রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সদ্য বিদায় নেওয়া উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান তার শেষ কর্মদিবসের আগের দিন ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর অধিকাংশই ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মী। এ নিয়োগ দিতে তিনি অগ্রাহ্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় বিধি; এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞাও। তার এই গণনিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। পাশাপাশি এই নিয়োগ টিকবে কিনা তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
গত ৫ মে নিজের ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন অধ্যাপক সোবহান। পরদিন তার শেষ কর্মদিবসে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা কাজে যোগদান করেন। এই নিয়োগকে ওইদিন বিকেলেই অবৈধ ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে। কমিটির সদস্যরা রোববার তদন্তকাজ শুরু করবেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চিঠি দেয়। এ অবস্থায় এই নিয়োগ টিকবে না বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন নিয়োগ দেওয়া পদগুলোর মধ্যে আগেই বিজ্ঞাপন দেওয়া কিছু পদও আছে। অনেক চাকরিপ্রার্থী তার বিপরীতে আবেদন করেছিলেন। কিছু পদে পরীক্ষাও হয়েছে। তাই তাদের বাদ রেখে ওই পদে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া যায় না। কেউ আদালতে গেলে এই নিয়োগ বাতিল হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন অর রশীদ বলেন, উপাচার্যের নির্বাহী আদেশে তাদের নিয়োগ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যোগদানপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই নিয়োগ কার্যকর হয়। যেহেতু চাকরি পাওয়া সবাই নিয়োগপত্রে সই করে জমা দিয়েছেন, সুতরাং তাদের নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। নিয়োগ নিয়ে জটিলতা থাকলে সেটি প্রশাসনের দেখার বিষয়।
নিয়োগ আদেশে উল্লেখ করা হয়, 'রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩ এর ১২ (৫) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিম্নলিখিত প্রার্থীদের তাদের নামের পাশে বর্ণিত পদ ও স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে (অ্যাডহক) অনধিক ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলো। এ নিয়োগ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হোক।'
সহকারী রেজিস্ট্রার সমকালকে বলেন, 'অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্তরা ছয় মাস পর চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন। তখন কর্তৃপক্ষ চাইলে তার নিয়োগসীমা বাড়বে। এ ছাড়া সিন্ডিকেট চাইলে অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্তদের স্থায়ী নিয়োগ দিতে পারে। তবে বাদ দেওয়ার ইতিহাস নেই।'
তালিকায় দেখা যায়, নিয়োগ পাওয়া লোকজনের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন কর্মকর্তা, ৮৫ জন উচ্চমান ও নিম্নমান সহকারী এবং ২৪ জন সহায়ক কর্মচারী। তাদের মধ্যে শিক্ষকদের সন্তান, স্ত্রী ও স্বজন, ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মী ও চারজন সাংবাদিক রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম খান বলেন, উপাচার্য তাদের শেষ মুহূর্তে নিয়োগ দিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছেন। তা ছাড়া প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি নিয়োগ দিয়ে গেছেন। এর মাধ্যমে ক্যাম্পাসে চলমান সংকট আরও বেড়ে গেল। নিয়মের বাইরে যা ঘটে তাই অনিয়ম। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করবে।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে কিনা- এমন প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাবেক শীর্ষ এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'মন্ত্রণালয় সরকারের প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ দেয় সরকার। সে ক্ষেত্রে সরকার অবশ্যই সেটি পারে। কেননা নিয়োগ পাওয়াদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ সরকারকেই বহন করতে হবে।'
উপাচার্যবিরোধী হিসেবে পরিচিত দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজের মুখপাত্র সুলতান উল ইসলাম টিপু দাবি করেন, ছাত্রলীগের নেতাদের নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হলেও জামায়াত-বিএনপি পরিবারের অনেককেই চাকরি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি তাদের পরিচয় জানাননি।
তবে সদ্যবিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান দাবি করেন, যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। জামায়াত-বিএনপির কেউ নিয়োগ পায়নি। কাউকে টাকার বিনিময়েও নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
অধ্যাপক সোবহানের ভাষ্য, 'এই নিয়োগ অবৈধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত কমিটি দেখুক। তারা আমার কাছে আসুক। আমি ফেস (মোকাবিলা) করব।'
এর আগে ২০০৪ সালে তৎকালীন উপাচার্য ফাইসুল ইসলাম ফারুকী একসঙ্গে ৫৪৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেই নিয়োগ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। মামলাও হয়েছিল। পরে তাদের মধ্য থেকে প্রায় ১৫০ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। বাকিরা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করছেন। অধ্যাপক আব্দুস সালামের নিয়োগকাণ্ডের সঙ্গে আগের সেই নিয়োগকে তুলনা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত:
নিয়োগ নিয়ে বৃহস্পতিবার দিনভর ক্যাম্পাস উত্তপ্ত থাকলেও শুক্রবার সকাল থেকেই একেবারে শান্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সকাল ৯টায় জোহা চত্বর ও প্যারিস রোডে কিছু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখা মেলে। এর বাইরে ক্যাম্পাসে তেমন লোকজনের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। আগের দিন উপাচার্যের বাসভবনের ফটকে পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও গতকাল তা ছিল না। উপাচার্য সপরিবার ওই বাসা ছেড়ে গেছেন। বাসভবনের ভেতরে গেটের পাশে পাহারায় আছেন দুই পুলিশ সদস্য ও দু'জন প্রহরী। বাসভবনের চত্বরে কাজ করছেন কয়েকজন মালী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
প্রহরী সায়েম হোসেন বলেন, উপাচার্য চলে গেছেন। আমাদের কাজ আমরা করছি। উপাচার্য থাকলেও আমাদের এই বাড়ির দেখভাল করতে হয়, না থাকলেও করতে হয়। বাড়িতে মোট ১০ জন প্রহরী রয়েছে। সব সময় চারজন পুলিশও নিরাপত্তা নিশ্চিতে থাকেন। এ ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালী, পিয়নসহ সব মিলিয়ে ১৫-১৬ জন বাড়িতে কর্মরত আছে।'

বিষয় : ইসলামী ছাত্রশিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন