কাজে না এলে মজুরি নেই। আবার জ্বরজারি, গলাব্যথা নিয়ে কারখানায় প্রবেশে বারণ। এখন কী করবে মোমেন? দু'দিন ধরে গলাব্যথা তার। জ্বর বেশি নয়। গা ব্যথা, নিজে ছাড়া অন্য কেউ টের পায় না। কথা না বললে গলার ব্যথাও কেউ বুঝতে পারবে না। কোনো কথা না বলে চুপচাপ কারখানায় ঢুকে পড়বে- এরকম বুদ্ধিতে ভর করে সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়ে পড়ে মোমেন। কিন্তু বিধি বাম! কারখানার গেটে আটকে দেওয়া হয় তাকে। কপালে কী এক যন্ত্র ধরে তার চেয়ে কম বয়সী দারোয়ান বলল, 'ওই তুই ঢুকতে পারবি না। তোর জ্বর। করোনা হইছে করোনা।' কতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। সহকর্মীরা লাইন ধরে কারখানায় ঢুকছে। এক পর্যায়ে অনুরোধ, পরে বাদানুবাদ। কিন্তু কিছুতেই কারখানায় ঢুকতে পারল না সে। হতাশায় ব্যর্থ, বিবশ মোমেন ঘরে ফিরে আসে। এভাবে পনেরো দিন। চিকিৎসা বলতে গরম পানি আর সামান্য প্যারাসিটামল। পনেরো দিনের মাথায়ই আবার আগের মতো সুস্থ সে। কিন্তু কাজে আর ফেরা হয়নি। রাজধানীর মিরপুরে কালশীতে ঠিকা কাজের ছোট কারখানাটি আপাতত বন্ধ।
অতিমারি করোনার করুণ অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণে জনজীবন এখন রীতিমতো নাস্তানাবুদ। এক পোশাক খাতেই মোমেনের মতো ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে এখন বেকার। লকডাউনের মাসগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৩৫ শতাংশ শ্রমিকের আয় কমেছে। তাদের কেউ কাজ হারিয়েছে। কারও কাজের কর্মঘণ্টা কমেছে। কারও মজুরি কমেছে। মজুরি অনিয়মিত হয়েছে অনেকের।
রুটি-রুজি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদে আছে দৈনিক ভিত্তিতে শ্রম বিক্রি করা খেটে খাওয়া মানুষ, হকার, ঠিকা মজুরি, ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসাসহ সব পর্যায়ের শ্রমজীবীরা। বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ রয়েছে এইসব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। অনানুষ্ঠানিক খাতের এসব শ্রমিক কোনো ধরনের কাঠামোর মধ্যে নেই। সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ডের নূ্যনতম মজুরি কাঠামোর মধ্যেও নেই তারা। তাদের কোনো শ্রম অধিকার নেই। এমনকি রাষ্ট্রের শ্রম আইনেও বলা হয়েছে, অপ্রতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইন প্রযোজ্য নয়। করোনাকালে সরকারের দেওয়া নগদ অর্থ-খাদ্য সহায়তা থেকেও বঞ্চিত সাধারণ শ্রমজীবীরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে কম খেয়ে, না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সামনে রেখে দিন কাটছে এসব শ্রমজীবী মানুষের। খেটে খাওয়া মানুষের এরকম দীর্ঘশ্বাসের চরম এক দুর্দিনে এবার এসেছে মহান মে দিবস।
এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয়। করোনা-কাবু গোটা দুনিয়া। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় এবার বৈশ্বিকভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে নির্মাণ খাত, পর্যটন, অতিক্ষুদ্র ব্যবসা উদ্যোগে নিয়োজিত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সংকট থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষার কৌশল নির্ধারণে আইএলওর সদস্য ১৩৩ দেশের মধ্যে ১০৮টি দেশ কোনো না কোনোভাবে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে দুটি পথ খোলা আছে সরকারের সামনে। এক, উদ্যোক্তারা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারেন সে ব্যবস্থা করা। দুই, সরাসরি শ্রমিকদের হাতে সহায়তা পৌঁছানো। তবে এখানে বড় ধরনের দুর্বলতা আছে সরকারের। পোশাক খাতে উদ্যোক্তাদের কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও অন্যান্য খাতে তেমন কিছু দেওয়া হয়নি। ৯০ লাখ উদ্যোক্তার মধ্যে হয়তো এক লাখ উদ্যোক্তা সরকারের প্রণোদনা থেকে সুবিধা পেয়েছেন। শ্রমিকদের হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা প্রতিবেশী ভারতও যেভাবে এগিয়েছে, সে ধারণা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাধ্য-সামর্থ্যের মধ্যে কোনো বিধিব্যবস্থা করতে হবে।
