ভাগ্যান্বেষণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে রাজধানীতে এসেছিলেন তিনি; এসেই প্রেমে পড়েন এক যুবকের। প্রেমের সম্পর্ক গড়ায় বিয়েতে। বিয়ের কয়েক বছর পর সেই স্বামীই পাচারকারী দলের কাছে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন তাকে।

নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে ভারতের চেন্নাইয়ে নির্যাতনের শিকার আরেক তরুণী সমকালকে জানিয়েছেন পাচারের ভয়াবহ এই ঘটনার কথা।

ভারত থেকে পালিয়ে আসার পর বৃহস্পতিবার রাতে ওই তরুণী তার স্বামী জাহিদুল ইসলাম রনিসহ পাচারকারী চক্রের ৯ জনকে আসামি করে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করেছেন। অন্য আসামিরা হলেন, নদী আক্তার ওরফে ম্যাডাম ওরফে ইতি, আনোয়ারুল, সুজন, জিয়া, সবুজ, সালমান, বিউটি ও আজহারুল।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক সমকালকে বলেন, তরুণীর স্বামী পাচারকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাকে একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে। ওই চক্রে যারা রয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

নির্যাতনের শিকার তরুণী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, জাহিদুল ইসলাম রনির সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুই বছর আগে তাদের বিয়ে হয। রনি রাজধানীর ট্রান্সসিলভা বাসের সুপারভাইজার। বিয়ের পর তরুণী জানতে পারেন- রনি নেশাগ্রস্ত। নিয়মিত বাসে যেতেন না। এ কারণে অভাব লেগেই থাকত সংসারে। 

সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে বিয়ের মাসখানেকের মধ্যে তিনি যাত্রাবাড়ীর কাজলায় একটি গার্মেন্টেসে চাকরি নেন। মাস শেষে বেতনের টাকা তিনি স্বামী রনির হাতে তুলে দিতেন। কয়েকদিন সংসার খরচ চালিয়ে বাকি টাকা মাদকের পেছনে খরচ করতেন স্বামী। মাসের ১০ দিন সংসার ভালো চললেও ২০ দিন ছিল টানাটানি।

২০১৯ সালে ওই তরুণীর গর্ভে সন্তান আসে। রনি তখন তার বেশ খেয়াল রাখেন এবং সুপারভাইজারের কাজটিও ঠিকঠাক মতো করেন। তখন সংসারের সব খরচ বহন করতেন রনি। তবে একদিন বাসে ডিউটি করার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। ফোন করলেও কোনো সাড়া পেতেন না স্বামীর। একপর্যায়ে সেই তরুণী বিষয়টি শাশুড়ি ও ননদকে জানান। পরে প্রতিবেশীকে নিয়ে তিনি যাত্রাবাড়ী ট্রান্স-সিলভা বাস কাউন্টারে যান। জানতে পারেন, তার স্বামী রনি নিয়মিত বাসে উিউটি করছেন এবং থাকেন মিরপুরে বাবার বাসায়।

পরে তিনি শ্বশুরবাড়ি যান। কিন্তু শাশুড়ি তাকে জানান, রনি সেখানে থাকেন না। অন্তঃস্বত্তা তরুণী তখন সেখানে থাকতে চাইলে শাশুড়ি নাকচ করে দেন। তরুণী তখন ফিরে আসেন যাত্রাবাড়ীর কাজলার বাসায়। দুই মাসের ঘর ভাড়া বাকি ও সংসার চালানোর মত টাকাও ছিল না হাতে। 

এজাহারে তরুণী উল্লেখ করেন, রনির বোন ফোন করে তাকে অনাগত সন্তান নষ্ট করে ফেলতে বলেন। এজন্য চিকিৎসা খরচ দেওয়ার কথা জানানো হয় তাকে।

