'একদিন ঝড় থেমে যাবে/ পৃথিবী আবার শান্ত হবে'- ঝড় থামার আশায় এখন গোটা বিশ্ব। করোনাঝড়ে দুলছে মানুষ, থমকে পড়েছে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন। মুক্তির পথ খুঁজছে সবাই। আর এ সুযোগে প্রকৃতি যেন প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
প্রকৃতি তার এই প্রাণ ফিরে পায় গত বছরের মার্চে। কিন্তু মে মাসে সাধারণ ছুটি উঠে যাওয়ার পর আবারও শুরু হয় প্রকৃতির কান্না। বনজঙ্গল, নদী-সাগর সবকিছু ফিরতে থাকে আগের রূপে। তবে এক বছরের মাথায় করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মুখে আবার লকডাউন দিতে হয়েছে। আবার থেমে গেছে সবকিছু। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দাবি, করোনার চেয়েও পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালে কভিডের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা চাপা পড়ে যায়। যদিও লকডাউন মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে, মানুষ পরিবেশের কী ক্ষতি করেছে আর কী করতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বিশ্বকে বাঁচানোর তাগিদও জাগিয়ে তুলেছে লকডাউন।
গত শতকের সত্তর ও আশির দশকের তুলনায় এখন তিন গুণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মানুষকে। চলতি শতকের দুই দশকে বিশ্বের যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি দুর্যোগ-আক্রান্ত হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে নবম অবস্থানে। সম্প্রতি বাংলাদেশে নতুন দুর্যোগ গরম বাতাস বা 'হিটশকে' কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চলছে তীব্র তাপদাহ, দেখা নেই বৃষ্টির। গত ২০ বছরে বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহরে তাপমাত্রা বেড়েছে ২ দশমিক ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৫ এপ্রিল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্স ডিরেক্ট 'সার্ফেস আরবান হিট আইসল্যান্ড ইনটেনসিটি ইন ফাইভ মেজর সিটিস অব বাংলাদেশ : প্যাটার্নস, ড্রাইভার্স অ্যান্ড ট্রেন্ডস' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট এবং রাজশাহীর তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে এ প্রতিবেদন করা হয়। বরিশালের মিঠাপানির নদী কীর্তনখোলায় হঠাৎ লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। এবারের দিবসে প্রতিপাদ্য 'পুনরুদ্ধার করুন আমাদের পৃথিবী'। দিবসটি ঘিরে এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে একটি শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলনের (লিডার্স সামিট অন ক্লাইমেট) আয়োজন করেছেন। অবশ্য এ রকম সম্মেলন আগেও হয়েছে। তবে এ সম্মেলনটি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশেষ। আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে সম্মেলনে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ৪০ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের অংশ নেওয়ার কথা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে পৃথিবীর সুরক্ষা আর উন্নয়ন অব্যাহত রাখার স্বার্থে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোসহ বেশকিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়াকে জরুরি বিবেচনা করে বাংলাদেশ। তাই অনুষ্ঠেয় জলবায়ুবিষয়ক ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে নিজেদের অগ্রাধিকারের চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আহূত এই সম্মেলনে আগামীকাল শুক্রবার ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতিত্ব করা দেশের প্রধান হিসেবে অন্য ৪৭টি দেশের আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরবেন।
পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, প্যারিস চুক্তির আওতায় বাজার ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের লাভ হবে না। বরং অর্থায়ন ও জলবায়ু অভিবাসনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, শুধু করোনাভাইরাসের কারণেই নয়, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও সারা বিশ্বে তোলপাড় হচ্ছে। কারণ জলবায়ুর খুবই সামান্য যেসব পরিবর্তন ইতোমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে, সেগুলোর প্রাথমিক ক্ষতিকর প্রভাব পৃথিবীর মানুষকে চমকে দিয়েছে। আবহাওয়া অস্থির হয়ে উঠেছে। ক্ষতি হচ্ছে স্বাভাবিক কাজকর্ম, জনজীবন, অর্থনীতি কমবেশি সবকিছুর।
গত বছরের নভেম্বর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি বিশেষ অবস্থা 'লা নিনা' সক্রিয় হয়ে ওঠায় সাগর থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু এবং মেঘ বাংলাদেশের দিকে বেশি আসছে। ফলে দেশে এবার বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ার ও আগাম বন্যার আশঙ্কা আছে বলে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
গত বছরের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে গত ২০ বছরে চরম আবহাওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী মানুষের পাশাপাশি অর্থনীতিরও প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। সামনে অপেক্ষা করছে আরও দুর্ভোগ। আগামী এক দশকে পৃথিবীর জন্য তাপপ্রবাহ এবং খরা সবচেয়ে বড় হুমকি। আবহাওয়াকে উত্তপ্ত করে তোলা নানা গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। যার প্রভাবে নতুন নতুন অঞ্চলে তাপদাহ এবং খরা দেখা দেবে। আগামী ১০ বছরে তাপপ্রবাহ বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তাপমাত্রা এর চেয়ে বেশি বাড়লে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে গত বছর বিরূপ আবহাওয়া, দাবানল ও পঙ্গপালের আক্রমণের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিজাত খাদ্য ব্যবস্থা যে মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনটি ইতিহাসে আর কখনও ঘটেনি।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়টির বায়ুম লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক আহ্‌?মদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, প্রকৃতিকে পুনরুদ্ধার করতে না পারলে আরও বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে। করোনার মতো আরও জীবাণু হানা দিতে পারে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক জলবায়ুবিদ ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন হচ্ছে। বরফ গলার কারণে নানা জীবাণু ছড়াচ্ছে। কিছু প্রাণী এসব জীবাণু ধ্বংসে ভূমিকা রাখত। আমরা তাদেরও বাঁচতে দিচ্ছি না। মানুষ পৃথিবীটাকে শুধু নিজের মনে করলে হবে না। নিজেদের স্বার্থেই বাঁচার সুযোগ দিতে হবে সব প্রাণীকে। আর এজন্য কমাতে হবে দূষণ।

মন্তব্য করুন