দেশে গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা জনমনে ব্যাপক নাড়া দিয়েছিল। একটি ঘটনা নারায়ণগঞ্জের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিদ্ধিরগঞ্জের সরদারপাড়ার রিমন সাউদ। তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছেই মারা যান বাবা ইয়ার হোসেন। স্বজনরা জানান, ইয়ার হোসেন পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন। ঘটনার দিনও তিনি বাসা থেকে হেঁটে বের হন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছার পর আকস্মিকভাবে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অপর ঘটনাটি চট্টগ্রামের পটিয়ার। ভান্ডারগাঁও গ্রামের মুকুন্দ বড়ূয়া নামের এক ব্যক্তি দুই কিশোরী মেয়েকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এক দিন পর তিনিও মারা যান। বিপত্নীক মুকুন্দ বড়ূয়া খুলনায় একটি জাহাজে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। গত বছর মার্চে লকডাউন শুরু হলে তিনি বাড়িতে চলে আসেন। একপর্যায়ে তার চাকরি চলে যায়। স্বজনদের ধারণা, চাকরি হারিয়ে মানসিক আঘাতের কারণে তিনি এমনটি করেছেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক মনে করেন, প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা থেকে এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি সমকালকে বলেন, করোনার মহামারি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সব দেশের মানুষের মধ্যে একইভাবে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সংক্রমণভীতির কারণে মানুষ অনেকটাই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। অনেককে আত্মীয়স্বজন, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। আবার লকডাউনসহ বিভিন্ন কারণে ঘরবন্দি জীবনযাপনের কারণে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করায় সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। ঝগড়া, মারধর ও বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। অনেকে করোনায় পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন হারিয়েছেন। কারও কারও উপার্জন কমে গেছে। আবার কেউ কেউ চাকরি হারিয়েছেন। আবার কেউবা চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন। এসব কারণে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এতে করে অনেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায়ও এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় ৪৬ শতাংশ মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণ পাওয়া গেছে। এছাড়া ৩৩ শতাংশ মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তার লক্ষণ পাওয়া যায়। দুই বছর আগে একই প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় ফলাফল ছিল একবারেই ভিন্নরকম। তখন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে বিষণ্ণতার হার পাওয়া যায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। দুশ্চিন্তার সমস্যা ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের।
এ চিত্র বিশ্নেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, সাধারণ সময়ের চেয়ে করোনাকালে মানসিক সমস্যা বেড়েছে। গবেষণায় আরও বলা হয়, গত এক বছরে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৪ হাজার। এ সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। সুনির্দিষ্টভাবে কভিড নিয়ে কুসংস্কার, ভীতির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, চিকিৎসা প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা, মৃত্যুভয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বেকারত্বের কারণে বাড়ছে মানসিক সংকট। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেও মানসিক চাপ বেড়েছে। করোনাকালে বেড়েছে পারিবারিক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে যত রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন, তাদের অধিকাংশের মধ্যে বিভিন্ন মানসিক উদ্বেগজনিত নানা ধরনের সমস্যা দেখা গেছে- তীব্র উদ্বিগ্নতা, হঠাৎ করে বুক ধড়ফড় করে, শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়, মনে হয় এখনই মৃত্যু হবে এমন। এটি ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। পরে আবার স্বাভাবিক হয়।
অধ্যাপক মেখলা বলেন, করোনাকালে অতিরিক্ত হাত ধোয়া, বারবার গোসল করাসহ খুঁতখুঁতে স্বভাব বেড়ে গেছে। এর ফলেও মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে ব্যক্তির খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগে না। ঘুম কমে যায়। এতে করে তার বুক, মাথা, পেট ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। এর ফলে ব্যক্তির মেজাজ খিটখিটে হয়। মানুষের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।