তরুণীর বাবা দরিদ্র ভ্যানচালক। সন্তান নিয়ে সংসার তার জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে ভেবে সন্তান নষ্ট করতে রাজি হন তিনি। এ জন্য ননদের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে আট হাজার টাকা নেন এবং যাত্রাবাড়ীর সবুজ ছাতা ক্লিনিকে অপারেশন করে সন্তান নষ্ট করেন। এরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি মোহাম্মদপুরে চাঁদ উদ্যানে নানীবাড়ি চলে যান। 

কিছুদিন নানীর বাসায় থাকার পর সেই তরুণী শনির আখড়ায় এক বান্ধবীর বাসায় ওঠেন। আবার গার্মেন্টেসে কাজ নেন। তিন মাস পর রনি তাকে ফোন করে ক্ষমা চান। একপর্যায়ে আবার তারা ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেন। মাস চারেক পর সংসার ছেড়ে আবার চলে যান রনি। 

১২ দিনের মাথায় বাসায় ফিরে স্ত্রীকে জানান, ভারতে একটা বৃদ্ধাশ্রমে ৩০ হাজার টাকা বেতনে একশ' জন আয়া নেবে। স্ত্রীকে ভারতে চাকরি করার জন্য অনুরোধ করেন। চাকরি করলে তাদের আর অভাব থাকবে না বলেও জানান স্ত্রীকে। 

গত ২ জানুয়ারি রনি তার স্ত্রীকে হাতিরঝিলের মধুবাগে ভারতে চাকরিদাতা 'লেডি অফিসার’ নদীর কাছে নিয়ে যান। এরপর সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে  ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দেওয়া হয় একটি আধার কার্ড।

কলকাতা থেকে চেন্নাইয়ে নেওয়ার পর নির্যাতনের শিকার হন ওই তরুণী। তবে কৌশলে গত ১০ মে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তিনি। সমকালকে তিনি বলেন, চেন্নাইয়ে নেওয়ার পর বিউটি ও আজহারুল নামে দু'জন তাকে জানায়- রুমে গেস্ট আসবে, আমি যেন রেডি থাকি। তরুণী তখন নদী ম্যাডামকে ফোন করলে তারা ফোন কেড়ে নেয়। বিবস্ত্র করে মোবাইলে ছবি তোলে ও ভিডিও করে। এরপর জানায় তাদের কথা মতো কাজ না করলে বাংলাদেশে মা-বাবা ও পরিচিতদের কাছে সেই ছবি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। 

তরুণী বলেন, 'আমি তাদের হাত-পা ধরে নদী ম্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তারা জানায়- আমার স্বামী নদীর কাছে আমাকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। এরপর নদী ৭০ হাজার টাকায় তাদের কাছে আমাকে বিক্রি করেছে। তারা আমাকে একটি রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।' 

তিনি জানান, কলকাতার এক লোকের হাত-পা ধরে তিনি দেশে ফেরার কাকুতি-মিনতি করেন। লোকটি তাকে গোপনে ২০ হাজার রুপি দেন। গত ৩ মে ওই তরুণীকে ১০ দিনের জন্য একটি ম্যাসেজ সেন্টারে পাঠানো হয়। পরে সুযোগ বুঝে একদিন সেই ম্যাসেজ সেন্টারের জানালার কাঁচ ভেঙে পালান তরুণী। সেখান থেকে চলে আসেন কলকাতা এবং তারপর বাংলাদেশে।

ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে পাশবিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সূত্র ধরে সম্প্রতি বের হয়ে আসছে নারী পাচারের নানা তথ্য। 

সম্প্রতি আশরাফুল মন্ডল ওরফে বস রাফির নারী পাচার নেটওয়ার্কের কথা জানিয়েছে র‌্যাব। ওই নেটওয়ার্কে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় ৫০ সদস্য। তারা নানা প্রলোভনে নারীদের ফাঁদে ফেলে, কেউ গোপন আস্তানায় রেখে মাদক সেবনসহ অসামাজিক কার্যকলাপে বাধ্য করে, কেউ দালাল বা লাইনম্যান হিসেবে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়।