অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার বাইরে অন্য টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বিভিন্ন দেশের পাঁচটি টিকা নিয়ে আলোচনা হয়। তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দুটি করে এবং রাশিয়ার একটি টিকা রয়েছে। দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চারটি টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আর একটি টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ হচ্ছে। সভায় উপস্থিত একটি সূত্র সমকালকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসন ও মডার্না, চীনের সিনোফার্ম ও ক্যানসিনো এবং রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি- এই পাঁচটি টিকা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশি একটি ওষুধ কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসন ও মডার্নার টিকা বাংলাদেশে আনতে পারবে বলে জানায়। এ জন্য কোম্পানিটির পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের টিকা সরবরাহকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে রেনাটা। সিনোফার্ম ও ক্যানসিনো টিকা সরবরাহের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন। আর স্পুটনিক-ভি টিকার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে।

এই পাঁচটি টিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবর রহমান এর প্রধান। অন্য সদস্যরা হলেন- স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য) সৈয়দ মজিবুল হক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. মীরজাদী সেব্রীনা, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মাওলা বক্স চৌধুরী।

পাঁচটি টিকার মধ্যে কোনটি অধিকতর কার্যকর এবং দ্রুততম সময়ে পাওয়া যাবে, তা যাচাই-বাছাই করতে কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সম্ভাব্য টিকা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে কমিটিকে। কমিটি চাইলে কাজের প্রয়োজনে আরও ১৫ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে কমিটির পরিধি বাড়াতে পারবে।

এদিকে, করোনাভাইরাসের টিকার আন্তর্জাতিক জোট কোভ্যাক্স থেকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের কত টিকা লাগবে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত রোববার স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, পাঁচটি টিকার মধ্যে জনসন অ্যান্ড জনসন ও মডার্না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদিত। ওই দুটি টিকাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার আগস্ট মাস পর্যন্ত চুক্তি করেছে। এ সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো দেশকে টিকা দিতে পারবে না। তাই এটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। টিকাটি একবার নিতে হয়। দাম পড়বে ১০ ডলারের মতো। অন্যদিকে, মডার্নার টিকা সংরক্ষণের সুবিধা বাংলাদেশে নেই। মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই টিকা সংরক্ষণ করতে হয়। একই সঙ্গে এই টিকার দামও বেশি। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পায়নি। তবে বিভিন্ন দেশে এই টিকাগুলোর প্রয়োগ হচ্ছে। রাশিয়ার টিকাটির কার্যকারিতা ভালো বলেও প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত নিজেদের দেশে প্রয়োগের জন্য রাশিয়ার টিকার জরুরি অনুমোদন দিয়েছে। এরপর বাংলাদেশও টিকা পেতে তৎপরতা শুরু করেছে। তবে রাশিয়ার দূতাবাস থেকে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।

রাশিয়ার টিকার একটি ডোজের দাম পড়বে ১২ ডলারের মতো। ওই টিকার দুটি করে ডোজ নিতে হবে। তাহলে জনপ্রতি টিকা দিতে সরকারের ব্যয় হবে ২৪ ডলারের মতো। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দুই ডোজের দাম পড়ছে ১০ ডলার করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পাঁচটি টিকার মধ্যে রাশিয়া কাঁচামাল সরবরাহ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ কাঁচামাল আমদানি করে দেশেই এই টিকা উৎপাদন করতে পারবে। চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের টিকা সরাসরি আমদানি করা যাবে। তাদের উৎপাদন ক্ষমতা আছে। তবে ওই দুটি টিকার কার্যকারিতা রাশিয়ার টিকার তুলনায় অনেক কম। আর জনসন অ্যান্ড জনসন ও মডার্না কাঁচামাল সরবরাহ করবে না। সুতরাং কার্যকারিতা ও প্রাপ্যতার বিবেচনায় রাশিয়ার টিকাটি নেওয়া অপেক্ষাকৃত ভালো।

এ ছাড়া সম্প্রতি ইউএনডিপির অর্থায়নে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার তিন কোটি ডোজ কিনতে সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই টিকা সেপ্টেম্বরের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ ছাড়া উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে তিন কোটি ডোজ টিকা ক্রয়ের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। ওই টিকার তিন কোটি ডোজ কিনতে সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যেই ভারতে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সে দেশের সরকার টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর গত মার্চ মাস থেকে টিকা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। দেশে এখন প্রথম ডোজ নেওয়া সবার জন্য দ্বিতীয় ডোজের মজুদ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচাল অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, একটি উৎস থেকে টিকা গ্রহণ করে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। কারণ চুক্তি অনুযায়ী আমরা টিকা পাইনি। এ কারণে বিকল্প উৎস থেকে টিকা ক্রয়ের বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কোভ্যাক্সের টিকার বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, গত সোমবার কোভ্যাক্স থেকে একটি চিঠি দিয়েছে। আগে তারা বলেছিল, মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ টিকা সরবরাহ করবে এবং আগামী মে মাসের মধ্যে এক কোটি ৯ লাখ ডোজের মতো টিকা পাঠাবে। কিন্তু সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা রপ্তানি না করায় ওই টিকা কোভ্যাক্স থেকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটি চিঠিতে বাংলাদেশের কী পরিমাণ টিকা লাগবে, তা আগামী ২৪ এপ্রিলের মধ্যে জানাতে বলেছে। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করতে এরই মধ্যে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন