গরু ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। দুধ উৎপাদনের বৈশ্বিক সূচকেও কয়েক বছর ধরে এ দেশের ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টানা চার বছর ধরে ছাগলের দুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে মোট দুধ উৎপাদনে দেশের অবস্থান বিশ্বে ২৩তম। গরুর দুধ উৎপাদন গত ১০ বছরে বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।

তবে দুধ উৎপাদন বাড়লেও এর বহুমুখী ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ছে না। এজন্য দুধ আমদানিকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে করোনা মহামারিসহ নানা দুর্যোগের কারণে দুধের সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক না থাকায়ও ক্ষতি হচ্ছে খামারিদের।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হচ্ছে বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। এ উপলক্ষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সারাদেশে আজ থেকে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে।

খামারিরা বলছেন, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, মানসম্পন্ন দুধ সরবরাহ না করা, ভেটেরিনারি চিকিৎসক সংকট, দুধ প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করতে না পারা, ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং বিদ্যুতের মূল্য কৃষিভিত্তিক শিল্পের চেয়ে অনেক বেশি হওয়াও উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।

অবশ্য খামারিদের ক্ষতি পোষাতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে বিক্রির ব্যবস্থা করছে মন্ত্রণালয়। দুগ্ধ খামারিদের উৎপাদনে উৎসাহ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এ অবস্থায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দুধের মূল উৎস গরু। ৯০ শতাংশ দুধ আসে গরু থেকে, আট শতাংশ আসে ছাগল থেকে এবং দুই শতাংশ আসে মহিষ থেকে। ১৯৮৯-৯০ থেকে ২০০১-০২ অর্থবছর পর্যন্ত দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির হার ২.৪ শতাংশ, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির হার ১৬.৪৪ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন ছিল ২৩.৭০ লাখ টন, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে উন্নীত হয়েছে ১০৬.৮০ লাখ টনে।

বর্তমানে দেশে মোট দুগ্ধ উৎপাদনকারী গরু ৮.৬ মিলিয়ন, যার মধ্যে দেশীয় ৪.৫৬ মিলিয়ন (৫৩ শতাংশ) এবং সংকর জাতের ৪.০৪ মিলিয়ন (৪৭ শতাংশ)। বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার দুধের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৭৫ মিলিলিটার। দেশে বছরে ১৫২ লাখ টন দুধের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১০৬.৮ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫২.০২ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দুধ উৎপাদন হয় ১০৬.৮০ লাখ টন। এ চাহিদা অনুযায়ী সরকার আরও ৪০.২২ লাখ টন দুধ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে এক কেজি ভালোমানের গুঁড়া দুধের দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা। অথচ দেশে আমদানি করা গুঁড়া দুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র গড়ে ৫০০-৬০০ টাকা কেজি দরে। নিম্নমানের কারণেই দাম এত কম হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে দেশের তরল দুধের বাজার নষ্ট হচ্ছে। ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না খামারিরাও। অথচ গো-খাদ্যসহ অন্যান্য ব্যয় অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় দুগ্ধশিল্পের সুরক্ষায় গুঁড়া দুধের শুল্ক্ক বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

দুগ্ধ খাত-সংশ্নিষ্টদের হিসাবে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়, যা মোট দুধের চাহিদার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা মতে, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ দুধ উৎপাদন হয়, তার মাত্র সাত শতাংশ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বাজারে আসে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) মহাসচিব শাহ এমরান বলেন, ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত দুধ আমদানিই দেশের দুগ্ধশিল্পের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। এই দুধের ওপর আমদানি শুল্ক্ক বাড়ানো হয়নি। আগামী বাজেটে দুধের ওপর আমদানি শুল্ক্ক বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করার এবং অ্যান্টি-ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করে দেশীয় দুগ্ধশিল্প রক্ষার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, ভারতে খামারিরা সরকারি ভর্তুকি পায়। বাংলাদেশে খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ, বিপণন ও ভর্তুকি দিলে এ শিল্পে বিপ্লব ঘটবে।

মিল্ক্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমর চান বণিক বলেন, উৎপাদন বাড়াতে আমরা আরও বেশি খামারি তৈরির চেষ্টা করছি। কারখানায়ও নতুন নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হচ্ছে। দুধ প্রক্রিয়াজাতের জন্য ইউএইচটি প্রযুক্তি আনার পরিকল্পনা করছি।

দুধের বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩০০টি ভিলেজ মিল্ক্ক কালেকশন সেন্টার (ভিএমসিসি) স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক পার্থ প্রদীপ সরকার। দুগ্ধশিল্প উন্নয়নে সরকার চার হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, করোনাকালে চার লাখ ২০ হাজার খামারিকে ৪৯০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পর্যন্ত তিন লাখ খামারির হাতে ৩৩২ কোটি টাকা পৌঁছে গেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, ২০৩১ সালে ২০ মিলিয়ন টন এবং ২০৪১ সালে ৩০ মিলিয়ন টন দুধ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছি। আশা করি, ৮ থেকে ৯ বছরের মধ্যে দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উদ্বৃত্ত রাখতে পারব। তিনি বলেন, দুধের উৎপাদন বাড়াতে গুঁড়া দুধের আমদানি নিরুৎসাহিত করছি। বিভিন্ন প্রকার প্রণোদনা ও স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে সরকার। দুগ্ধশিল্পকে বিকশিত করতে যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে কর অব্যাহতি সুবিধাসহ নানা সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। রপ্তানির জন্য দেশে আন্তর্জাতিক মানের মাননিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দুধ থেকে ২০-৩০ প্রকার দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করা গেলে চাহিদা ও মান বাড়বে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।

কর্মসূচি :দিবসটি উপলক্ষে আজকের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সরকারি শিশু পরিবার বা এতিমখানায় দুধ সরবরাহ ও পান করানো, শিশুদের মধ্যে দুধের পুষ্টিগুণ বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতা, র‌্যালি, বিনামূল্যে পশু চিকিৎসাসেবা, সেমিনার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম। আজ দুপুর ১২টায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুগ্ধ দিবস ও দুগ্ধ সপ্তাহ উদ্বোধন এবং সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতা দেবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম।

বিষয় : দুধ উৎপাদন

মন্তব্য করুন