করোনার প্রভাব শিশু-কিশোর ও তরুণদের ওপরও পড়ছে বলে জানান ডা. মেখলা সরকার। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, জীবনযাত্রার রুটিন পরিবর্তনের কারণে তাদের মানসিক সুস্থতা বিঘ্নিত হচ্ছে। অনলাইন আসক্তি আর আচরণজনিত সমস্যা বাড়ছে। ভুলে যাওয়া সমস্যা, মনোযোগের অভাব, খিটখিটে মেজাজ, আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে বেশিরভাগ রোগী আসছেন। এ ছাড়া করোনাকালে মাদক সেবনের ঘটনাও বেড়েছে। আগে পরিমাণে কম মাদক নিতেন- এমন ব্যক্তিরা করোনাকালে তা বাড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যুক্তরাজ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীদের ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, মহামারির কারণে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়েছে। ইতালি ও স্পেনে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। কানাডায় ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২০ শতাংশ বেড়েছে মদ্যপান। মহামারির আগের অবস্থার তুলনায় এপ্রিলে ইথিওপিয়ার মানুষের মধ্যে বিষন্নতা তিনগুণ বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটের সম্পাদক ড. রিচার্ড হর্টন এক নিবন্ধে লিখেছেন, কভিড-১৯ বৈশ্বিক অতিমারি বা প্যানডেমিক নয় বরং এটি সিনডেমিক। কমপক্ষে দুই ধরনের রোগ বা সমস্যা যদি মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে কোনো বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যের (শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্য) ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাকে সিনডেমিক বলা যায়। মহামারির কারণে আর্থ-সামাজিক বড় ধরনের পরিবর্তনও সিনডেমিক হতে পারে।
সমস্যা বাড়ছে যে কারণে : জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল সমকালকে বলেন, করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা প্রত্যেকের মনে মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। সংক্রমিত হলে চিকিৎসার সুযোগ মিলবে কিনা এটি নিয়েও আতঙ্ক আছে। পরিবারের সদস্যদের সংক্রমিত হওয়ার ভয়, সংক্রমিত হয়ে আইসোলেশনে থাকাকালীন একাকিত্ব মনের ওপর চাপ বাড়ায়। এ ছাড়া কাছের মানুষের মৃত্যু মনকে শোকাতুর করে তোলে। ভীতিকর চিত্র বা সংবাদ দেখে আতঙ্কবোধ করে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন- এমন ব্যক্তি যখন দেখেন অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না, তখন তিনি মানসিক চাপ অনুভব করেন। চিকিৎসাসেবা কর্মীরা বাড়তি কাজের চাপের কারণে মানসিক সমস্যায় পড়েন। এ ছাড়া করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকট বেড়েছে। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। এতে করে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।
মানসিক সমস্যা হলে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে তা উল্লেখ করে মোহিত কামাল বলেন, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা অনুভব করা, একই ধরনের চিন্তা বারবার মনে আসা বা একই কাজ বারবার করা, হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে মৃত্যুভয়ে ভীত হওয়া, কোনো কিছুতে আনন্দ অনুভব না করা, মেজাজ খিটখিটে থাকা, মনোযোগ কমে যাওয়া, সাধারণ বিষয় ভুলে যাওয়া, নিজেকে অপরাধী ভাবা, আগ্রাসী আচরণ কিংবা আত্মহত্যার চিন্তা মনে আসা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
এই মনোবিদ বলেন, সংকটময় মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়া ও মানসিক চাপে পড়ে হতাশাবোধ করা স্বাভাবিক। কিন্তু আতঙ্কিত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। এতে করে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে আতঙ্ক ও মানসিক চাপ তার রোগকে আরও জটিল করে তুলবে। তাই সবাইকে মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।
পদক্ষেপ জরুরি :জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলো হলো- মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, উন্নতি ও যত্নে পুরো সমাজকে যুক্ত করা; জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দেশিকাও তৈরি করেছে। করোনা-সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটিও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার সমকালকে বলেন, করোনাকালে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে আগে থেকে মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরা করোনার কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন কম হচ্ছেন। এতে তাদের সমস্যা আরও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাজনিত বহুবিধ মানসিক সমস্যা। এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। বরাদ্দ বাড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সমস্যা হলে করণীয় :জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, খাবার, ঘুম ও ব্যায়ামের সময়সূচি ঠিক রাখতে হবে। ঘরে থাকাকে বন্দি বলে মনে করা যাবে না। গুজবে কান দেওয়া যাবে না। করোনাভাইরাসের বাইরেও জীবন আছে- সেটা মাথায় রেখে পড়ালেখা করা, নিজের যত্ন নেওয়া, বই পড়া, মুভি দেখা বা নিজের ব্যক্তিগত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
দিনে দু'বারের বেশি করোনাবিষয়ক সংবাদ দেখার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ডা. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মচর্চা করাও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে মিলে ঘরের ছোটখাটো কাজ যেমন- রান্নায় সাহায্য করা, ঘর পরিস্কার করা ইত্যাদিতে অংশ নিতে হবে। বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকতে হবে। কিন্তু ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়া চলবে না। বাবা-মাকে সন্তানের জন্য পৃথক করে সময় দিতে হবে। তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সন্তানের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মন্তব্য করুন