বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বারবার লাশ পড়ার নেপথ্যের কারণ জানতে দরকার ছয় প্রশ্নের উত্তর। ২০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প নিয়ে কারা বাইরে থেকে ইন্ধন দিচ্ছে, কেন পুলিশ গুলি করল, আগুন লাগাল কারা, পুলিশের মধ্যে কেউ অতি উৎসাহী ছিল কিনা, ঘটনার দিন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কিনা, শ্রমিকদের দাবি কতটা যৌক্তিক- এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে জানা যাবে ঘটনার নেপথ্যের কারণ। এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি। কমিটির সদস্যরা গতকাল রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এদিকে পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। বাঁশখালীতে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করায় মোতায়েন আছে অতিরিক্ত র‌্যাব ও পুলিশ।

সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় পুলিশের দায় কতটুকু- জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, 'অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি পুলিশের কী ভূমিকা ছিল, সেটাও তদন্ত করে দেখবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো দায় থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

জেলা প্রশাসক মোমিনুর রহমান বলেন, '২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট কেন বারবার অস্থিতিশীল হচ্ছে, এটির নেপথ্যে বাইরের কারও ইন্ধন আছে কিনা, শান্তিপ্রিয় শ্রমিকরা কেন সহিংস হলো- এ বিষয়গুলো জানতে হবে আমাদের। এ ঘটনার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করতে পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি আমরাও। কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।'

তবে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, 'পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে। শ্রমিকদের কাছে তো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। পুলিশ তো বিক্ষোভরত শ্রমিকদের লাঠিপেটা করতে পারত। তা না করে তারা শ্রমিকদের ওপর গুলিই চালিয়ে দিল। প্রকল্পটির মালিকপক্ষ ক্ষমতাধর। তাই প্রশাসন সব সময় তাদের তোষামোদেই ব্যস্ত। শ্রমিকদের জীবনের মূল্য তাদের কাছে নেই।'

ঘটনার দিন বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় সাত হাজার শ্রমিক ছিলেন। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন সহিংস আন্দোলনের বিপক্ষে। যে কোনো মূল্যে দাবি আদায়ে একটি অংশ ঘটনার দিন ছিল মারমুখো। পুলিশ বলছে, শ্রমিকদের একটি অংশ তাদের ওপর ইটপাটকেল নিয়ে হামলা করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে থাকা ৮ শতাধিক চীনা কর্মকর্তা ও শ্রমিকের ওপরও হামলার চেষ্টা চালায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে এ ঘটনায় বাঁশখালী থানার এক এসআই বাদী হয়ে পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা এবং হামলার অভিযোগে হামলা করেছেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাত আড়াই হাজার জনকে। অন্যদিকে এসএস পাওয়া প্লান্টের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত দেড় হাজার জনকে আসামি করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের একটি মামলা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে বাঁশখালী থানার ওসি শফিউল কবীর বলেছেন, দুটি মামলা হয়েছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি: শ্রমিকদের ১১ দফা দাবির মধ্যে ছিল- বেতন দিতে হবে ১০ তারিখের মধ্যে, পানি ও বাথরুম ব্যবহার উপযোগী করতে হবে, রমজানে ৮ ঘণ্টা ডিউটি, জুমার নামাজ পড়া ও বিশ্রামের সুযোগ দিতে শুক্রবার কর্মদিবস অর্ধেক করা, ঈদের বোনাস ৫০ শতাংশ, কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করতে হলে এক মাস আগে জানানো, ছাঁটাইয়ের পর তার পাওনা পরিশোধ করা এবং ইচ্ছামতো ছাঁটাই করা যাবে না, অগ্নিকাণ্ডে কোনো শ্রমিকের ক্ষতি হলে সম্পূর্ণ খরচ বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে, স্কেল অনুসারে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া, ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও শ্রমিকরা বীমা ভাতা পান না, তাই বীমা সুবিধা নিশ্চিত করা, কোনো চীনা কর্মকর্তা বাঙালি শ্রমিকদের গায়ে হাত দিতে পারবে না এবং ডিউটি সকাল ৭টা থেকে করা।

