লকডাউনের বিধিনিষেধ ভেঙে ঈদের আগে মানুষ পথে পথে ভোগান্তি সয়ে যেভাবে গ্রামে গিয়েছিল, ছুটির পর সেভাবেই ফিরছে। মঙ্গলবার রাজধানীর প্রবেশ পথ ও ফেরিঘাটগুলোতে ঈদের আগের মতো চিত্রই দেখা যায়। ঈদের আগে সবাই যেমন উপচেপড়া ভিড় ঠেলে গ্রামে গিয়েছিল, তেমন পরিস্থিতির মধ্যেই কর্মস্থলে ফিরতে হচ্ছে তাদের।

মঙ্গলবার রাজধানীর আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, যাত্রাবাড়ী, টঙ্গীসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের ঢল দেখা যায়। রাজধানীর অন্য প্রবেশ পথের মতো আমিনবাজারেও ঢাকামুখী বাস ও অন্যান্য যাত্রীবাহী যানবাহনকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। যাত্রীরা আমিনবাজার, হেমায়েতপুর নেমে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে গাবতলী সেতু পার হয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করছে। সকালের দিকে তীব্র গরমে নাকাল হতে হয়েছে তাদের। বিকেলে ভুগতে হয়েছে বৃষ্টিতে।

বেলা আড়াইটার দিকে গাবতলী সেতুর পশ্চিম প্রান্তে কথা হয় রুহুল আমিনের সঙ্গে। তিনি নড়াইলের লোহাগড়া থেকে এসেছেন। থাকেন ঢাকার কলাবাগানে। ঈদ করতে বাড়ি গিয়েছিলেন। অফিস খুললেও গাড়ি না পাওয়ায় এক দিন বিলম্বে এসেছেন।

রুহুল আমিন জানান, লোহাগড়া থেকে মাইক্রোবাসে এক হাজার টাকা ভাড়ায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাটে এসেছেন। ১০০ টাকায় ফেরিতে পদ্মা নদী পার হয়েছেন। এরপর পাটুরিয়া থেকে ব্যাগ নিয়ে তীব্র রোদে হেঁটে এসেছেন উথলী পর্যন্ত। সেখান থেকে বাসে হেমায়েতপুর এসেছেন ২০০ টাকায়। এরপর ঢাকার উদ্দেশে হাঁটা ধরেছেন। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে আসা বশির উদ্দিনের অভিজ্ঞতা একই রকম। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গ্রামে গিয়েছিলেন তিনিও।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের। যারা উচ্চ ভাড়ায় মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেট কারে আসতে পারছেন না। রংপুরের বদরগঞ্জের মো. মিলন তাদেরই একজন। তিনি গাবতলী হাটে কাজ করেন। লুঙ্গি পরিহিত মিলন প্লাস্টিকের বস্তায় কাপড়-চোপড় নিয়ে পিকআপে ঢাকায় এসেছেন। হেমায়েতপুরে পুলিশ গাড়ি আটকে দেওয়ায় বস্তা মাথায় নিয়ে হেঁটে রওনা হন। তিনি জানান, বাসে ভেঙে ভেঙে আসতেও হাজারখানেক টাকা লাগে। অত টাকা তার নেই। পিকআপে ৩০০ টাকায় এসেছেন।

হেমায়েতপুরে দেখা যায়, একের পর এক যাত্রীবোঝাই ট্রাক আসছে। সেগুলো যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে ঘুরে চলে যাচ্ছে। সেখানে থাকা পুলিশের উপ-পরিদর্শক নাজমুল হাসান বলেন, পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পেলে আটকে দেওয়া হচ্ছে। যেসব বাস অতিরিক্ত যাত্রী তুলছে, সেগুলোও আটকে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে প্রতিটি ফেরিঘাটে মঙ্গলবার ছিল রাজধানীমুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়। গাদাগাদি করে তারা ফেরিতে উঠেছেন। মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটে ঢাকামুখী মানুষের ভিড় ছিল। একই চেহারা দেখা গেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও পাবনার কাজীরহাট ফেরিঘাটে। এসব ঘাট থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ-স্পিডবোট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে ট্রলার, ছোট লঞ্চ ও স্পিডবোট চালায়। বিভিন্ন ছোট গাড়িতে যাত্রীরা ঢাকামুখী হয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিটি সড়কপথেই যাতায়াতের ছিল একই চিত্র।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার কর্মস্থলগামী মানুষের ঢল নামে দৌলতদিয়া ঘাটে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। ঘাট ঘুরে দেখা যায়, পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ফেরিতে ঝুঁকি নিয়ে উঠছে যাত্রীরা।

ঢাকাগামী গার্মেন্টকর্মী পারভীর আক্তার জানান, ঈদের আগের মতোই পথে পথে গাড়ি পাল্টে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঘাটে এসেছি। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট অফিসের ব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ জানান, যাত্রীরা কোনো বাধাই মানে না।

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, শিবচরের বাংলাবাজার ঘাট হয়ে ঢাকাসহ কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীর চাপ অনেকগুণ বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিমুলিয়া থেকে অন্তত ৪০ বার খালি ফেরি বাংলাবাজার ঘাটে আনা হয়েছে। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আমজাদ আলম জানান, ফেরিতে বসার আসন তো দূরের কথা, প্রচণ্ড রোদ ও গরমের মধ্যে গায়ে গা মিশিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে কর্মস্থলমুখী যাত্রীদের ঢল থামেনি। প্রতিটি ফেরিতেই গাদাগাদির চিত্র দেখা গেছে।

বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের এজিএম শফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষের চাপে ফেরিতে গাড়ি ওঠানো যাচ্ছে না। ফরিদপুরের ভাঙ্গার কাশেম, মাদারীপুরের রফিক, শিবচরের ছাত্তারসহ অনেক যাত্রী জানান, বাসগুলো অতিরিক্ত ভাড়া নিয়েছে। আবার আসতে হয়েছে দাঁড়িয়ে।

মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট কামরুল ইসলাম জানান, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে।


বিষয় : রাজধানীতে ফেরা ফেরি সড়ক

মন্তব্য করুন