করোনার এক বছরে দেশের ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষের জীবনমান নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬০ লাখ ধরলে করোনার প্রভাবে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার ফলে এ হার আবারও বাড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ উদ্যোগে এক জরিপের ভিত্তিতে এমন প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে গত মার্চ পর্যন্ত সারাদেশের নির্দিষ্ট কিছু লোকের ওপর তিন ধাপে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এ জরিপ করা হয়েছে। 

শেষ ধাপের জরিপের ফলাফল মঙ্গলবার জুম প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দরিদ্র নয় কিন্তু ঝুঁকিতে থাকা একশ্রেণির মানুষ রয়েছে, যারা দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকে। পিপিআরসি যাদের ওপর জরিপ করেছে, তাদের মধ্যে গত মার্চে এই শ্রেণির লোকদের ৫০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছে, যা গত বছরের জুনে ছিল ৭২ শতাংশ। এ জরিপের ভিত্তিতে জাতীয়ভাবে নতুন দারিদ্র্যের প্রাক্কলন করা হলে গত বছর এপ্রিলে এ হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জুনে ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ ছিল। কিন্তু গত বছরের শেষের দিকে পরিস্থিতির উন্নতি হলে অনেকে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পেরেছেন। যে কারণে গত মার্চে এসে তা কমে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের নতুন দরিদ্র শহরে বেশি। এ শ্রেণির মানুষের কভিড-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর জরিপ করে। জাতীয় পর্যায়ের জরিপের ফলাফল অনুযায়ী প্রতিবছর দারিদ্র্যের প্রাক্কলন করে থাকে সংস্থাটি। ২০১৬ সালে সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ে খানা আয় ব্যয় জরিপ করেছে বিবিএস। ওই জরিপে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের জীবনমান দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। ওই জরিপের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের প্রাক্কলনে দেখা গেছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। ফলে করোনার আগেই দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ দরিদ্র ছিল। পিপিআরসি ও বিআইজিডির জরিপের ভিত্তিতে প্রাক্কলন বিবেচনায় নিলে এখন দরিদ্র লোকের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি।

হোসেন জিল্লুর বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গত জুন মাস থেকে উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে করোনার আগে কাজ করতেন, এখন কাজ নেই এমন সংখ্যা ৮ শতাংশ। অনেকেই চেষ্টা করে কাজে ফিরতে পারছেন না। কেউ কেউ আগের তুলনায় কম দক্ষতার কাজে ফিরছেন। অনেকে পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে নারী কর্মীদের কাজে ফেরার চ্যালেঞ্জ বেশি। করোনার আগে কাজে ছিলেন এমন এক-তৃতীয়াংশ নারী কাজে ফিরতে পারছেন না।

জরিপে দেখা গেছে, শহরের বস্তিবাসীরা করোনাভাইরাসের আগে যে আয় করতেন, এখনও সে অবস্থায় ফিরতে পারেননি। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম আয় হচ্ছে তাদের। করোনার আঘাত সব জায়গায় একইভাবে অনুভূত হয়নি। শহরের তুলনায় গ্রামে তার প্রভাব কমই দেখা গেছে। সে কারণে শহরের বস্তিবাসীর জীবন গ্রামের শ্রমজীবীদের তুলনায় অনেক বেশি অরক্ষিত।

জরিপের তথ্য থেকে তিনি জানান, গত বছর ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ বস্তিবাসী শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যান, যাদের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এখনও ফেরেনি। করোনা শুরুর আগের তুলনায় শহরের বস্তিবাসীর আয় কমলেও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় গত জুনের তুলনায় এ বছরের মার্চে দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবহন, আবাসন (বাড়ি ভাড়া), ইউটিলিটি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বর্তমানে অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার সঞ্চয় কমেছে ব্যাপকভাবে। অরক্ষিত অদরিদ্র এবং দরিদ্র নয়, এমন শ্রেণির মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ কভিড-পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে সব শ্রেণিতেই ঋণ নেওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। বাৎসরিক আয়ের দ্বিগুণ ঋণ করেছেন অনেকে। ফলে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার ৪ শতাংশ বেড়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, সামগ্রিকভাবেও চরম দারিদ্র্য বাড়ছে।

দেশের কৃষি খাত অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি শহরের তুলনায় ভালো অবস্থায় রয়েছে। কেবল কৃষক ছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী বাকি সব পেশার মানুষের আয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় কমেছে। কিন্তু পুনরুদ্ধারের কথা যখন বলা হয়, তখন মূলত সামষ্টিক অর্থনীতির বড় বড় খাত, যেমন তৈরি পোশাক খাতের কথাই উল্লেখ করা হয়। জাতীয় পরিসরে কৃষির কথা সেভাবে উচ্চারিত হয় না। গ্রামীণ অর্থনীতির জাগরণের জন্য কৃষিতে নীতি-সহায়তা দরকার। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ধরনের সহযোগিতা দরকার। এ জন্য আগামী বাজেটে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে একটি কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত।

অনুষ্ঠানে ইমরান মতিন বলেন, এমনিতেই দেশের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কম, এই করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা শ্রমবাজার থেকে আরও দূরে ছিটকে পড়তে পারেন। তিনি আরও বলেন, পেশা পরিবর্তন করে দিনমজুরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশা গ্রহণ করায় দরিদ্রদের দুরবস্থা আরও বাড়ছে।

উপস্থাপিত প্রতিবেদনে করোনার অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় স্মার্ট লকডাউন অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের আয়ের পথ খোলা রেখে করোনার বিস্তার রোধের ব্যবস্থা করার পরামর্শ এসেছে। একই সঙ্গে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষায়িত কর্মসূচি নিতে হবে। টোকেন কর্মসূচি নয়। নতুন আড়াই কোটি দরিদ্রকে অন্তর্ভুক্ত করে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সাজাতে হবে। কুটির, ক্ষুদ্র ও এসএমই খাতে প্রণোদনা বাস্তবায়নের পন্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

মন্তব্য করুন