দেশের কৃষির জন্য এপ্রিল-মে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ সময় পাকতে শুরু করে বোরো ধান। এমন সময়ে গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় হঠাৎ শুরু হয় দমকা হাওয়া। পরদিন সকালে জমিতে গিয়ে কৃষকদের মাথায় হাত। বেলা যত বাড়ে, বোরো ধানের শীষ ততই মরতে থাকে।

চলতি মাসেই কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে ফসল। এই ক্ষতির সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে এই 'গরম হাওয়া (হিটশক)'। এতে ৩৬টি জেলায় প্রায় এক লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। এ অবস্থায় কৃষকের ঘরে ঘরে দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে। চলছে রমজান মাস, সামনে ঈদ- তার ওপর লকডাউনের কারণে কৃষকের দুশ্চিন্তা বেড়েছে।

নেত্রকোনার প্রবীণ কৃষক আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, তারা কখনোই এমন আপদ দেখেননি। গরম বাতাসে ধানের জমিন নষ্ট হওয়ার কোনো স্মৃতি তাদের নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর ঝড়ের বার্তা দিলেও 'গরম বাতাসের' এই আগাম বার্তা দিতে পারেনি।

সিডর, আইলা, আম্ম্ফান, কালবৈশাখী, পাহাড়ি ঢল, বন্যা, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, কোল্ড ইনজুরি আর নিত্যনতুন বালাইয়ের উপদ্রব সামলেও ফসল ফলিয়েছেন কৃষক। করোনাকালেও ধরে রেখেছেন উৎপাদনের ধারাবাহিকতা। অথচ গরম হাওয়ার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

কৃষি মন্ত্রণালয় সমকালকে জানায়, ৩৬টি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গরম বাতাস বা হিটশকে বোরো ধানের মোট আক্রান্ত জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ১২৩ হেক্টর। এর মধ্যে ১০ হাজার ২৯৮ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৫৭ হাজার ৮২৬ হেক্টর জমির ধান। যাতে সম্ভাব্য ফলন পাওয়া যেত প্রায় ৯৫ হাজার ৯৩৪ লাখ টন। অর্থের অঙ্কে বোরো ধানের ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩২৮ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা। ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, সবজি, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ও কলার ফলন নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে টাকার অঙ্কে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকারও বেশি। মোট ফসলের উৎপাদন কম হবে ৯৯ হাজার ৯৬৮ টন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের। এর পরই ভুট্টা। প্রায় চার কোটি টাকার ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা তিন লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে বোরো চাষি রয়েছেন তিন লাখ তিন হাজার ৬২০ জন এবং ভুট্টাচাষি তিন হাজার ৪২৫ জন; ৩৭০ জন সবজি চাষি, ১৮০ জন চীনাবাদাম, ১৫০ জন সূর্যমুখী এবং দুই হাজার ২৫৫ জন রয়েছেন কলাবাগানের মালিক।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৩ হাজার হেক্টর বেশি। এ বছর বোরোতে দুই কোটি পাঁচ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা সমকালকে বলেন, জলবায়ু ফান্ডের সহায়তা না পাওয়াসহ নানা দিকে হাওরবাসী বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বছর জলবায়ু সম্মেলনে বা বাইডেনের 'গ্লোবাল লিডারস সামিট' এ হাওরের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ সমকালকে বলেন, এবারের দুর্যোগে ক্ষুদ্র কৃষকের অর্থনৈতিক ও খাদ্য ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাদের রক্ষায় কৃষি বীমা চালু এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া দরকার।

বিভিন্ন জেলায় খবর নিয়ে জানা গেছে, যাদের বোরো ধানের আংশিক ক্ষতি হয়েছে, তারা আর বোরোতে সেচ দিচ্ছেন না। কৃষকরা বলছেন, ফলন কম হলেও খরচ কমবে না। এ কারণে তারা আর এগুলো চাষ করতে চাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাজমুল বারী বলেন, আংশিক আক্রান্ত জমিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পানি দেওয়ার পাশাপাশি পানি ধরে রাখারও ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে বাকি ফলনও ক্ষতির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, হিটশকে কোনো কোনো জমি ৮০% পর্যন্ত, কোনো জমি ৫%-১০%; আবার পাশে ভালোও রয়েছে।

ব্রি'র মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব বিভাগ) ড. মুন্নুজান খানম বলেন, ২০০৭ সালের পরে এ ধরনের হিটশক আর ঘটেনি। তাপপ্রবাহের মধ্যে কালবৈশাখীও থাকে। কিন্তু যখনই তাপপ্রবাহ হয় এবং সে সময় বৃষ্টি থাকে না, তখনই ধানের জন্য তা হিটশক ঘটে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। হিটশকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি তালিকা করার কাজ চলছে। আউশ ও আমন আবাদে জোর দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে নগদ অর্থ সহায়তা, বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন