মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের নয়ন দাস আগামী ২ জুন বিদেশ যাবেন। সেদিন ইউএস-বাংলার সন্ধ্যা ৬টার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে কাতারের দোহার উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি। স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-দোহা ফ্লাইটের সাধারণ শ্রেণির ওয়ানওয়ে টিকিটের দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এখন সেই টিকিটের জন্য নয়নের লেগেছে ৫৬ হাজার টাকা। সঙ্গে যোগ হয়েছে কাতার গিয়ে ১০ দিন হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকার খরচ ৩৮ হাজার টাকা।

প্রায় সব প্রবাসীই এ রকম বাড়তি খরচের সংকটে পড়েছেন। করোনা টিকার দুই ডোজ নেওয়া না থাকলে সৌদিতে গিয়ে সাত দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এতে ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টাকা লাগছে। সঙ্গে করোনা পরীক্ষা, লকডাউনে ঢাকা আসা-যাওয়ায় লাগছে বাড়তি খরচ। ছুটিতে এসে আটকেপড়া কর্মীরা বলছেন, দেশে কর্মহীন বসে থেকে সঞ্চিত টাকা শেষ। কোয়ারেন্টাইনের খরচ জোগাড় করাটা 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়েছে। চাকরি রক্ষায় ধারদেনা করে হলেও টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ের সামনে হাজারখানেক কর্মীর ভিড় দেখা যায়। তারা টিকিট ও হোটেলে বুকিংয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। কথা হয় কুমিল্লা সদর দক্ষিণের আবদুল মান্নানের সঙ্গে। গত ৩ নভেম্বর ছুটিতে সৌদির রিয়াদ থেকে দেশে এসেছেন রিটার্ন টিকিট নিয়ে। আজ রোববার রাতে তার ফিরতি ফ্লাইট। কিন্তু শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিনি কোয়ারেন্টাইনের হোটেল বুকিং করতে পারেননি।

সৌদি সরকারের কোয়ারেন্টাইন নিয়ম অনুযায়ী, যাত্রীরা কোথায় থাকবেন, তা নিশ্চিত করবে এয়ারলাইন্স। অনুমোদিত হোটেলগুলোতেই যাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকা থেকে রিয়াদের যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইন বাবদ দিতে হচ্ছে ৬৫ হাজার ৬০০ টাকা এবং দাম্মাম-জেদ্দার যাত্রীদের দিতে হচ্ছে ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা। এ টাকার পুরোটাই যাচ্ছে কর্মীর পকেট থেকে। হোটেল ঠিক করতে না পারায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০ থেকে ২৪ মে'র সৌদিগামী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

২১ বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করেন আবদুল মান্নান। তিনি সমকালকে বলেন, করোনার আগে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় দেশে যেতেন। এবার লেগেছে ৮৫ হাজার টাকা। কোয়ারেন্টাইনের জন্য দিতে হবে ৬৬ হাজার টাকা। করোনার পরীক্ষায় গিয়েছে আড়াই হাজার টাকা। লকডাউনের মধ্যে কুমিল্লা থেকে ভেঙে ভেঙে ঢাকায় এসেছেন দুই হাজার টাকায়। শনিবার রাতে তাকে ঢাকায় থাকতে হবে। এতে আরও হাজারখানেক টাকা যাবে। সব মিলিয়ে এক লাখ ১০ হাজার টাকা বাড়তি লাগছে।

মান্নান জানান, সাড়ে পাঁচ মাস আগে দেশে এসে বাড়ির কাজ ধরেছিলেন। সব সঞ্চয় শেষ। তিনজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোয়ারেন্টাইনের টাকা জোগাড় করেছেন।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ২১ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় কাতার এয়ারওয়েজের ঢাকা-দোহা-রিয়াদ ফ্লাইটে তার কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সৌদির শর্তে রিয়াদের যাত্রা বাতিল করেছে কাতার এয়ারওয়েজ। আগামী ২৬ মে'র ফ্লাইটে তার জায়গা হয়েছে। তবে শনিবার কাতার এয়ারওয়েজের এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, এখনও তার কোয়ারেন্টাইনে থাকার হোটেল বুকিং হয়নি। ৭০ হাজার টাকার মতো লাগতে পারে।

দেলোয়ার বলেন, সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার সময় কর্মস্থলে ফেরার তারিখ (এক্সিট রি-এন্ট্রি) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ছুটির এ সময়সীমার মধ্যে ফিরতে হবে। ছুটি বাড়াতে হলে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে। তার আকামার (কাজের অনুমতি) মেয়াদ রয়েছে। তবে যাদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে, তারা বিপাকে পড়বেন। তাই ধারদেনা বা জমি বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করছেন প্রবাসী কর্মীরা।

