প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক চীনা টিকা পেতে সরকারকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। শর্তগুলো অস্বাভাবিক হলেও তা পূরণ করে সংকটকালে টিকা পেতে চাইছে সরকার। এ টিকা আনতে ১১ মে বিমান পাঠাবে সরকার। পরদিন ওই টিকা নিয়ে দেশে আসবে।
উপহার হিসেবে চীন সিনোফার্মের পাঁচ লাখ ডোজ টিকা বাংলাদেশকে দেবে। বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু এ টিকা দিতে চীন দুটি শর্তারোপ করেছে। এক. উপহারের টিকা বাংলাদেশকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশকে বিমান পাঠাতে হবে। দুই. ওই টিকা প্রথমে বাংলাদেশে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চীনের নাগরিকদের বিনামূল্যে আগে দিতে হবে। এরপর বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে টিকা বিতরণ করা যাবে। চীনের শর্ত পূরণ করেই উপহারের এ টিকা আনতে যাচ্ছে সরকার।
রাশিয়ার টিকা পেতেও সরকারকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। রাশিয়ার ওই শর্তের জবাবে কাগজপত্র তৈরি করা হচ্ছে। কাগজপত্র চূড়ান্ত করে আজ বৃহস্পতিবার তা ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাসে পাঠানো হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, চীনের দুটি শর্ত হাস্যকর। কারণ, তাদের উপহারের টিকা বিমান ভাড়া দিয়ে বাংলাদেশকে আনতে হবে। আবার তাদের নাগরিকদের আগে বিতরণ করতে হবে। কয়েক হাজার চীনের নাগরিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। সুতরাং টিকার একটি বড় অংশ তাদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। এরপর অবশিষ্ট টিকা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিতরণ করা যাবে। এই টিকা আনতে বিমান ভাড়া বাবদ যে ব্যয় হবে, তা চীনা টিকা কেনার চেয়ে বেশি হতে পারে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।
স্বাস্থ্য বিভাগের অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সবকিছু বিবেচনা করে দেখা যাচ্ছে, চীনের উপহারের টিকা আনতে আমাদের আর্থিক লোকসান হবে। এরপরও সরকার নিরুপায়।
কারণ, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে চুক্তি অনুযায়ী টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। সেরামের বাইরে বিকল্প উৎস চীন ও রাশিয়া। এই দুটি দেশের টিকা সংরক্ষণের সুবিধা দেশে রয়েছে এবং অন্যান্য টিকার চেয়ে পাওয়াও সহজ হবে। এ কারণে রাশিয়া ও চীনের টিকা নেওয়া হচ্ছে।
শর্ত মেনে চীনের টিকা নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ভারত থেকে টিকা না পাওয়ায় বাংলাদেশের চলমান টিকাদান কর্মসূচি ঘিরে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের হাইকমান্ড থেকে টিকার বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরই টিকা পেতে চীনের নেতৃত্বে একটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ওই প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকা সংগ্রহ করা যাবে। এখন লোকসান হলেও চীনের উপহারের টিকা নিতে হচ্ছে। কারণ, উপহারের টিকা গ্রহণ না করলে পরবর্তী সময়ে তাদের কাছ থেকে টিকা পাওয়া নিয়ে সমস্যা হতে পারে। সেরামের বিকল্প হিসেবে রাশিয়া ও চীনের টিকা প্রয়োজন।
গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে টিকা ক্রয় নিয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় রাশিয়া ও চীনের টিকা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, সভার শুরুতেই চীনের উপহারের ৫ লাখ ডোজ টিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
রাশিয়ার টিকায়ও কঠিন শর্ত :অন্যদিকে রাশিয়ার টিকার শর্তগুলোও সভায় পর্যালোচনা করা হয়। রাশিয়ার শর্তে বলা হয়েছে, তাদের টিকা পাওয়ার শর্ত হচ্ছে, বায়ার হবে নন-এক্সক্লুসিভ, অর্থাৎ একক কোনো প্রতিষ্ঠান হবে না। রাশিয়া চাইলে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে টিকা সরবরাহ করতে পারবে। অপর একটি শর্ত হচ্ছে, টিকা পেতে কোনো সময়সীমা আরোপ করা যাবে না। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকা দিতে না পারলে তাদের দায়ী করাও যাবে না। তবে রাশিয়ার টিকা বাংলাদেশে উৎপাদনের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, রাশিয়ার শর্তগুলো পর্যালোচনা করে বেশকিছু জবাব তৈরি করা হয়েছে। নন-এক্সক্লুসিভ বায়ারের জবাবে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে জি টু জি অর্থাৎ দুই দেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে টিকা পেতে চায় বাংলাদেশ। সরকার কখনও ক্রেতা হয় না। কারণ, সরকার তো টিকা বিক্রি করবে না। ওই টিকা দেশের জনগণের জন্য বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। এছাড়া টিকা দেওয়ার সময়সীমার জবাবে বলা হয়, টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলে তার নির্দিষ্ট একটি সময়সীমা থাকবে। কারণ রাশিয়ার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার ২১ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। টিকাদান অব্যাহত রাখতে রাশিয়াকে নিশ্চয়তা দিতে হবে, প্রতি মাসে বাংলাদেশকে তারা কত সংখ্যক ডোজ টিকা সরবরাহ করবে, সে অনুযায়ী টিকাদান পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে টিকা না পেলে সংকট হবে। সুতরাং সময়সীমার নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ।
রাশিয়ার টিকা দেশে উৎপাদন প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা জানান, রাশিয়া টিকার প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্পুটনিক টিকা উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছিল। শর্ত ছিল, সেটি গোপন রাখতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে তা গোপন রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী দেশে টিকা উৎপাদনে সক্ষম এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তাদের কাছে পাঠানো হয়। তাদের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল ওই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করবে। প্রতিনিধি দল যে প্রতিষ্ঠানকে টিকা উৎপাদনের জন্য যোগ্য মনে করবে তাদের মাধ্যমে উৎপাদন করা হবে। এ ছাড়া রাশিয়া চাইলে তাদের দেশে টিকা উৎপাদন করে বাংলাদেশে বোতলজাত করতে পারে। এর বাইরে যৌথ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে তারা টিকার উৎপাদনও করতে পারবে। এ ছাড়া টিকার মূল্য কমানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, রাশিয়ার প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। খুঁটিনাটি বিষয়ে উত্তর তৈরি করে তা আইনজীবীর কাছে দেওয়া হয়েছে। এটি আজ তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এটি রাশিয়ার প্রতিনিধিদের কাছে পাঠানো হবে। এ ছাড়া চীনের উপহারের টিকাও আমরা নেব। ওই টিকা প্রয়োগের পর কার্যকারিতা দেখে চীন থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
টিকার নিবন্ধন স্থগিত :দেশে করোনাভাইরাসের টিকার ঘাটতি থাকায় প্রথম ডোজ বন্ধের পর এবার নিবন্ধনও বন্ধ করা হলো। এখন থেকে টিকাগ্রহীতারা অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারবেন না। এর আগে গত ২৬ এপ্রিল প্রথম ডোজের টিকাদান বন্ধ করা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সাংবাদিকদের জানান, টিকা সংকটের কারণে প্রথম ডোজ এরই মধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। এখনও ১৩ লাখের বেশি টিকার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে টিকা না আসা পর্যন্ত টিকার নিবন্ধন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, চলমান টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিশ্বব্যাপী টিকা নিয়ে এক ধরনের সংকট চলছে। যুক্তরাষ্ট্র কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ রাখায় এর প্রভাব পড়েছে সেরামের টিকা উৎপাদনে। ভারত সরকার সে দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। এ কারণে চুক্তি অনুযায়ী আমরা টিকা পাচ্ছি না। ওই টিকা না পাওয়ায় টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে টিকা পেতে আলোচনা করে যাচ্ছি। তারা টিকা দেবে না- এমনটি বলেনি। তবে কবে নাগাদ টিকা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনো আশ্বাস দিচ্ছে না।
রাশিয়া ও চীনের টিকা বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাশিয়া ও চীনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কিছু কিছু বিষয়ে তাদের সুবিধা মতো প্রস্তাব করা হয়েছে। সেটি মেনে নিলে বাংলাদেশের জন্য সংকট হবে। ওই সব শর্তের বিষয়ে জবাব তৈরি করে তাদের প্রস্তাব পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। দ্রুততম সময়ে রাশিয়া ও চীন থেকে টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিষয় : উপহারের টিকায়ও শর্ত!

মন্তব্য করুন