নারীপাচারে জড়িত একটি চক্রের প্রধান আশরাফুল মন্ডল ওরফে বস রাফির নেটওয়ার্কে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় ৫০ সদস্য। তাদের কেউ নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের ফাঁদে ফেলে, কেউ গোপন আস্তানায় রেখে মাদক সেবনসহ অসামাজিক কার্যকলাপে বাধ্য করে, কেউ দালাল বা লাইনম্যান হিসেবে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়।

এই চক্রটি গত পাঁচ বছরে পাঁচ শতাধিক নারীকে পাচার করেছে। এর মধ্যে ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবুর মাধ্যমেই পাচার হয়েছে অর্ধশত নারী। চক্রের হোতা আশরাফুল ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব।

এছাড়া নারী পাচারের আরও কয়েকটি চক্রকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করছে পুলিশ-র‌্যাব। তারাও কয়েকশ' নারীকে ভারত, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। বিদেশে অবস্থানরত আরও কয়েক আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে পাশবিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সূত্র ধরে তদন্তে নেমে এই চক্রটিকে শনাক্ত করে র‌্যাব। এর আগে ওই নির্যাতনে জড়িত হৃদয় বাবু ও ভুক্তভোগী তরুণীর পরিচয় জানা যায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণীর বাবা বাদী হয়ে গত ২৭ মে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। টিকটক হৃদয়, মোহাম্মদ বাবা শেখ, সাগর ও হাকিলসহ ছয়জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ। তাদের ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

আশরাফুলসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সোমবার থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-৩ এর অভিযানে ঝিনাইদহ সদর, যশোরের অভয়নগর ও বেনাপোল থেকে নারী পাচার চক্রের মূলহোতা আশরাফুল ইসলাম, তার অন্যতম সহযোগী সাহিদা বেগম ওরফে ম্যাডাম সাহিদা, ইসমাইল সরদার ও আব্দুর রহমান শেখ ওরফে আরমান শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পাচারে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এই চক্রটি প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ও প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন বয়সী নারীদের প্রতিবেশী দেশে পাচার করত। ভারতে গ্রেপ্তার টিকটক হৃদয় ছিল আশরাফুলের অন্যতম নারী সরবরাহকারী বা এজেন্ট। এ ছাড়াও তার বেশ কয়েকজন এজেন্ট রয়েছে। হৃদয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে তরুণীদের টিকটক মডেল বানানোসহ অন্যান্য প্রলোভন দেখিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবনে আকৃষ্ট ও অভ্যস্ত করত। পরে তাদের ভারত বা উন্নত কোনো দেশের মার্কেট, সুপারশপ ও বিউটি পার্লারসহ ভালো বেতনের বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আশরাফুলের মাধ্যমে পাচার করা হত। মূলত যৌনকর্মী হিসেবে নিয়োজিত করার উদ্দেশে তাদের ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে পাচার করা হত। তাদের মাদকদ্রব্য সেবন করিয়ে জোরপূর্বক অশালীন ভিডিও ধারণ করে রাখত চক্রের সদস্যরা। পরে ওই ভিডিও দেখিয়ে তাদের অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হত।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই নারীদের সীমান্ত পার করানো হত। তারা কয়েকটি ধাপে পাচারের কাজটি করত। প্রথমে নারীদের বিভিন্ন স্থান থেকে সীমান্তবর্তী জেলা যশোর, সাতক্ষীরা বা ঝিনাইদহে নিয়ে যেত। সেখানে সীমান্তের কাছাকাছি বিভিন্ন সেফহাউজে (গোপন আস্তানা) রাখা হত তাদের। এরপর সুবিধাজনক সময়ে লাইনম্যানের মাধ্যমে অরক্ষিত এলাকা দিয়ে তাদের সীমান্ত পার করানো হত। পরের ধাপে চক্রের ভারতীয় এজেন্টরা তাদের গ্রহণ করে ওপারের কোনো সেফহাউজে রাখত। সুবিধাজনক সময়ে তাদের পাঠানো হত কলকাতায়। সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হত বেঙ্গালুরু। এরপর আশরাফুল তাদের নিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন সেফহাউজে রাখত। সেখানে নানাভাবে জিম্মি করে, মাদকে অভ্যস্ত করিয়ে এবং অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হত।

