'বদলা নেব গানেই আমি, কলির সন্ধ্যে এই তো সবে/ পরের বারে দেখবি আমার, বাগদি-ঘরেই জন্ম হবে।' অজয় বাগদি নামে একটি চরিত্রের কথা আছে কবীর সুমনের এই গীতিকবিতায়। সুমন বরাবরের মতো নিজেই গেয়েছেন এই গান এবং গান দিয়ে পরের জন্মে অজয়ের মতো বাগদি ঘরে জন্ম নিতে চেয়েছেন। জন্মান্তরে বিশ্বাস করতে বলছি না কাউকে। আবার বিশ্বাসীকেও বলছি না অবিশ্বাস করতে। তবে এটা নিশ্চিত- পূর্বজন্মে না হলেও আমাদের পূর্বপুরুষের কেউ না কেউ বাগদি ঘর থেকে এসেছে- 'অতীতে যাদের ভয়ে বিভেদের বৈদিক আগুন/ করতোয়া পার হয়ে এক ইঞ্চি এগোতো না আর।'
আমার বাপ-মায়ের বাড়ি এবং নিজের জন্মস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। করতোয়া থেকে বেশ খানিকটা দূরে। নিজের বাড়ির পাশের বাজার ঘেঁষে বাগদিদের বাস ভগবাননগর গ্রামে। এটি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার একটি গ্রাম। সুন্দরবন থেকে খুব দূরে নয়। একদা আমাদের এই এলাকা পর্যন্ত যে বন ছিল- এ নিয়ে সন্দেহ নেই। রয়েছে ঐতিহাসিক প্রমাণ। ঝিনাইদহেরই কালীগঞ্জে আছে সুন্দরবনের ত্রাতা বলে পরিচিত গাজী কালু ও চম্পাবতীর মাজার। বাগদিদের মধ্যে কালু বাগদি বলে পূজনীয় এক মানুষের কথা প্রচলিত, যে মানুষটি রাঢ়বঙ্গে কালু রায় বলে পূজিত হন। মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যের প্রধান তিনটি ধারার একটি ধর্মমঙ্গল কাব্যে কালু বাগদির কথা আছে। ধর্মমঙ্গলের লাউসেন অজয় ঢেকুরের ত্রিষষ্ঠীগড়ের অধিপতি ইছাই ঘোষকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন তার মিত্র মহাযোদ্ধা কালু বাগদির পরাক্রমে। এই কালু বাগদির সঙ্গে সুন্দরবনের গাজী কালুর সম্পর্কসূত্র তৈরির চেষ্টা আমার অনুমানপ্রসূত। তবে বাগদিরা সবখানেই বনের ধারে বসত গড়া জাতি।
আমার এত যে কাছের প্রতিবেশী সেই বাগদিদের খুব বেশি চিনি বলে দাবি করতে পারছি না। তাদের নাম শুনেছি অনেক। কিন্তু ছোটবেলায় আলাদা করে চিনতে পারিনি একজনকেও। শৈলকূপার ভগবাননগরে বাগদিদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় হলেন বীরেন বিশ্বাস। বাগদিদের অনেককেই বিশ্বাস উপাধি লিখতে দেখেছি। তবে সরকারি তালিকায় আদিবাসী মর্যাদা পাওয়ায় হয়তো আবার বাগদি পরিচয়ে পরিচিত হওয়াটা বাড়বে। বীরেন বিশ্বাস স্কুলে আমার কাকার সঙ্গে পড়তেন। নবম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি। কয়েক মাস আগে ওই গ্রামে গেলে বীরেন কাকা আমাদের দেখালেন, জায়গার অভাবে তাদের একটা দল ভূমিহীনদের জন্য আবাসন প্রকল্পে আশ্রয় নিয়েছে। নীলকুঠির দেয়াল দেখালেন তিনি। বললেন, এই জমিগুলো ইংরেজ আমলে তাদের ছিল। এখন মিঞাদের হয়ে গেছে। মিঞাদের বলতে তিনি দখলদার মুসলমানদের বুঝিয়েছেন। বাজারে পৌঁছার জন্য একটা চলার পথও নেই তাদের। ছোটবেলায় যেমন আলাদা করে চিনতে পারতাম না; বড়বেলাতেও যতবার বাগদিদের কোনো পাড়ায় গেছি, মনে হয়েছে, আমাদের মা-মাসিকে দেখছি; চেহারায় আমাদের সঙ্গে তাদের এতটাই মিল! সাজসজ্জাতেও। ছুঁৎমার্গ, ঘরোয়া বিধিনিষেধেও মিল ভীষণ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে তাদের আলাদা করতে পারি না আমি। এমনকি স্বভাবেও মিল আছে খুব। সেই একই রকমের উত্তেজনা, একই অভিমান। সেই এক রকম অভিযোগ প্রবণতা। সরকারের কাছে সাহায্য কামনা করা। না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ। আবার ভীষণ প্রাণবন্ত ভাব।
