বেসরকারি পর্যায়ে দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। ২০ হাজার কোটি টাকার এ তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে আছে 'মধুলোভী' অনেক মধ্যস্বত্বভোগী। তাদের দৌরাত্ম্যের কারণে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়; কমছে কাজের মান। চীনের প্রতিষ্ঠান সেপকো থ্রি ও এইচটিজির সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এস আলম গ্রুপ। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ প্রতিষ্ঠানটি এর আগে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করেনি। আবার চীনা প্রতিষ্ঠানটিরও এত বড় বিনিয়োগ বাংলাদেশে এই প্রথম। জি টু জি (বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীন সরকার) চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে শুধু অর্থায়ন করবে এস আলম গ্রুপ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিক সরবরাহসহ সব কেনাকাটা ও নির্মাণের যাবতীয় কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান। এ কারণে তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীরা; ভাগ বসাচ্ছে সব কাজে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, 'চায়না ও বাংলাদেশ সরকার পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প করলেও এখানে কার্যত পরিচালনায় একচ্ছত্র আধিপত্য রাখা হয়েছে চীনের। এ জন্য তৃতীয় পক্ষের প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।'

এসএস পাওয়ার প্লান্টের মুখ্য সমন্বয়ক ফারুক আহমেদ বলেন, 'শ্রমিকদের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই। চায়না প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় শ্রমিক সরবরাহ ও কেনাকাটার যাবতীয় কাজ তারা তদারকি করবে। এখানে মালিকপক্ষ হিসেবে এস আলম গ্রুপ কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বলে চুক্তিতে উল্লেখ আছে।'

বাঁশখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আছে ইপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা আবার উপ-ঠিকাদার ও 'মাঝি'র মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছেন মাঝিরা। আবার মাঝি থেকে টাকার ভাগ নিচ্ছেন উপ-ঠিকাদাররা। শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণে ইপিএস বেসরকারি ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে উপ-ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। এগুলোর কয়েকটি হলো- আদিবা এন্টারপ্রাইজ, মাহি এন্টারপ্রাইজ, উজ্জ্বল এন্টারপ্রাইজ, এনআরএম এন্টারপ্রাইজ, রকিব এন্টারপ্রাইজ, আলী এন্টারপ্রাইজ ও ইমা এন্টারপ্রাইজ। এদের অধীনে এখানে কাজ করছে প্রায় সাত হাজার শ্রমিক। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ঘণ্টাপ্রতি দেয় ৮০ থেকে ১৩০ টাকা। কিন্তু এখান থেকে শ্রমিকদের ১০ টাকা করে কম দেওয়া হয়। আবার কর্মঘণ্টাও বেশি রাখা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। ৮ ঘণ্টার স্থলে শ্রমিকদের কাজ করানো হয় ১০ ঘণ্টা। বাড়তি কর্মঘণ্টার মজুরি নিয়ে নয়ছয় হয় বলেও অভিযোগ শ্রমিকদের। শ্রমিকদের বসবাসের দিকেও মনোনিবেশ নেই উপ-ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর। বদ্ধ কক্ষে শ্রমিকদের আবাসস্থল। টয়লেটও নোংরা-দুর্গন্ধময়। সেখানে মলমূত্র উপচে পড়ছে। নেই সুপেয় পানির ভালো ব্যবস্থা। শ্রমিকদের আবাসস্থলের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও খুব খারাপ। সেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। অথচ এসব সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মালিকপক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত টাকা নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বিরাজ করছিল শ্রমিকদের মধ্যে। এটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত শনিবার। শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি করে পুলিশ। লাশ হয় নিরীহ পাঁচ শ্রমিক।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপ-ঠিকাদারদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে মাঝিরা। এরা শ্রমিক সরবরাহ করে উপঠিকাদারের কাছে। এ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকদের এমন ২৭ জন মাঝি আছে। শ্রমিকদের বেতন ঘণ্টাপ্রতি ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা নির্ধারণ করেছে এরাই। শ্রমিকরা সরাসরি কোনো দাবি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে পারে না। মাঝির মাধ্যমে ওপর মহলে কথা বলতে হয় তাদের। কিন্তু লাভের মধু ভাগ হয়ে যাওয়ার ভয়ে মাঝি ও উপঠিকাদাররা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পৌঁছাত না মালিকপক্ষের কাছে। ঝামেলা এড়াতে মালিকপক্ষও সরাসরি তত্ত্বাবধান করত না শ্রমিকদের। এ কারণে সমস্যা ক্রমেই ঘনিভূত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রেটিতে।

জমি অধিগ্রহণে মধ্যস্বত্বভোগীদের পেটে ২৫০ কোটি টাকা: একইভাবে জমির মূল মালিক থেকে অধিগ্রহণকৃত টাকার একটি অংশ গেছে দালালদের পকেটে। আবার প্রকল্পের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও আলাদা করে কমিশন নিয়েছে দালালরা। এ জন্য জমি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে কর্তৃপক্ষের। ইজারা নিয়ে দখলে থাকা জমির বিপরীতেও অতিরিক্ত তাদের দিতে হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন হাত ঘুরে টাকা লেনদেন হওয়ায় এ প্রকল্প ঘিরে বাড়ছে অসন্তোষ। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হওয়ায় লাশ হতে হয়েছিল ছয়জনকে। এ জন্য তখন নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যায়নি প্রকল্পের কাজ। এবার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে তাদের বিক্ষুব্ধ করেছে সেই মধ্যস্বত্বভোগীরাই।

বারবার অসন্তোষে পিছিয়েছে প্রকল্পের কাজ: এসএস পাওয়ার নামে যৌথ মালিকানার বিদ্যুৎকেন্দ্রেটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। এই প্রকল্পের ৭০ শতাংশের মালিকানা এস আলম গ্রুপের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের। চীনের সেপকো থ্রি ২০ শতাংশ এবং অপর প্রতিষ্ঠান এইচটিজির আছে ১০ শতাংশ শেয়ার। চুক্তিতে ৪৫ মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর কেন্দ্রটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কবে নাগাদ এটি উৎপাদন শুরু করবে, সেটি নিশ্চিত নয় এখনও। অথচ এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্ধারিত সময় উৎপাদনে গেলে লাভবান হতো দেশ। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা ৬০ পয়সা দরে কিনে নিত পিডিবি। তারা এ বিদ্যুৎ পৌঁছে দিত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে বেসরকারি পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

মাঠে তদন্ত কমিটি: বাঁশখালী প্রতিনিধি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষে পাঁচজন নিহতের ঘটনা তদন্তে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। গতকাল দুপুরে চার সদস্যের কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনী আক্তার বলেন, 'ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এমন শ্রমিক ও মালিকপক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।'

ঘটনাস্থলে উপস্থিত এসএস পাওয়ার প্লান্টের ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মোস্তান বিল্লাহ আদিল সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া মেনে নিয়েছি। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইতোমধ্যে তিন শতাধিক শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে অন্য শ্রমিকরাও কাজে যোগ দেবেন।

বিক্ষোভ, প্রতিবাদ অব্যাহত: বাঁশখালীতে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল দুপুরে বরিশাল নগরীর অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে সমাবেশ ও পরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। কিশোরগঞ্জের গৌরাঙ্গবাজার রংমহল চত্বরে মানববন্ধন করেছে জেলা সিপিবি ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

মন্তব্য করুন