রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে এখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা। রাতদিন চলছে কবর খোঁড়া, জানাজা ও লাশ দাফন। করোনাভাইরাসের মহামারির আগে এখানে প্রতিদিন দু-তিনটি লাশ দাফন হতো। সেগুলো করোনা ছাড়া অন্য কোনোভাবে মৃত্যুর। করোনায় মৃতদের দাফন শুরু হওয়ায় সেই সংখ্যা এখন ১৫-২০টি। এর মধ্যে করোনায় মৃতের সংখ্যা ১৪-১৫ জন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কবর খোঁড়ার জন্য গোরখোদক বাদ দিয়ে এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করা হচ্ছে। দিন যতই যাচ্ছে, বাড়ছে দাফনের সংখ্যা।
কবরস্থানটিতে গিয়ে দেখা যায়, রায়েরবাজার বধ্যভূমির পেছনের অংশের ৮ নম্বর ব্লকটি করোনায় মৃতদের দাফনের জন্য সংরক্ষিত। একটি লাশের দাফন শেষ হতেই আসছে আরেকটি লাশ। একটি লাশবাহী গাড়ি যেতে না যেতেই আরেকটি ঢুকছে।
বৃহস্পতিবার সেখানে দেখা গেল, ৫০টির মতো কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে। তার পরও এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে কবর খোঁড়ার কাজ। দাফনের আগে সেগুলো পরিপাটি করার বাকি কাজ করছেন গোরখোদকরা।
কবরস্থানের জ্যেষ্ঠ মোহরার (ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি) আব্দুল আজিজ জানান, করোনায় মৃতদের তালিকা সংরক্ষণের জন্য পৃথক রেজিস্টার খাতা চালু করেছেন। ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত এক হাজার ১৯৫ জনের দাফন করা হয়েছে কবরস্থানটিতে। এর বাইরে বনানী কবরস্থানে কারও কবর কেনা থাকলে সেখানেও করোনায় মৃতদের দাফন করা যাচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীর আর কোনো কবরস্থানে করোনায় মৃতদের দাফনের সুযোগ নেই।
আব্দুল আজিজ জানান, ব্লকটিতে ১০ হাজারের মতো কবর আছে। এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি পূরণ হয়ে গেছে। বর্তমান গতিতে মৃত্যু চলতে থাকলে আরেকটি ব্লকও লাগবে।
তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বজনরা জানাজায় অংশ নিচ্ছেন। আবার অনেক সময় কেউ কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন। পিপিই পরিহিত স্বেচ্ছাসেবীরাই সবকিছু করছেন।
তবে কবে কতজনের দাফন হয়েছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলে আব্দুল আজিজ কিছু বলতে রাজি হননি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ৫ এপ্রিলের পর থেকে ঢাকায় প্রতিদিন ৪০ জনের বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। প্রতিদিনই তা বেড়ে চলছে। গতকাল সারাদেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা ১০১ জন, এর মধ্যে ঢাকায় মারা গেছেন ৫৯ জন। দেশে মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঢাকায়।
সংশ্নিষ্টরা জানান, ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলেও তার একটি অংশ রাজধানীতে দাফন করা হচ্ছে। বাকিদের ঢাকায় পারিবারিক কবরস্থানে বা গ্রামের বাড়িতে দাফন করছেন স্বজনরা।
গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় সরকার। ১৮ মার্চ জানানো হয় প্রথম মৃত্যুর খবর। ওই সময় খিলগাঁও তালতলা সরকারি কবরস্থানে করোনায় মৃতদের দাফন শুরু হয়। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২৭ এপ্রিল থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি পারিবারিক কবরস্থানেও দাফন করা যাবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়।
রায়েরবাজার কবরস্থানের কর্মীরা জানান, প্রথম দিকে দু-তিনটি করোনায় মৃতের লাশ আসত। মার্চ মাস থেকে দাফনের সংখ্যা বেড়েছে। এখন কোনো কোনো দিন ১৫টির বেশি লাশও আসছে।
কবরস্থানে সিটি করপোরেশনের নিযুক্ত ড্রেসার মোহাম্মদ আলী বলেন, অ্যাম্বুলেন্সে লাশ আনার পর স্বজনরা যদি চান কবরস্থানের প্রবেশমুখে মসজিদে জানাজা হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়ি চলে যায় ৮ নম্বর ব্লকে। এরপর দাফন করে দ্রুত কবরস্থান ত্যাগ করেন আত্মীয়স্বজনরা।
৮ নম্বর ব্লকে গিয়ে দেখা যায়, কবরস্থানে একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের পর পিপিই পরিহিত একদল স্বেচ্ছাসেবী স্ট্রেচারে করে সাদা কাফনে মোড়ানো একজনের লাশ গাড়ি থেকে নামাচ্ছেন। দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বজনরা। এরপর পিপিই পরা চারজন মিলে লাশটি কবরে নামান। বাঁশের পাটাতন সাজিয়ে মাটি দেওয়া হয়। পরে দাফনে অংশগ্রহণকারীরা পাশের একটি খালি জায়গায় গিয়ে পিপিই খুলে ফেলেন। শরীর জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করেন। আর পিপিইগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়।
একজন স্বজন জানান, সম্প্রতি তার শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে একটি হাসপাতালে ভর্তি করান। আইসিইউতে থাকার সময় তার করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়।
শুকুর আলী নামে এক গোরখোদক বলেন, মাঝে দাফন একেবারেই কমে গিয়েছিল। এখন তো রাতদিন কবর খোঁড়া হচ্ছে। কবরের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন ভেকু (এক্সক্যাভেটর) দিয়ে খোঁড়া হচ্ছে। তারা বাকি কাজগুলো করছেন।
আরেক গোরখোদক আসলাম বলেন, কবরস্থানে প্রায় ৩০ জন গোরখোদক আছেন। তবে তারা কেউই সিটি করপোরেশন থেকে পারিশ্রমিক পান না। কবর দেওয়ার পর মৃতের আত্মীয়স্বজনরা বকশিশ দেন।
জ্যেষ্ঠ মোহরার আব্দুল আজিজ বলেন, কবর দেওয়ার জন্য কোনো খরচ লাগে না। অন্য কোনো সমস্যাও এখানে নেই। প্রথম দিকে করোনায় মৃতদের দাফনে কিছুটা ভীতি কাজ করত। এখন আর সেটাও নেই।

মন্তব্য করুন