গত শীতকালের শেষদিকে গিয়েছিলাম পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায়। এই একটি উপজেলার অন্তত ১০টি জাতির মানুষকে আমিই চিনি, যাদের কয়েক প্রজন্ম আগের মানুষ এখানে জঙ্গল সাফ করে জায়গাটাকে বাসযোগ্য করেছিলেন। সবখানেই সেই এক কাহিনি। টাকা-পয়সার অভাব বা প্রভাবশালীদের প্রভাবে জমিগুলো আর তাদের নেই। ঈশ্বরদীতে আমার ভাই সেলিম সরদার জানালেন, প্রথম দিন আমরা মালপাহাড়িয়াদের গ্রামে যাব। কিন্তু ঈশ্বরদীর মূলাডুলি ইউনিয়নের পতিরাজপুর যেতে যেতে আমার সংশয় হচ্ছিল, ওখানে মালপাহাড়িয়ারা আছে কিনা? পৌঁছেই বুঝলাম, কোথাও ভুল হচ্ছে। যেখানে নামলাম সেখানে এক দল গ্রামবাসী বসে কথাবার্তা বলছিলেন। আমরা যেতেই গ্রামের সবাই এসে হাজির। যদিও পরে গান-বাজনার সময়ে অনেক খুঁজেও ঢোলবাদককে পাওয়া গেল না। তিনি গিয়েছিলেন মাঠে কামলা দিতে। পতিরাজপুরে নেমেই বুঝলাম, আমরা একটা বাগদিপাড়ায় চলে এসেছি। এ সেই কলম্বাসের ভারত আবিস্কারের মতো অবস্থা।
পতিরাজপুরে বাগদিপাড়ার আড্ডায় জিজ্ঞাসা করে ফেললাম, সরকারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকাতে আপনাদের নাম রয়েছে। আপনারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করেন। কিন্তু আপনাদের জীবনযাপন, দেব-দেবতা পর্যন্ত বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে মিলে যায়। হিন্দুদের শিব, কালী, মনসা, দুর্গা- সবার পূজাই করেন আপনারা। আমার প্রশ্নের উত্তরে তারা তীর-ধনুক, বল্লম নিয়ে চলে এলেন নিজস্বতা প্রকাশ করতে। আমি মুগ্ধ। সেই সরলতা; সেই প্রকাশমুখিনতা। অথচ ইতিহাস জানা থাকলে তারা বলতেন, এসব দেব-দেবী তো অনার্যদের। বলতেন, কালী সাধকরা শ্যামা মাকে আদর করে বাগদির মেয়ে, কৈবর্তদুহিতা ইত্যাদি বলে ডাকেন। নজরুল লিখেছেন, 'জগৎজুড়ে জাল ফেলেছিস শ্যামা তুই কি জেলের মেয়ে?' বাগদিদের একটা বড় দল যে মৎস্যজীবী, তা তো আমরা জানি। তীর-ধনুক নিয়ে দাঁড়ানোটা নেহায়েত দুর্বল যুক্তি নয়। বাগদিরা যে যোদ্ধা জাতি হিসেবে পরিচিত- সে কথা তো সবার জানা। বাংলার ডাকাত বললেই বাগদিদের নাম আসে সবার আগে। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের 'বাংলার ডাকাত' বইয়ে আছে হারান ডাকাত বলে এক কালী সাধকের গল্প, যে কিনা নরবলি দিতেন। আবার ডাকাতি করে আনা সম্পদ বিলিয়েও দিতেন দরিদ্রের সেবায়।
ঐতরীয় ব্রাহ্মণ তথা প্রাচীন পুরাণগুলোতে ভারতের পূর্বভাগের দুই অবৈদিক জনজাতির উল্লেখ আছে। এই জাতি দুটির নাম মগধ ও বগধ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, বগধ জাতিই বাগদি এবং তাদের বাস ছিল গৌড়বঙ্গে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মগধ বলে কোনো জাতির কথা বলেননি বোধ হয়। তার একটি অভিভাষণে আমি বঙ্গ, বগধ ও চেরো বলে তিনটি জাতির নাম পেয়েছি। এই জাতিগুলোর অজেয় বীরত্বে ভীত ছিল বৈদিক আর্যরা।
