কড়া নামে বাংলাদেশে একটা জাতির মাত্র আঠারোটা পরিবার আছে- সে কথা প্রথম জানতে পারি সাত-আট বছর আগে, আমার বন্ধুর লেখায়। ওই লেখাতেই ছিল জি এ গ্রিয়ারসনের 'লিঙ্গুয়েস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া'য় কডাদের ভাষার কথা। কিন্তু ঝিনাইকুড়ি যাওয়ার সময় আমি ভাবলাম, গ্রিয়ারসনের সার্ভেতে কড়াদের কথা আছে। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম, কড়াদের নয়- ১৯০০ সালের শুরুতে গ্রিয়ারসনের গবেষণায় কডাদের ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। আহমেদ শামীম তার পিএইচডি গবেষণা করেছেন কডাদের ভাষা নিয়ে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে। আমি কড়া আর কডাকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। বাংলাদেশের কডা আদিবাসীরা আছে রাজশাহীর পুঠিয়া, তানোর ও মোহনগঞ্জ উপজেলায়।
কডাদের গাঁয়ে যাইনি কখনও। গিয়েছিলাম কড়াদের গ্রামে।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার হালজায় মৌজার ঝিনাইকুড়িতে। এখন ঝিনাইকুড়িতে কড়া পরিবার আছে ২৪টি। কড়াদের আরও দুটি পরিবার আছে সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গার খাড়িপাড়ায়। বিরলের বৈরাগীপাড়ায় চার বছর আগেও একজন ছিলেন। তিনি আর বেঁচে নেই। তার ছেলেমেয়েরাও দেশ ছেড়েছে। এই ২৬টি পরিবার না থাকলে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাবে একটি জাতি। সংখ্যায় কম, তাই প্রতিরোধের ক্ষমতা নেই বলে তাদের তাড়িয়ে দিয়ে জমিগুলো নেওয়ার চেষ্টা করা হয় যখন-তখন। তবে এখন এই ২৬ পরিবারকে উচ্ছেদ করা সহজ নাও হতে পারে। তাদের বুকে জ্বলছে আত্মবিশ্বাসের দৃঢ় আগুন। দিনাজপুর থেকে রূপম ভাই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ঝিনাইকুড়ি গ্রামে। মুস্তাফিজুর রহমান রূপম একজন উন্নয়নকর্মী। প্রাণবন্ত এই ভদ্রলোকেরও কিছু পরিকল্পনা আছে কড়াদের শিক্ষা আর স্বাস্থ্য নিয়ে সহযোগিতা দেওয়ার।
ঝিনাইকুড়ি গ্রামটি একেবারেই সীমান্তলগ্ন একটি এলাকা। একটু কোনাকুনি এক-দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই ভারতীয় সীমান্ত। একসময় শুধু দিনাজপুর নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জেও কড়াদের কয়েকটি গ্রাম ছিল। নানা কারণে তারা পাড়ি জমিয়েছে ভারতে। ভারতের ঝাড়খন্ডের দুমকা, গোড্ডা, পাকুর, শাহীবগঞ্জ, হাজারীবাগ প্রভৃতি অঞ্চলে এখনও কড়াদের বেশ কিছু গ্রাম আছে।
কিন্তু বাংলাদেশ ছেড়ে কড়ারা চলে গেল কেন? আর এমনভাবে গেল যে প্রায় সবাই নেই হয়ে গেল। লাপোলের দাদির আমলেও ওসব গ্রাম ছিল বনের ভেতর। বনভূমি ছিল গ্রামের ভেতর। বলছিলাম ঝিনাইকুড়ি গ্রামের লাপোল কড়ার কথা। ঝিনাইকুড়িতে আর বন নেই। পাড়ার এক মাথা দিয়ে তাকালে অন্য মাথা দেখা যায়। ধুলোয় ভর্তি রাস্তাগুলো। লাপোল আর শিকারে যায় না এখন। লাপোলের নিজের ভাষায়, 'আমাদের বাড়ির পাশে দুটি মাঠ আছে। মাঠগুলো একসময় জঙ্গল ছিল। ওই জঙ্গল দুটির গল্প আমি শুনেছি দাদির কাছে। আমি আমার দাদুকে দেখিনি। দাদু মারা যান যখন, তখন আমার জন্মই হয়নি। দাদিকে পেয়েছি। ছোটবেলায় আমি প্রায়ই দাদির কাছে বসে গল্প শুনতাম। দাদি বলতেন, আমাদের বাড়িটা ছিল ঝিনাইকুড়ির হালজায় গ্রামের মাঝবরাবর।'