৭ হাজার শ্রমিকের বিক্ষোভ দমনে এসআইর নেতৃত্বে মাত্র ৫০ পুলিশ! :পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানিয়েছে, আগের দিন শুক্রবার থেকে শ্রমিক বিক্ষোভ দানা বাঁধলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রে অতিরিক্ত কোনো পুলিশ মোতায়েন ছিল না। একজন এসআইর নেতৃত্বে গণ্ডামারা পুলিশ ফাঁড়ির ৫০ জন সদস্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। শনিবার ঘটনার দিনও শুরুতে পুলিশের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যাননি। এমনকি বাঁশখালী থানার ওসি ও পরিদর্শকও বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় ছিলেন না। পরে সংঘর্ষ শুরু হলে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যান ওসি সফিউল কবির। গণ্ডামারা পুলিশ ফাঁড়ির তত্ত্বাবধায়ক এসআই রাশেদুজ্জামানের নেতৃত্বে শ্রমিকদের ওপর গুলি করে পুলিশ। গুলি করার আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নেওয়া হয়নি।

বিষয়টি স্বীকার করে বাঁশখালী থানার ওসি সফিউল কবির সমকালকে বলেন, 'গণ্ডামারা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রাশেদুজ্জামানের নেতৃত্বে শ্রমিকদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে পুলিশ। তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে চীনা নাগরিক ও সরকারি জানমাল রক্ষায় পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। গুলি করার বিষয়টি ঘটনার পরে আমাকে ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।'

খতিয়ে দেখা হচ্ছে পুলিশের ভূমিকা: সংঘর্ষের ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করছেন পুলিশ ও শ্রমিকরা। এতে কর্মরত নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক সাহেদুল করিম রাজু সমকালকে বলেন, 'শ্রমিকদের অবস্থান ছিল ডরমেটরির ভেতরে। পুলিশ ছিল বাইরে। উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছিল এটা ঠিক। কিন্তু পুলিশ হঠাৎ করে ডরমেটরির বাইরে একটি মাইক্রোবাসে আগুন দিয়ে শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি করা শুরু করে। এরপর শ্রমিকরাও পুলিশকে ইটের টুকরো ছুড়ে মারে। গুলি করার পর অধিকাংশ শ্রমিক জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গেছে।'

তবে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক বলেন, 'শ্রমিকরা যখন চীনা নাগরিক ও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে গাড়িতে আগুন দিয়েছে, তখনই পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের যা করণীয় তা আইন অনুযায়ী করা হয়েছে।'

কাজ শুরু করেছে দুই তদন্ত কমিটি: সংঘর্ষের ঘটনা খতিয়ে দেখতে কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। গতকাল বাঁশখালীর গণ্ডামারায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছেন তারা। কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গেও কথা বলেছেন কমিটির সদস্যরা। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন্স অ্যান্ড ক্রাইম) জাকির হোসেন খান সমকালকে বলেন, কমিটি ঘটনার কারণ, সূত্রপাত, শ্রমিকদের কী ভূমিকা, কর্তৃপক্ষের কী ভূমিকা, পুলিশের কী ভূমিকা, এ ঘটনায় কারা দায়ী ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত করবে। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে পারব বলে আশা করছি।'

জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিও কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনী আক্তার। তিনি বলেন, 'ইতোমধ্যে কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।'

হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন গুলিবিদ্ধরা: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন শ্রমিক মিজান, মো. মোরশেদ, মো. শাকিল, মো. কামরুল, মো. রাহাত, অভি, মো. মুরাদ, আমিনুল হক, মো. দিদার, মাসুম আহমদ, মো. ওমরসহ কয়েকজন। এদের কেউ গুলিবিদ্ধ হয়েছে পায়ে, কেউ হাতে। কারও মাথায় গুলি লেগেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা।

পাঁচ শ্রমিকের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর :পুলিশের গুলিতে নিহত পাঁচ শ্রমিকের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে চমেক হাসপাতালে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া। নিহতরা হলেন- নোয়াখালীর হাতিয়া থানার আদর্শ গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে মো. রায়হান (১৯), চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানার মিনাজপুর এলাকার ওলীউল্লার ছেলে মো. রনি (২৩), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার নজরুলের ছেলে মো. শুভ (২৬), চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের পূর্ব বড়ঘোনা এলাকার ফারুক আহমদের ছেলে মাহমুদুল হাসান রাহাত ও এই এলাকার মৃত মাওলানা আবু সিদ্দিকের ছেলে মাহমুদ রেজা ওরফে মিয়া খান।

প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন: বাঁশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে খুলনা, যশোর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমকালের সংশ্নিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। খুলনায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, যশোর ও নারায়ণগঞ্জে বাম গণতান্ত্রিক জোটের এসব কর্মসূচিতে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত, দায়ী পুলিশ সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনা, নিহত শ্রমিক পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সরকারি খরচে চিকিৎসার দাবি জানানো হয়।

মন্তব্য করুন