কুন্তীঘাট সপ্তগ্রাম অঞ্চলের সহজযানপন্থি লুইপাদের শিষ্য বাগদি জাতির রূপা রাজার সঙ্গে বঙ্গাধীপ হরিবর্মার যুদ্ধকে নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'বেনের মেয়ে' নামে একটি অনবদ্য উপন্যাস আছে। ওই উপন্যাসের একাদশ পরিচ্ছেদের দ্বিতীয়াংশে একটি ছড়া আছে- 'আগডোম, বাগডোম, ঘোড়াডোম সাজে।/ ডাল মৃগল ঘাঘর বাজে,/ বাজতে বাজতে পড়লো সাড়া/ সাড়া গেল বামনপাড়া।' সপ্তগ্রামের বাগদি রাজা, রূপা রাজা যখন হরিবর্মার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন, তখন হুকুম দিলেন- 'সব বাগদী সাজ'। রূপা রাজার ছিল বাগদি ও ডোম সেনা। আমার কাছে বাগদিদের যেমন বাঙালি বলে বিভ্রম হয়, তেমনি ডোমদের মনে হয় বাগদি। এবারও ঈশ্বরদী পতিরাজপুরে গিয়ে আমি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের কবিয়াল নিতাইয়ের কথা ভাবছিলাম, বিশেষ করে সেখানকার বাগদিরা যখন আমাদের দেখাবার জন্য তীর-ধনুক হাতে দাঁড়ালেন তখন মনে পড়ল উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি- 'শুধু দস্তুরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাৎ কবি হইয়া গেল।' পরে আবার মেয়েরা যখন দেখাল ঝুমুর নাচ তখন নিতাইয়ের প্রেমিকা বসন্তের কথা মনে এলো। অবশ্য পরে উপন্যাসটিতে আবার চোখ বুলাতে গিয়ে পেলাম, 'কিন্তু কুখ্যাত অপরাধপ্রবণ ডোমবংশজাত সন্তানের অকস্মাৎ কবিরূপে আত্মপ্রকাশকে ভগবৎ-লীলা বলা যায় কিনা সে বিষয়ে কোনো শাস্ত্রীয় নজির নাই।'
কবিয়াল নিতাই ডোমবংশজাত। আগডোম, বাগডোম, ঘোড়াডোম সাজার ছড়াটাতেও ডোমদের কথা আছে- 'আগডোম' মানে অগ্রবর্তী ডোম সৈন্যদল, 'বাগডোম' মানে বাগ বা পার্শ্বরক্ষী ডোমসেনা এবং 'ঘোড়াডোম' মানে অশ্বারোহী ডোমসেনা। যুদ্ধে ডোমসেনারা রাস্তা পর্যবেক্ষণ করত, রাস্তা বানাত এবং ঘোড়ায় চেপে দেশের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা শুরু করত। তবে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপন্যাস 'বেনের মেয়ে' বলছে, প্রাচীন বঙ্গে যুদ্ধযাত্রার কালে মুখ্য যোদ্ধারা ছিল বাগদি।
বাংলাদেশের মাগুরা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী, দিনাজপুর, রাজশাহী, রাজবাড়ী, ফরিদপুর- এসব এলাকায় বাগদির বসবাস বেশি। চা বাগানে তো অনেক জাতি আছে, সেখানেও বাগদিরা আছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর, হাওড়া, ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, দার্জিলিং, কোচবিহার, সাঁওতাল পরগনা ছাড়াও অনেক জায়গায় তারা বসবাস করছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সব এলাকাতে বাগদিরা থাকলেও, পুবে তাদের তেমন দেখা যায় বলে জানা নেই আমার। বাগদিরা চিরকাল দরিদ্র। তারা ধর্মভীরু। যখন যে এলাকাতেই গেছি, কথাবার্তা বলতে তারা মন্দিরে বসতে দিয়েছেন। অবশ্য কারও বাড়িতেই বসার মতো জায়গা নেই। ঠাসাঠাসি করা ঘর। জমি-জায়গা একজনের একটু থাকলে সেখানে তিনজন ঘর করে বসবাস করছে। শিশুদের সংখ্যা যথারীতি বেশি। তাদের পড়াশোনারও খোঁজখবর নেই। ছোটবেলা থেকেই তারা ঘর, মাঠ আর মাছ ধরার কাজে লেগে যায়। কিন্তু হৃদয়টা তাদের হারান বাগদির মতোই। 'হতে পারে হারান বাগদি ডাকাত, হতে পারে সে অশিক্ষিত, ছোটোলোক হতে পারে, কিন্তু সে অনেক বড় মনের মানুষ।' এই দানশীল ডাকাত হারান বাগদিই বাগদিদের স্বরূপ প্রকাশ করে। অচেনা আমাকে তখনই গাছ থেকে মধু এনে দিলেন এক মায়াময়ী নারী, ছোট্ট একটা কোমল পানীয়ের বোতলে। পতিরাজপুরে আনন্দেই কাটল সময়টা। কী জানি, দারিদ্র্য আর আনন্দ কাছাকাছি বসবাস করে কিনা!


বিষয় : বন-পাহাড়ের দেশে

মন্তব্য করুন