শুধু কড়ারা নয়, অন্যান্য আদিবাসীর অনেকেই শিকার করত তখন। কেন তারা চলে গেল আর কবেই বা গেল? এসব প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নও। ব্রিটিশরা সব অঞ্চলকে আবাদযোগ্য করতে চেয়েছিল। ভারতবর্ষের নানা অঞ্চলের নিম্নবর্গের পরিশ্রমী মানুষকে তারা বাংলায় নিয়ে এসেছিল। বাংলা ছিল জল আর জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলও তাই ধীরে ধীরে বসবাসযোগ্য হলো। পাকিস্তান শাসনে এ অঞ্চলের সব মানুষ নিপীড়িত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ভয়ংকর পরিস্থিতিতে বাঙালি, আদিবাসী- সবাই বিপদগ্রস্ত ছিল, সবাই যুদ্ধ করেছে, সব ধরনের মানুষ শরণার্থী হয়েছে। তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে কী ঘটল? এখানে গড় জাতীয় আয় বাড়তেই থাকল, যদিও তা প্রচলিত সংজ্ঞায় উন্নত দেশের তুলনায় খুব নগণ্য। কিন্তু জাতীয় আয় বাড়ার ৫০ বছরে কী হলো? অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলাম বলছেন, 'উন্নয়ন হয়েছে গণমুখী নয়, ব্যক্তিমুখী; প্রকৃতিবান্ধব নয়, প্রকৃতিবিরুদ্ধ।' দেখা যাক নজরুল ইসলামের কথা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে কিনা। অর্থনীতির ছাত্রমাত্রই জানেন, ধনী-গরিবের মধ্যকার আয়ের পার্থক্য বেড়ে গেছে খুব বেশি। একসময়কার নদীমাতৃক দেশে নদী শুকিয়ে গেছে। বাঙালির জীবনে এখন ভরসা কেবল চাষের মাছ। ৩০০ জাতের ধান নেই। বাজারে প্রধানত দুই জাতের চাল পাওয়া যায়। কৃষকের গোয়ালে গরু নেই। জমির মালিক মূলত লুণ্ঠনকারীরা। বনভূমি নামেই ১৭ শতাংশ। বনে গেলে দেখবেন কেবল পরিবেশবিধ্বংসী আকাশমণি- দক্ষিণ থেকে উত্তরে, পুবে এবং পশ্চিমে সর্বত্র। সুন্দরবনের বাইরে গাছ আছে, ভেতরে নেই বলে জেনেছি। কোথাও বন নেই, প্রাকৃতিক বন নষ্ট করে বানানো হয়েছে ইকোপার্ক। যেখানে গিয়ে কফিল আহমেদ লিখেছিলেন, 'পাতাটাতা নেই বনে, হনুমান মরে জ্বরে।' তো এই যখন অবস্থা, তখন লাপোলরা তো আরও প্রান্তিক। এই দেশে দরিদ্র মুসলিম, বাঙালিরাও যেখানে মূলত সংখ্যা, যে দেশে নদীমাতাকে নিঃশেষ করা গেছে, সেই দেশে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলা তো দারুণ বিলাসিতা! তবুও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনির মতো অনেক দেশ আদিবাসীর জীবন বাঁচাতে ভীষণ তৎপর। কারণ, আদিবাসীরা নাকি সবচেয়ে ভালো জানে বনের যত্ন। এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্টের বিশেষজ্ঞরা বন বাঁচানোর উপায় বলতে পারছেন না। তারা কি আর গাছের স্বভাব, জলের স্বভাব জানেন? সেসব জানে কেবল বনবাসী মানুষ। বন না বাঁচলে শ্বাস নেবে কেমন করে মানুষ? কেবল ইটের বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে তো প্রাণ বাঁচবে না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই আজকের মানুষের শরীরে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়েছে, সেইসঙ্গে লোকায়ত চিকিৎসা পদ্ধতি হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫০ লাখ লোক মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে। কড়াদের কাছে অবশ্য চিকিৎসা রীতিমতন বিলাসিতা। নিত্যদিনের ক্ষুধার অন্ন সংস্থান করাই এখানে কঠিন লড়াইয়ের বিষয়। শুনেছি, লাপোলের মা প্রায়ই বাড়ির পাশের ছোট নালায় ব্রিজের নিচে মাছ ধরতে যান। মাছ না পেলে গুনজুর কুড়িয়ে আনেন। ছোট শামুককে কড়াদের ভাষায় গুনজুর বলে।
কড়া অর্থ মাটি খোঁড়া। এই আদিবাসীদের এমন নামকরণের কারণ হলো, কোনো একসময় দিঘি খননের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা, কড়ারা নিজেরাই এমনটা বলে থাকে। এখন তাদের প্রধান পেশা রাজমিস্ত্রির কাজ করা। ইংরেজ আমলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বসেছে রেললাইন। পাহাড় কেটে, মাটি খুঁড়ে সেই রেললাইন বসানোর কাজটা মূলত এই আদিবাসীরাই করেছে। রেললাইনের কাজের সূত্র ধরে ভারতের ঝাড়খন্ড থেকে এদের আগমন ঘটেছিল দিনাজপুর অঞ্চলে। কড়া আদিবাসীদের গ্রামগুলো পরিচালিত হয় তিন সদস্যের গ্রাম পরিষদের মাধ্যমে। গ্রামপ্রধানকে তারা বলে মাহাতো। ঝিনাইকুড়ির মাহাতো জগেন কড়া। তবে গ্রামটি আসলে পরিচালিত হয় কৃষ্ণ কড়ার নেতৃত্বে। লাপোল কড়া ইন্টারমিডিয়েট পাস করার আগ পর্যন্ত কড়াদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এই কৃষ্ণ। তাকে নিয়ে কিছুদিন আগে লাপোলের একটা পোস্ট পড়েছিলাম ফেসবুকে। ভূমিদস্যুদের সঙ্গে লড়াই করে গ্রামটা রক্ষা করেছেন কৃষ্ণ। স্কুলের গি পেরোতে পারেননি বলে আক্ষেপ আছে হয়তো মনে। তবে তার হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে লাপোলরা। কৃষ্ণ সম্পর্কে লাপোলের মামা। লাপোলের ভাষায়, 'আপন মামা নন। তবে নিজের মামা থেকেও বড়।'
ঝিনাইকুড় যাব- এ খবর লাপোলের মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। জানার পর গ্রামবাসী যে আয়োজন করল, তা আমাকে বিস্মিত করেছে। পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েগুলো হলুদ-সাদা-কমলায় মেশানো শাড়ি পরে অপেক্ষা করেছিল আমাদের নাচ দেখাবে বলে। অতিথিদের জন্য সুন্দর করে টানানো হয়েছিল শামিয়ানা। মাটির ঘরগুলোতে রঙিন নকশা সৌন্দর্যবোধকে প্রকাশ করছিল। রোদ, কমলা শাড়ি আর হৃদয়ের ঔজ্জ্বল্য আমাদের আহ্বান জানাচ্ছিল। গ্রামের সবার মুখেই একটা মিষ্টি আলো লেগে ছিল, যেন কত দিনের আলাপ তাদের সঙ্গে। নাচ, গান, পান শেষে কিছুটা হেঁটে একটা পুকুরপাড়ে বসে গল্প শুরু করলাম আমরা। কিছু কাছে, কিছু দূরে বসে একটা যেন মিলন উৎসবের মতো ছিল। ছোট ছোট আসরে গল্প চলছে, আবার সব মিলে একটাই উৎসব। দূরের মাঠে সূর্য ততক্ষণে অস্তরাগের আভা ছড়িয়েছে। মনে হচ্ছিল বাঙালি আধিপত্যের এই দেশে কড়াদের মতো কম সংখ্যার একটা জাতি যেন ওই রকম আভা হয়ে হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে আছে। আশপাশের কতগুলো গ্রাম ব্রিটিশ আমলের রেকর্ডে কড়াদের ছিল, সেসব খোঁজখবর করার কথা হচ্ছিল। অথবা যদি পড়াশোনাটা ভালো করে আবার কোনোভাবে নিজেদের ভাগ্যবদল করা যায়, তাও ভাবছিল উঠতি বয়সীরা। আমার কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কড়াদের কয়টা ঘরের মানুষ আগের চেয়েও বেশি আশাবাদী। তবে আমি ভাবছিলাম চলতি বেকারত্ব নিয়ে, ভাবছিলাম সারা পৃথিবীটাই তো অনেক গরিব।
পাদটীকা :২০১৯ সালের ২৩ মার্চ এক গেজেটে বাংলাদেশ সরকার 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নাম' বলে আদিবাসীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তার ২৭ নম্বরে কড়াদের নাম রয়েছে। নেই কডাদের নাম। অথচ শতবর্ষ আগে জি এ গ্রিয়ারসন তার 'লিঙ্গুয়েস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া'য় উল্লেখ করে গেছেন কডাদের কথা। মুন্ডা ভাষা পরিবারের একটি ভাষা এটি, ভাষাভাষীদের জাতিপরিচয় কডা এবং ভাষার নামও কডা।

বিষয় : বন-পাহাড়ের দেশে

মন্তব্য করুন