এ ছাড়া পথিমধ্যের সেফহাউজগুলোতেও তাদের জোর করে মাদক সেবন এবং অসামাজিক কার্যকলাপে বাধ্য করত চক্রের সদস্যরা। সেফ হাউজগুলো থেকে তাদের ১০/১৫ দিনের জন্য বিভিন্ন খদ্দেরের কাছে পাঠানো হত। এক্ষেত্রে তাদের নিয়ে যাওয়া-আসা ও খদ্দেরের নির্ধারিত স্থানে অবস্থানের সময়ে পালানো ঠেকাতে নেওয়া হত বিশেষ নিরাপত্তা। আশরাফুল একসময় এ ধরনের নারী আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল। সে তামিল ভাষা রপ্ত করেছিল। ভাষাগত দক্ষতার সুবিধা কাজে লাগিয়ে সে একপর্যায়ে 'রিং লিডার' হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী দেশের এজেন্ট তাকে খদ্দের প্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা কমিশন দিত।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, আশরাফুল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। আট বছর ধরে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে তার যাতায়াত আছে। সেখানে সে কখনও ট্যাক্সিচালক, কখনও হোটেল রিসোর্টের কর্মচারী ছিল। আবার কখনও কাপড়ের ব্যবসা করেছে। এরপর গত পাঁচ বছর ধরে সে নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত। দুই বছর আগে টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। হৃদয় তাকে পাচারের জন্য অর্ধশতাধিক নারী সংগ্রহ করে দিয়েছে।

সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওর ভুক্তভোগী তরুণীকে গত বছরের অক্টোবরে পাচার করা হয়। তাকে বেঙ্গালুরুতে সবুজের সেফহাউসে রাখে আশরাফুল। সেখানেই ভিডিওটি ধারণ করা হয় বলে জানা যায়। বেঙ্গালুরুতে আশরাফুলের বেশ কয়েকটি সেফহাউস রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলাতেও তার সেফহাউস রয়েছে। এরমধ্যে ম্যাডাম সাহিদার সেফহাউসটি অন্যতম। ভারতে নির্যাতনের শিকার তরুণীকে পাচারের আগে ওই সেফহাউসেই রাখা হয়েছিল।

র‌্যাব জানায়, 'ম্যাডাম সাহিদা' একাধিক বিয়ে করেছে। সে এবং তার দুই মেয়ে সোনিয়া ও তানিয়া পাচার চক্রে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তার দুই মেয়েই অবস্থান করছে বেঙ্গালুরুতে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তানিয়াকে নির্যাতনকারীদের সহযোগী হিসেবে দেখা গেছে। সাহিদার সেফহাউসে নারী সংক্রান্ত নানারকম অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হত। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সে এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত। গ্রেপ্তারকৃত ইসমাইল ও আরমান ছিল আশরাফুলের বিশেষ সহযোগী। তারা পাচার কার্যক্রমের তদারকি করে আসছিল।

র‌্যাব জানায়, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যে তরুণীকে নির্যাতিত হতে দেখা যায়, তিনি পাচারের শিকার দু'জন বাংলাদেশি নারীকে দেশে পালিয়ে আসতে সহায়তা করেছিলেন। এ কারণেই তাকে অত্যাচার করা হয়। তাকে বলা হয়, তিনি পালানোর চেষ্টা করলে ওই ভিডিওটি তার স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারির পরও কীভাবে নারী পাচার করে আসছিল চক্রের সদস্যরা? সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের উত্তরে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, সীমান্তে সংশ্নিষ্টদের দায়িত্বে পালাবদলের মধ্যবর্তী সময় বা ফাঁকা স্থান দেখে কাঁটাতার সরিয়ে তারা নারীদের পার করত। সীমান্তে তাদের ছয়-সাতজন দালাল বা লাইনম্যান কাজ করে, তারা পারাপারের দায়িত্ব পালন করে।

আরেক প্রশ্নে তিনি জানান, একজন নারীকে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হত। পাচারের শিকার নারীদের মধ্যে মধ্যবিত্তদের বিলাসী জীবনযাপন, দুবাই বা বড় শহরে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়। ভিডিওকলে চক্রের একজন টার্গেট নারীর সঙ্গে কথা বলে জানাত, সে বিদেশে গিয়ে খুব ভালো আছে ইত্যাদি। সেই সঙ্গে টিকটক মডেল বানানোর ফাঁদও রয়েছে। আর নিম্নবিত্তদের ভারতসহ বিভিন্ন স্থানে বিউটি পার্লার বা শপিংমলে চাকরির কথা বলা হত।

এদিকে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বেঙ্গালুরু থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন এমন আরেক তরুণী হাতিরঝিল থানায় অভিযোগ দিতে প্রস্তুত। আর র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাত করবে পুলিশ। তবে পুরনো নাকি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে- এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

মন্তব্য করুন