ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সরাসরি দেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করছে। প্রকৃত অপরাধীদের পরিবর্তে সাংবাদিকদেরই এই আইনের টার্গেট করা হচ্ছে। শুধু ২০২০ সালেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৭০টি মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। 

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে  সোমবার আয়োজিত ওয়েবিনারে এসব কথা বলেছেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা।

'করোনার দ্বিতীয় ঢেউ :জাতির নতুন ঝুঁকি- গণমাধ্যমে গভীর সংকট' শিরোনামে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'আর্টিকেল নাইন' এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এতে সহায়তা দেয় এশিয়া ফাউন্ডেশন।

'আর্টিকেল নাইন'-এর আর্টিকেল নাইনটিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সালের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, একাত্তর টেলিভিশনের কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর মিথিলা ফারজানা, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের প্রতিনিধি সালিম সামাদ, সাংবাদিক পুলক ঘটক, ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদসহ রাজধানী ও ঢাকার বাইরের সাংবাদিকরা। সেমিনারে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন আর্টিকেল নাইনের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মরিয়ম শেলি।

গবেষণাপত্রে বলা হয়, ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭২টির মধ্যে ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ আইনে ৬৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয় ৮৬ জনকে। এর মধ্যে আটজন সাংবাদিক। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫০ জন আসামিকে, যার মধ্যে দু'জন সাংবাদিক। করোনা মহামারিতে চাকরিচ্যুত এক হাজার ৬০০ গণমাধ্যমকর্মীর মধ্যে ১৫০ জন নারী। করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫২ গণমাধ্যমকর্মী।

সেমিনারে সোহরাব হাসান বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও কোনো সরকারই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেয়নি। নানাভাবে কৌশলে তথ্য প্রকাশ করতে হয়েছে গণমাধ্যমকে। যে দলই ক্ষমতায় যাক না কেন, গণমাধ্যমের বিষয়ে তাদের চেহারা পাল্টে যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রচারমাধ্যমগুলোও পরিণত হয় ক্ষমতাসীন দলের সম্পদে। অথচ এটি হওয়ার কথা জনগণের প্রচারমাধ্যম।

তিনি আরও বলেন, করোনাকালেও গণমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। এ সময় হাসপাতাল ও করোনা সুরক্ষার সামগ্রী বাণিজ্যসহ নানা ধরনের দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন বাহিনীর অভিযানসহ সব বিষয়ে সরকার যতটুকু প্রকাশ করেছে, সাংবাদিকরাও ততটুকুই পেয়েছেন। এ ছাড়া সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা, ঐক্য, সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা, ছাঁটাই, নিজস্ব পূঁজির অভাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার খর্ব করে বলে মনে করেন তিনি।

সালিম সামাদ বলেন, বর্তমানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ আইনের খড়গ মাথার ওপর ঝুলে থাকছে সব সময়। এটা এমন একটা আইন, যেখানে যে কোনো শব্দ প্রয়োগের জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রয়োগ করার সুযোগ আছে। এ আইন দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য বিনা অপরাধেই সাংবাদিককে দিনের পর দিন জেলে আটকে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে গণমাধ্যমে এক ধরনের সেলফ সেন্সরশিপ করা হচ্ছে। আবার এ আইন কাদের ওপর প্রয়োগ করা হবে, তা সরকারই নির্ধারণ করে। মহামারিতে মৌলবাদীরা ব্যাপক ভুয়া সংবাদ ছড়িয়েছে এবং করোনাভাইরাস নিয়ে অপপ্রচার করেছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। অথচ মাস্কের নিম্নমান নিয়ে কথা বলায় একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আসলে এটা আইনের নামে একটি অস্ত্র, সুযোগ বুঝে যখন খুশি যার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়।

মিথিলা ফারজানা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, লেখক ও মুক্ত চিন্তাবিদদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু অনলাইনে যৌন হয়রানি করা, ট্রলকারীদের মতো প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। বিশেষত নারীরা অনলাইনে অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছেন না।

ফারুখ ফয়সল বলেন, নারী সাংবাদিকদের জন্য অনলাইন হয়রানি বিশেষ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সমাধান হওয়া জরুরি।






মন্তব্য করুন