ইউটিউব ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গি-মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এসব মোকাবিলা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার 'সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঙ্গিদের জিহাদের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ: সরকারের করণীয়' শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন। 

'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি' আয়োজিত ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার। নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে ধারণাপত্র পাঠ করেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মারুফ রসুল।

আলোচক হিসেবে ছিলেন কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী 'জাগরণ'-এর যুগ্ম সম্পাদক সুইডেন প্রবাসী সাব্বির খান, সুইজারল্যান্ড প্রবাসী গণজাগরণ মঞ্চ-এর সংগঠক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল, শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীন, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর সেক্যুলার হিউম্যানিজম, তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক শাকিল রেজা ইফতি এবং নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।

সভাপতির বক্তৃতায় শাহরিয়ার কবির বলেন, 'বাংলাদেশে সরকার মাঠপর্যায়ে জঙ্গীদমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রদর্শন করলেও জঙ্গিদের সাইবার জিহাদ মোকাবিলায় তেমন কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। ইউটিউব ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কাজে সরকারের উচিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণ সমাজের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। আমাদের তরুণরা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে পারলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধেও তা পারবে।'

তিনি আরও বলেন, 'জনগণের, বিশেষভাবে তরুণ সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সাইবার যুদ্ধে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির জিহাদ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। সাইবার যুদ্ধ সার্বক্ষণিক। এই যুদ্ধ কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেশন মানে না। যেভাবে সর্বত্র জিহাদের ভাইরাস ছড়ানো হচ্ছে তার ফলে ইরাক ও সিরিয়ার মতো ভবিষ্যতে বিশ্বে বহু গৃহযুদ্ধ ও গণহত্যা সংঘটিত হতে পারে।'

আলোচ্য বিষয়ে প্রধান অতিথি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, 'ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। বহু দেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নিয়ে আইন তৈরি করেছে। আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত ফেসবুক, ইউটিউবে বিভিন্ন মৌলবাদী পোস্ট সম্পর্কে রিপোর্ট করলে তারা (কর্তৃপক্ষ) বলে- আমরা আমাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলি- এটি তো গণতান্ত্রিক অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার। এরপরও ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য বিষয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে।'

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার জিহাদ প্রতিরোধ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান এই যুদ্ধ রাজনৈতিক যুদ্ধ। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে শুধু রিপোর্ট করে এই সাইবার জিহাদ প্রতিহত করা সম্ভব নয়। আমরা তাদের প্রতিহত করার মতো সুসংগঠিত নই। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এখনও আমরা ডিজিটাল হতে পারিনি। এজন্য সোশ্যাল মিডিয়াগুলো মনিটরিংয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দক্ষ রাজনৈতিক কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। অনলাইনে সম্মিলিতভাবে এই রাজনৈতিক যুদ্ধ করতে না পারলে এক সময় বাংলাদেশ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে চলে যাবে।'

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, 'সাইবার জগতের মাধ্যমেই বর্তমানে দেশবিরোধী, জঙ্গিবাদী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমাকে যে ছেলেটি আক্রমণ করেছিল, তার সঙ্গে আমি পরবর্তিতে দেখা করেছিলাম। সে আমাকে বলেছিল যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই আমার ওপর আক্রমণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। তাই জঙ্গি-মৌলবাদীদের সাইবার জিহাদ প্রতিরোধে সরকারকে অনুরোধ করব- আপনারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক তরুণ প্রজন্মের সাইবার যোদ্ধাদের ডাকুন। যারা সাইবার জগতে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সুনির্দিষ্ট মতামতের ভিত্তিতে সাইবার জিহাদ মোকাবিলায় কাজ করুন।'

ড. কানিজ আকলিমা সুলতানা বলেন, 'গ্রামের ছেলেরা ধর্ম ও জঙ্গিবাদের পার্থক্য বুঝতে পারে না। তাদের বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের ও মূল দায়িত্ব সরকারের। মামুনুল হকের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার একের পর এক প্রমাণের পর তার পক্ষের অনুসারীরা অন্ধ সমর্থন থেকে সরে আসছে। সরকারের দায়িত্ব বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, ইতিহাসভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে সাইবার জগতের জঙ্গি কার্যক্রম থেকে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করা।'

ধারণাপত্রে মারুফ রসুল বলেন, 'সারা পৃথিবীতেই সাইবার জগত এতোটাই বিস্তৃত হয়ে পড়েছে যে, এখনই যদি এর লাগাম আমরা ধরতে না পারি, তো ভবিষ্যতে তল খুঁজে পাবো না। এজন্য এ বিষয়ে স্বতন্ত্র অধিদপ্তর রাখা উচিত, যারা কেবল সাইবার জিহাদ মোকাবেলা করবেন। শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার তার উপস্থিতি নিশ্চিত করবে এবং এ বিষয়ে আইনি দিকগুলো মোকাবেলা করবে। গণমাধ্যমগুলোর ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেলের কমেন্ট সেকশন বর্তমানে সাইবার জিহাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র, তাই এ বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।'