নানামুখী চাপে থাকা হেফাজতে ইসলামের আহ্বায়ক কমিটির পরিধি আবার বাড়ানো হচ্ছে। শিগগিরই এতে দু-তিনজন সদস্য যুক্ত হচ্ছেন। তবে কারা এই কমিটিতে আসছেন, তা নিয়ে এখনও 'দেনদরবার' ও বিভিন্নমুখী হিসাব চলছে। এতে সংগঠনটির প্রয়াত নেতা শাহ আহমদ শফীর অনুসারীদের স্থান হতে পারে বলে জানা গেছে। হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি তৈরির আগে বর্ধিত এই আহ্বায়ক কমিটিই সংগঠনের কার্যক্রম চালাবে। সংগঠনটির একাধিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গতকাল বুধবার সমকালকে এ তথ্য জানান।
গত ২৫ এপ্রিল হঠাৎ বিলুপ্ত করা হয় হেফাজতের কমিটি। ওই দিন রাতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আহ্বায়ক কমিটিও গঠন করা হয়। প্রথমে এই কমিটির সদস্য ছিল তিনজন। আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আরও দু'জন সদস্য বাড়ানো হয়।
জানা গেছে, হেফাজতের নেতাকর্মীদের ওপর এখনও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। এ ইস্যুতে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্নিষ্টরা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে মঙ্গলবারও এ নিয়ে একটি সমন্বয় সভা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে নেওয়া কর্মসূচিতে যারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িয়েছে ও নেপথ্যে ইন্ধন দিয়েছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে ১৯ জন হেফাজত নেতার একটি 'শর্ট লিস্ট' রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই তালিকায় আছেন- হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব নাসির উদ্দিন মনির, সহকারী যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ আলী নিজামপুরী, সহকারী অর্থ সম্পাদক আহসান উল্লাহ, হাটহাজারীর হেফাজত নেতা আসাদুল্লাহ আসাদ, ঢাকা মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক আজহারুল ইসলাম। সব মিলিয়ে গ্রেপ্তারের তালিকায় আছেন দেড় শতাধিক হেফাজত নেতা।
সংশ্নিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে হেফাজতের অনেক নেতা এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে তাদের ওপর নজরদারি রয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত দুই সপ্তাহে হেফাজতের পক্ষ থেকে একাধিক দফায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করা হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতেও একটি প্রতিনিধি দল মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মামলা প্রত্যাহার, গ্রেপ্তার বন্ধ করা, কওমি মাদ্রাসা খুলে দেওয়াসহ চারটি দাবি জানান হেফাজত নেতারা। তবে একটি দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে বলছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যারা নাশকতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। তবে নিরপরাধ আলেম-ওলামারা যাতে হয়রানির শিকার না হোন, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন সংশ্নিষ্টরা। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে যে যতটুকু জড়িত, তার দায় তাদের নিতে হবে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একজন কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের ঘটনায় তারা ২৩ মামলার তদন্ত করছেন। হেফাজতের পেছনে কারা কীভাবে রয়েছেন, তা বের করবে পিবিআই। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরকারী একজন ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। একই ঘটনায় সংশ্নিষ্ট আরও দু'জন মাদ্রাসাছাত্রের নাম প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতা চলাকালে আনসার অফিস থেকে টিভি, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ লুট করা হয়েছিল। এরই মধ্যে এসব লুট করা জিনিস জব্দ করেছে পিবিআই।
সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনায় একের পর এক নেতা গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি মামুনুল হকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সামনে এলে চাপে পড়ে হেফাজত। এরপর সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করে সদ্য সাবেক আমির জুনায়েদ বাবুনগরীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আহ্বায়ক কমিটির অন্য চারজন হলেন মহিববুল্লাহ বাবুনগরী, নুরুল ইসলাম জিহাদী, সালাউদ্দিন নানুপুরী ও মিজানুর রহমান চৌধুরী। হেফাজতের কমিটি বিলুপ্তের পরপরই পাল্টা নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয় প্রয়াত আহমদ শফীর অনুসারীরা। বর্ধিত আহ্বয়ক কমিটিতে তাদের স্থান হতে পারে।
জাকারিয়া নোমান গ্রেপ্তার :চট্টগ্রাম ব্যুরো ও হাটহাজারী প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় হামলাসহ সহিংস তাণ্ডবের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা জাকারিয়া নোমান ফয়জীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি হেফাজতের বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তাকে হাটহাজারী থানায় হস্তান্তর করা হবে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
দুই নেতা কারাগারে :হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দুই নেতাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। তারা হলেন হাটহাজারী উপজেলা শাখার সহকারী দাওয়াহবিষয়ক সম্পাদক তাজুল ইসলাম ও হেফাজত নেতা মো. খিজির। গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আঞ্জুমান আরার ভার্চুয়াল আদালত এ আদেশ দেন।

বিষয় : হেফাজত

মন্তব্য করুন