ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। করোনা ইউনিটের সামনে এসে থামল একটি অ্যাম্বুলেন্স। কভিড-১৯-এ আক্রান্ত মা আম্মাতুন্নেছাকে রেখে দ্রুত কাউন্টারে গেলেন নূর-এ আলম চৌধুরী। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে তখন শ্বাসকষ্টে কাতরাচ্ছেন আম্মাতুন্নেছা। তাকে ভর্তির দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুরলেও নার্স বা আয়ার দেখা পাচ্ছিলেন না আলম। ছোটাছুটি করছিলেন এদিক-সেদিক।
এ সময় অ্যাম্বুলেন্সের দিকে ছুটে যেতে দেখা গেল কমলা রঙের জ্যাকেট পরিহিত ট্রান্সজেন্ডার তিনজনকে। তারা ধরাধরি করে নামালেন আম্মাতুন্নেছাকে। কেউবা হাতে তুলে নিলেন রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আম্মাতুন্নেছাকে স্ট্রেচারে বসিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন হাসপাতালের ভেতরে। দেখে মনে হলো, তারা বুঝি রোগীরই স্বজন।
এ ঘটনা গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার। কথা বলে জানা গেল, তারা তিনজনই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'বৃহন্নলা'র স্বেচ্ছাসেবক মুনমুন, রুহী ও চাঁদনী। তাদের সঙ্গে আছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাদিকুল ইসলামও।
গত বছর যেখানে করোনা আতঙ্কে সম্পর্ক ভুলে অনেকেই আত্মীয়স্বজনকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন, সেখানে এ চিত্র ছিল তার উল্টো। সমাজ অবহেলায় দূরে সরিয়ে দিয়েছে মুনমুন, রুহী, চাঁদনীর মতো যেসব ট্রান্সজেন্ডারকে, তারাই কিনা এখন মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে করোনা আক্রান্তদের সেবায় সকাল-সন্ধ্যা ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রখর তাপেও ঢামেক হাসপাতালের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত সবাই করোনা রোগীদের কাছ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন তৃতীয় লিঙ্গের এই স্বেচ্ছাসেবীরা। দু'দিন ধরে চিটাগাং রোড থেকে রোগী আনছেন মো. মোরশেদ। রোগী আনা-নেওয়ার জন্য তার স্বজনরা চুক্তি করেছেন গাড়িচালক মোরশেদের সঙ্গে।
মোরশেদ সমকালকে বলেন, 'রোগী নিয়ে সকালে আসি। যাই বিকেলের দিকে। দুইদিন ধইরা এই মানুষগুলারে দেখতাছি রোগীর সেবা করতে। করোনার নাম শুনলে যেখানে আপনজনই পালাইয়া যায়, কাছে আসে না, সেখানে এরা করোনা রোগীরে ধরতেছে। সেবা দিতেছে। এরাই প্রকৃত মানুষ।'
শুধু আম্মাতুন্নেছাই নন, এ হাসপাতালে যারাই আসছেন চিকিৎসাসেবা নিতে, তাদের সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে দিন নেই, রাত নেই, অবিরাম কাজ করে চলেছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'বৃহন্নলা'র ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক। এদের মধ্যে আটজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ।
গতকাল বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, 'আমি স্বেচ্ছাসেবক, কীভাবে সাহায্য করতে পারি?' এই প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কমলা জ্যাকেট গায়ে মুনমুন। করোনা আক্রান্তদের সেবায় 'বৃহন্নলা'র ব্যানারে ট্রান্সজেন্ডাররা যে এগিয়ে এসেছেন, সেটা অনেকেরই অজানা। সাধারণ মানুষ যেন সেটা জানতে পারে সেজন্য করোনা ইউনিটের সামনে তাদের একেকজন একেক দিন দাঁড়িয়ে থাকেন। যখনই কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে সাদিকুলসহ তৃতীয় লিঙ্গের মুনমুন, রুহী ও চাঁদনী সহযোগিতার জন্য এগিয়ে যান।
সংগঠনের সভাপতি সাদিকুল ইসলাম জানান, করোনা আক্রান্ত হলেও সংকটাপন্ন অবস্থা না হলে কেউ আসেন না। এখানে কোনো অ্যাম্বুলেস এলে সবাই করোনা রোগী ভেবে নিজেদের সুরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন। বৃহন্নলার সদস্যরা সেসব মাথায় রেখেই মানবতার সেবা করছেন। তিনি জানান, করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে মৃতদের হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরেও সহযোগিতা করছেন তারা।
ট্রান্সজেন্ডার মুনমুন আক্তার বলেন, 'এই দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই আমরা কাজটি বেছে নিয়েছি। আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা মহাখালীর সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতালেও সেবা দেওয়া শুরু করবে।' ঢাকা মেডিকেলে তাদের সরব উপস্থিতি আর নির্ভয়ে রোগীর কাছে ছুটে যাওয়ার কারণে দালালদের দৌরাত্ম্য কমে গেছে। ফলে রোগীর স্বজনের কাছ থেকে অসহায়ত্বের সুযোগে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে না দালালরা। বৃহন্নলার কর্মীদের ওপর তাই ক্ষুব্ধ তারা।
মুনমুন জানালেন, এসব সয়েই চলছে তাদের কাজ। তবে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে নিয়মিত মাস্ক পরে থাকেন তারা। হ্যান্ডগ্লাভস, মাথায় সার্জিক্যাল টুপি আর পিপিই ব্যবহার করেন। একজন রোগীকে সেবা দেওয়ার পর দ্রুত তারা নিজেদের জীবাণুমুক্ত করে নেন বলেও জানান মুনমুন।
'বৃহন্নলা'র নিজস্ব গাড়ি :অসহায় মানুষদের সেবায় বৃহন্নলার রয়েছে একটি তিন চাকার গাড়ি। তাদের জানালেই সেই সিএনজি দিয়ে রোগী ও তার স্বজনের যাতায়াতও নিশ্চিত করছে সংগঠনটি। গতকাল দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর তিনটি স্থান পোস্তগোলা, রায় সাহেব বাজার ও ঝিগাতলায় রোগী পৌঁছে দেন তারা।

মন্তব্য করুন