স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের মাসাধিককাল পরও একটা শ্রেণির ধারণা, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমন যতটা না আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগদান, তার চেয়ে বেশি এ দেশের নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা বিশেষ জায়গায় গমন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন এদেশে এসেছিলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গে ভোট শুরুর আয়োজন চলছে। রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি অতি জটিল; সর্বসাধারণের জ্ঞাত নয়। ফলে সাধারণভাবে মনে করা যেতে পারে, নরেন্দ্র মোদি হয়তো এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করেছেন। কিংবা দুটি উদ্দেশ্যের মিলে যাওয়া কাকতালীয়- এইভাবে ভেবে নেওয়া শ্রেয়তর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতুয়া অঞ্চলে সফর নিয়ে খোদ তৃণমূলপ্রধান অনেক বেশি সোচ্চার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিবার ওই সফরকে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থাও নিতে বলেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে জাত-পাতের বিভাজন থাকলেও নির্বাচনে এসবের প্রভাব ছিল না তেমন। কিন্তু গত দুটো নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে জাত-পাত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এবার প্রবলভাবেই উঠে এসেছে- মতুয়ারা কোনদিকে যাবে। বাম জমানায় শ্রেণিভিত্তিক উন্নয়ন নীতি ও সমাজের জাত-পাতের ব্যাপারটি অনেকাংশে চাপাই ছিল। কিন্তু জাত-পাতের ভিত্তিতে সামাজিক বৈষম্য, নিম্নবর্ণের সামাজিক সম্মানের প্রশ্ন এবং সংগঠনের আবেদন অদৃশ্য হয়ে যায়নি। মতুয়ারা সংগঠিত। তাদের টিকে থাকার মধ্যে জাত-পাতের ধারণাটি খুবই প্রবল। সাতচল্লিশের বেদনালিপ্ত ইতিহাসও আছে তাদের সামনে। শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এটি শুরু করেছেন, যা তাঁরই পুত্র শ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর সংগঠিত করেন এই গোষ্ঠীকে। শ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বেই ফরিদপুরের ওড়াকান্দি গ্রাম মতুয়া আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি হয়ে ওঠে এবং তা-ই প্রসারিত হয় সাতক্ষীরায়। শ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর মূলত ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য আচারনিষ্ঠ বৈদিক হিন্দু ধর্ম থেকে নিম্নবর্গের কৃষকদের বিশ্বমানবতার মন্ত্রে দীক্ষিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। নমঃশূদ্র ছাড়াও অনেক দলিত-অদলিত সম্প্রদায় এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল ওই সময়ে। আদতে শ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর ধর্মীয় আন্দোলনের পাশাপাশি কৃষকদের শিক্ষিত ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু গান্ধীজির স্বদেশি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে তারা দূরে অবস্থান করেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের বিরোধও ছিল সুস্পষ্ট।
অটল বিহারি বাজপেয়ির ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইনের মূল কথা ছিল, নাগরিকত্ব পেতে ১৯৭১ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করা জরুরি। ধারণা ছিল, ৭১-এর পর যারা এসেছে তারা মূলত মুসলিম। কিন্তু হলো উল্টো। মতুয়ারা ৭১-পূর্ব বিভিন্ন সময়ে ভারতে প্রবেশ করলেও কোনো কাগজই আর হাতে নেই। দীর্ঘদিন বসবাস করার পর প্রমাণ করা কঠিন- তারা ৭১-এর আগেই ভারতে এসেছে। নাগরিকত্ব পেতে মতুয়া নেতারা ২০০৯ থেকে মূল স্র্রোতের রাজনীতিতে আসতে শুরু করল রাজনৈতিক আনুকূল্য ছাড়া নাগরিকত্বের সমাধান সম্ভব নয়- এই ধারণা থেকে। তখন থেকেই বাম দল এবং তৃণমূল কংগ্রেস মতুয়াদের সমর্থন পেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ২০১১-এর নির্বাচনে এ সমর্থন গেল তৃণমূলের ঝুড়িতে। এখানেই বিজেপির আগমন- ২০২১ সালে বাংলার দখল চাই বিজেপির। ২০০৩ সালে বাজপেয়ির সমস্যা ২০১৯-এ এসে মোদি সরকার এক-সমাধান সূত্র বের করে মতুয়াদের কাছে টানতে চেয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে মতুয়াদের দলে টানতে সক্ষমও হলো বিজেপি; এবং এর ভালো ফলও পেল পশ্চিমবঙ্গে। সেটাই ধরে রেখে ২০২১-এ বাংলার দখল চাইছে বিজেপি। আসামে নাগরিকত্ব আইনে মানুষের যন্ত্রণা বেড়েছে। মনে করা হয়েছিল, মুসলিম এবং বাঙালি মুসলিমদের ভারতছাড়া করা যাবে। হলো উল্টো। ৫০-৬০ বছর একটা দেশে বসবাস করে, ভোটাধিকার প্রয়োগ করেও প্রমাণ দিতে হবে- ১৯৭১-এর আগে তারা ভারত এসেছিল! সব রাষ্ট্রীয় সুবিধাই পেয়ে আসছে মতুয়ারা। কিন্তু প্রমাণ দেওয়ার মতো কোনো কিছুই হাতে নেই। সুতরাং ঝুলন্ত মুলার দিকে সেই চেয়ে থাকা। তাতে কতজনের অবস্থা যে আসামের মতোই হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
পশ্চিমবঙ্গে ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার। কম-বেশি ৬০টি আসনের ভাগ্য সরাসরি নির্ধারিত হয় এই মুসলিম ভোটে। এমনিতর বিধানসভার ৩০টি আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট। ভোটের রাজনীতি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির লক্ষ্য, এই ৩০টিতে এককভাবে জিতে আসা। ফলে মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুর জন্মভূমিতে মোদির সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে- তা না বললেও চলে। ওড়াকান্দি মতুয়াদের কাছে অনেক বেশি সম্মানের স্থান। খানিক সমস্যা এই যে, মতুয়ারা বরাবরই ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য ও বৈদিক হিন্দু ধর্মের বিরোধী। মূলত তারা একটি সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলনে বিশ্বাসী- এই ধারণা আবার বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে যায় না। নির্বাচনে মতুয়ারা একটি দলকেই সমর্থন করবে- এমন মনে করার কারণ নেই। তাদের সামনে রয়েছে আসামের পরিস্থিতি। কাগজের অভাবে তাদেরও এমন অবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। ফলে বিজেপি যেভাবে চাইছে, সেই সমর্থন এককভাবে মিলবে বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, মতুয়ারা আগের মতো ঐক্যবদ্ধ নেই। নেই একক কোনো নেতা রাজনৈতিকভাবেও। একটি গ্রুপ আবার দলিত সাহিত্য একাডেমির ব্যানারে মূল রাজনীতি-সংস্কৃতির দিকে এসেছে। এদের কর্ণধার তৃণমূলের প্রার্থী এবার (বলাগড় কেন্দ্র)। দলিত সাহিত্যের আরেক পথিকৃৎ মোর্চার প্রার্থী (গাইঘাটা কেন্দ্র)। কেউ কেউ চুটিয়ে বিজেপি করছে। সুতরাং ভোট তো ভাগ হয়েই যাচ্ছে। ২০১১ কিংবা ২০১৯-এর অবস্থা যে আর বর্তমানে নেই- সেটাই মতুয়াপ্রধান এলাকায় পরিদৃষ্ট হবে। এ কথাও ঠিক, বিধানসভা আর লোকসভার ভোট এক রকম নয়। এ জন্য ২ মে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া পথ নেই।

 কবি ও গল্পকার