বেশি সংকটে পড়েছেন নতুন কর্মীরা। পুরোনো কর্মীরা দেশে এসেছেন রিটার্ন টিকিট নিয়ে। তাদের টিকিটের জন্য নতুন করে টাকা দিতে হচ্ছে না। কিন্তু নতুন কর্মীদের ওয়ানওয়ে টিকিটে লাখ টাকা পর্যন্ত লাগছে। এমন একজন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের মো. রুবেল। তিনি সৌদিয়ার ২৩ মে রাতের ফ্লাইটের টিকিট পেয়েছেন। ঢাকা-রিয়াদের ওয়ানওয়ে টিকিটের জন্য লেগেছে ৮৫ হাজার টাকা। কোয়ারেন্টাইনের জন্য লাগছে ৬৬ হাজার। প্রায় সোয়া লাখ টাকার মতো বাড়তি লাগছে। রুবেল চার দিন ধরে ঢাকায় আছেন ফ্লাইট ও কোয়ারেন্টাইনের হোটেল বুকিং নিশ্চিত করতে। তিনি বলেন, সাড়ে তিন লাখ টাকায় তার যাওয়ার কথা ছিল। এখন তা পাঁচ লাখ ছুঁই ছুঁই।

কক্সবাজারের পেকুয়ার রেজাউল করিমেরও ফ্লাইট ২৩ মে রাতে। তার ছেলে ইরফান উদ্দিন সমকালকে জানান, এখনও হোটেল বুকিং পাননি সৌদিয়ার কাছ থেকে। তার পরিচিত অনেকেই অনলাইনে হোটেল বুকিং দিয়েছিলেন। সৌদি নিয়ম অনুযায়ী, নিজের ভাড়া করা হোটেলে থাকা যাবে না। তাই বুকিং বাবদ দেওয়া টাকা মার গেছে।

অনেক প্রবাসীর অভিযোগ, তারা দু'দিন-তিন দিন ধরে লাইনে থেকেও হোটেল বুকিং পাচ্ছেন না। কিন্তু অনেকে লাইন ভেঙে বাড়তি টাকায় টিকিট ও বুকিং পাচ্ছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে সৌদিয়ার কার্যালয়ে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মী বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে লাইন ধরে কর্মীদের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। তারা একটি ই-মেইল ঠিকানা দেন সৌদি এয়ারলাইন্সের কান্ট্রি ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সৌদিয়া তাদের যাত্রীদের তাদের পরিচালিত হোটেল ভাড়ার সুবিধা 'হলিডেজ বাই সৌদিয়া'র মাধ্যমে কোয়ারেন্টাইন হোটেল ভাড়া করছে। যাত্রীরা সৌদির নতুন নিয়ম অনুযায়ী অন্য কোনো উপায়ে ভাড়া করা হোটেলে থাকতে পারবেন না।

যেসব প্রবাসী ফ্লাই দুবাই, এমিরেটস, এয়ার অ্যারাবিয়ার যাত্রী ছিলেন, তারাও বিপাকে পড়েছেন। আরব আমিরাত বাংলাদেশ থেকে যাত্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ কারণে দুবাই হয়ে চলা এ ফ্লাইটের যাত্রীরা সৌদি যেতে পারছেন না। আরব আমিরাত প্রবাসীরাও কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।

বাড়তি বিমান ভাড়া ও কোয়ারেন্টাইনেই প্রবাসীদের বাড়তি খরচের শেষ নয়। সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে যাওয়ার পর নিজ খরচে প্রথম ও ষষ্ঠ দিন দুই দফা করোনা পরীক্ষা করা হবে। এতে প্রায় ছয় হাজার টাকা লাগবে। থাকতে হবে স্বাস্থ্যবীমা।

তবে যারা ফাইজার-বায়োএনটেক, অক্সফোর্ড, মডার্না অথবা জনসন অ্যান্ড জনসনের দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ টিকার মিথ্যা সনদ দিলে আজীবনের জন্য বহিস্কার করবে সৌদি। করোনা ছড়ালে পাঁচ বছরের জেল ও পাঁচ লাখ রিয়াল জরিমানার আইন করেছে সৌদি সরকার।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থার ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক শামসুল আলম বলেন, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশ কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করে যেসব নিয়ম চালু করেছে, তা মেনেই কর্মীদের যেতে হবে।

মন্তব্য করুন