নির্ধারিত সময়হীন অতিরিক্ত শ্রম ও কম মজুরিতে তীব্র শোষণের ফলে গড়ে ওঠা শ্রমিকদের বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের পটভূমিতে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদন এবং শ্রমের ন্যায্য মজুরির দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। শ্রমিকদের আন্দোলন, মিছিল আরও বেগবান হয় ৩ ও ৪ মে। একপর্যায়ে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে অনেক শ্রমিক হতাহত হন। আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা সাত শ্রমিক নেতাকে মৃত্যুদে দি ত করা হয়। ১৮৯০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্যারিস কংগ্রেসে বিশ্বব্যাপী মে মাসের ১ তারিখ 'মে দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
জোরালো শ্রমিক আন্দোলন ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পটভূমিতে গত শতাব্দীতে দেশে দেশে মে দিবস উদযাপন এক বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস রূপে তা পালিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এদিন সাধারণ ছুটি প্রবর্তিত হয়।
লকডাউনের কারণে গত বছরের মতো এবারও মে দিবসের সব ধরনের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক বাণীতে তারা দেশের শ্রমজীবী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য দলের নেতারাও এ উপলক্ষে শ্রমজীবী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
শ্রমিকদের সহায়তা নামমাত্র :সম্প্রতি প্রকাশিত সিপিডির এক গবেষণায় বলা হয়, করোনার সংকটকালে সরকারের দেওয়া খাদ্য এবং অর্থ সহায়তার মধ্যে সারাদেশের শ্রমিকদের মাত্র ৮ শতাংশ এই সুবিধা পেয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিলসের উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ছোট পুঁজির অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। হুট-হাট চাকরি যাচ্ছে শ্রমিকদের। এ রকম বেকারত্বের ঘটনা শ্রমজীবী মানুষের জীবনে আগে কখনও হয়নি। তিনি বলেন, সরকারের খাদ্য এবং অর্থ সহায়তা পায়নি এসব শ্রমিক, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক স্থানে বণ্টন হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অসংগঠিত শ্রমিকদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর মতো কোনো মেকানিজম নেই। প্রতিবেশী ভারতেও অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য কল্যাণমূলক অনেক সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। সরকার সেই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে।
পোশাক খাতে আয় হ্রাস :করোনায় লকডাউনের মাসগুলোতে পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি ৩৫ শতাংশ কমেছে। আয় কমার পাশাপাশি অনেক শ্রমিকের মাসিক মজুরি হচ্ছে দেরিতে। কয়েক হাজার শ্রমিক তাদের কাজ হারিয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। কিছু কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ ও ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
কর্মহীন গৃহশ্রমিক :গৃহশ্রমিকদের ৮০ শতাংশ কাজ হারিয়েছে করোনায়। শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরতে বাধ্য হয়েছে তারা। সরকারের কোনো ধরনের সেবার আওতায় নেই এসব শ্রমিক। অনেকেই নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। দেশে গৃহশ্রমিকের মোট সংখ্যা ২৫ লাখ। তাদের ৯৯ শতাংশই নারী। গৃহশ্রমিকদের ৬০ শতাংশ খ কালীন কাজ করে। গড়ে তিন বাসায় কাজ করে মাসে আয় করে চার হাজার টাকা। যারা এখনও কাজ করছে তারা সুরক্ষা সামগ্রীর অভাবে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। গৃহশ্রমিকদের অধিকারভিত্তিক সংগঠন ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস নেটওয়ার্ক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। জানতে চাইলে সংগঠনের সমন্বয়ক আবুল হোসেন জানান, গত বছর লকডাউনে কাজ হারানো শ্রমিকদের জন্য সরকারের তরফে মানবিক সহায়তা পেতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে চার হাজার শ্রমিকের একটি তালিকা দিয়েছিলেন তারা। কোনো ফল পাননি। এ কারণে এ বছর আর কোনো চেষ্টা করছেন না তারা। বিদেশে গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত অনেক শ্রমিক খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।

মন্তব্য করুন