ণর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের কঠোর কুঠারের ভয়ে গঞ্জুদের আত্মগোপনের গল্পটা হরেন বলছিলেন দারুণ সব উপমা দিয়ে। পুরাণকথা অনুযায়ী, পরশুরাম ধরিত্রীকে ২১ বার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। এই নিঃক্ষত্রিয়করণের শিকার হয়েছিল গঞ্জুরাও। হরেনের ভাষায়, 'পুকুরে জাল পড়লে মাছেরা যেমন করে কাদায় মাথা গুঁজে দেয় আত্মরক্ষার জন্য, গঞ্জুরা তেমন বিভিন্ন জাতের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল তখন। মাথা গুঁজে জীবন বাঁচানোর কারণেই তাদের নাম হয়েছে গঞ্জু।'
তাহলে আদিতে গঞ্জুদের নাম কী ছিল? হতে পারে ভক্তাবান সিং, সংক্ষেপে বললে ভক্তা। হরেনের মামাবাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার টিটিয়া গ্রামের গঞ্জুরা নিজেদের সিং বলে পরিচয় দেয় এবং গ্রামের লোকজনও গঞ্জুদের পাড়াটিকে সিংপাড়া নামে চেনে। বেসরকারি সংস্থা শেডের (সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট) একটি গৃহগণনায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বসবাসকারী গঞ্জুর সংখ্যা হাজার দশেক। তাদের বাস বৃহত্তর সিলেটের চা বাগানগুলোসহ উত্তরের সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে।
আদিতে যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, এটা ধরে নেওয়া যায়, ভারতবর্ষে আর্য আগমনের আগে এ অঞ্চলে যেসব জাতি-গোত্রের বাস ছিল, তাদেরই কোনো একটা গোত্র বা জাতি আজকের দিনের এই গঞ্জুরা, যাদের নাম বদলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরশুরামের উপাখ্যান। পরশুরামের ওই হত্যাযজ্ঞের আগে ভারতবর্ষের কোনো একটা অঞ্চলের শাসন ক্ষমতা হয়তো রূপান্তরিত হয়ে গঞ্জু নামধারণকারীদের হাতে ছিল, তাই তারা নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। ঋগ্‌বেদের পুরুষসূক্ত অনুসারে রাজ্য শাসন, রাজ্য রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ক্ষত্রিয়দের দায়িত্ব।
পরশুরামের নিঃক্ষত্রিয়করণের মূল ভাবটা যদি বুঝে নিই, তাহলে এটা অনার্য নিধন এবং আর্য আধিপত্য বিস্তারের গল্প বলে অনুমান করা যায়। আর্যরা শ্রেষ্ঠ, সুন্দর তাদের সুচালো নাক- এটুকুতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি আধিপত্যের চেষ্টাকে, এই অঞ্চলের আদিবাসীদের হত্যা করা হয়েছিল খুঁজে খুঁজে। আর্যদের তৈরি করা পুরাণে এই হত্যাযজ্ঞকে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে এতটাই মহিমা দেওয়া হয়েছে যে, খোদ কাজী নজরুল ইসলাম তার 'বিদ্রোহী' কবিতায় লিখেছেন, 'আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার/নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার।' এই হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও যারা মাথা গুঁজে আত্মরক্ষা করতে পেরেছিল, তাদের নীচু জাতে পরিণত করা হলো। নীচু জাতকে মেরে ফেলতে হলো কেন? তারা কি এমনই অপ্রতিরোধ্য ছিল? দখল করা এলাকার মানুষকে শায়েস্তা না করলে দখলদারী পোক্ত হয় না। নিপীড়ন এবং ত্রাস সৃষ্টি করার দরকার হয় বিজিতদের মধ্যে- এটাই বর্বরের শাসন পদ্ধতি।
পরশুরামের এই নিঃক্ষত্রিয়করণের গল্পটা কতকাল আগের? টিটিয়া গ্রামের গঞ্জুদের জিজ্ঞেস করে দেখলাম কাল অনুমান করা তো দূরের কথা, পুরাণের এই গল্পটাও ঠিকঠাক জানা নেই তাদের। তাই নিজেই সময়টা অনুমান করার চেষ্টা করলাম আমি। 'রামায়ণ'ও জানিয়েছে পরশুরামের গল্প। ওই গল্প অনুসারে পরশুরামের মৃত্যুর আগেই বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের জন্ম হয় এবং এ দু'জনের মধ্যে একটা যুদ্ধও হয়। যুদ্ধে পরাজিত পরশুরাম নিবীর্য হয়ে রামচন্দ্রকে পূজা ও প্রদক্ষিণ করে মহেন্দ্র পর্বতে চলে যান।
বাল্মীকির 'রামায়ণ' খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত হয়েছে বলে ধারণা করেন পণ্ডিতরা। পৌরাণিক গল্পের খোলনলচে খুলে ইতিহাসের সত্যে পৌঁছানো বেশ কঠিন। কেননা, 'রামায়ণ' সম্পর্কে বলা হয়, রামের জন্মের ছয় হাজার বা ৬০ হাজার বছর আগে বাল্মীকি মুনি মহাকাব্যটি রচনা করেছেন। 'রামায়ণ' সম্পর্কিত এই ধারণার জন্মদাতা বোধ হয় মহাকাব্যটির বাংলা অনুবাদক কৃত্তিবাস। অবশ্য এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভাষা ও ছন্দ' কবিতায় বলেই দিয়েছেন, 'ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি/রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।' কাব্য-উপাখ্যান যাই বলুক, খোদ 'রামায়ণ' থেকে বাল্মীকি মুনি যে রামের সমসাময়িক তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যুদ্ধ শেষ করে অযোধ্যায় ফিরে রাম যখন সীতাকে বনবাস দেন, তখন সীতা বাল্মীকি মুনির আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানেই রাম-সীতার দুই পুত্রের জন্ম হয় এবং বাল্যকাল কাটে।
খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীকে যদি 'রামায়ণ' রচনার কাল বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে গঞ্জুদের টিকে থাকার লড়াইটা তারও আগে শুরু হয়েছিল বলে অনুমান করতে পারি আমরা। বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃত ৫০টি আদিবাসীর যে তালিকা রয়েছে, তার ২৮ নম্বরে গঞ্জু নামে জাতিটির উল্লেখ রয়েছে, যারা নিজেরা পদবিতে সিং ব্যবহার করে। আদিবাসী ওই তালিকাটি অবশ্য সরকারি ভাষায় 'বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নাম' বলে পরিচিত। শুধু গঞ্জুরা নয়, ওঁরাওদের কেউ কেউ এবং তুরি ও রাউতিয়ারা সবাই সিং পদবি ব্যবহার করে। বাংলাদেশের চা বাগানে এবং ভারতের ঝাড়খন্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় গঞ্জুরা অবশ্য গঞ্জু পদবিতেই পরিচিত। ঝাড়খন্ডে ভক্তা এবং ভক্তাসিং পদবিও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের তালিকায় গঞ্জুরা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এ বছর। কোথাও কোথাও সিং পদবি লেখার কারণে গঞ্জু হিসেবে সরকারি কাগজপত্র পেতে অসুবিধা হচ্ছে তাদের। কোথাও আবার প্রশাসন সহায়ক হয়ে বুঝে নিয়েছে সংকটটা।
সমতলের অধিকাংশ আদিবাসীর মতোই টিটিয়া গ্রামের গঞ্জুদের জীবনযাপনে হিন্দু ধর্ম এবং আচারের প্রভাব পড়েছে অনেক বেশি। তাদের পুরোনো পূজাঘরটির ভগ্নদশায় তাই মনে হয়েছে। অবশ্য হরেনের এক মামা দেবানন্দ সিং জানিয়েছেন, 'তাদের সবারই আছে গৃহদেবতা। সেই দেবতাদের নাম বাইরের লোক জানতে পাবে না। ঘরে বউ এলে তাকেই জানানো হয় কেবল।' গঞ্জুদের স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে হরেণের দাবি আরও জোরালো। তিনি জানালেন, জন্মের অভ্যর্থনা এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত অনেক রীতিনীতিতেই গঞ্জুরা সনাতনী হিন্দুদের থেকে পুরোপুরি আলাদা। 'কারাম' ও 'সহরায়'- উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের প্রধান দুটি পূজা গঞ্জুরাও যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে করে থাকে। সর্বোপরি নাগরি নামে নিজস্ব একটা ভাষা রয়েছে তাদের, গঞ্জুরা নিজেদের মধ্যে নাগরিতে কথা বলে।
এর চেয়ে বেশি বিশেষত্ব আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া কঠিন সমতলের আদিবাসীদের অধিকাংশের কাছে। এই আদিবাসীরা এ এলাকার বনভূমিকে বাসযোগ্য করেছিল। যদিও এসব এলাকায় এখন আর বন নেই। বনের সঙ্গে বিলীন হয়েছে বুনোজীবনও। যা বলছিলাম, সিংপাড়ার গঞ্জুদের গৃহদেবতা যে ভালো নেই, সেটা তাদের ভেঙেপড়া পূজার ঘরটি দেখে ভালোভাবেই বুঝতে পারা যাচ্ছিল। ফাল্কগ্দুনের উজ্জ্বল দুপুরে রোদে ঝলসাচ্ছিল ভগ্নপ্রায় পূজার ঘরটি। ওই পাড়ার প্রতিটি ঘর এবং তরুণ-তরুণীর মুখও ঝলমল করছিল বুদ্ধির আলোতে। সম্ভবত দুই পুরুষ আগের এক দৃঢ়চেতা শিক্ষক যদু কুমার সিং এমন পরিবর্তন এনে দিয়ে গেছেন। কারও কারও দৃঢ়প্রত্যয় নিশ্চয়ই একটা সমাজকে বদলে দিতে পারে। যদিও সেই শক্তিও পর্যুদস্ত হয় নানামুখী লড়াইয়ের চাপে। যদু কুমার নিজেও জাতপাতের চাপে অনুকূল ঠাকুরের সৎসংঘ আশ্রমের শরণ নিয়েছিলেন বলে ধারণা করছি। সৎসংঘের চিহ্ন বেশ শ্রদ্ধাভরেই পূজিত হয় গঞ্জুদের পাড়াটিতে। পাড়ার একটি ঘরে প্রতিদিন অনুকূল ঠাকুরের ছবিতে পূজা-অর্চনা করা হয়ে থাকে। এই ঘরেই আমাদের শঙ্খ বাজিয়ে শোনাল হরেনের মামাতো বোন পূর্ণতা সিং। পাড়ার প্রবীণদের একজন প্রবোধ রঞ্জন সিংকে অনুরোধ করেছিলাম, আদিবাসীদের কোনো একটা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শোনাতে। তিনি বাজালেন মৃদঙ্গ, যা পাড়ায় কীর্তনের সময় বাজিয়ে থাকেন। সংকোচের সঙ্গে প্রবোধ সিং জানালেন, গঞ্জুদের আদি বাদ্যযন্ত্রগুলোর কিছুই নেই তাদের সংগ্রহে এবং বাজাতেও জানেন না কেউ।

মন্তব্য করুন