'আই অ্যাম বাংলাদেশি' নামে একটি পেজ ব্যবহার করেও নানা ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোয় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও বিতর্কিত সামিউল ইসলাম খান ওরফে সামি ওরফে সায়ের জুলকার নাইনসহ সাতজনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আসামি করা হয়েছে।
আলজাজিরায় বাংলাদেশ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে সামিকে উপস্থাপন করা হয়। এরপর তার নাম সামনে আসে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনেক আগে থেকে তিনি একজন বহুরূপী প্রতারক। র‌্যাবের হাতে একবার গ্রেপ্তারও হন। অনেক দিন ধরে বিদেশে বসে নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছেন তিনি।
'আই অ্যাম বাংলাদেশি' পেজ ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে এর আগে ১১ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হলেও পুলিশের প্রথম তদন্তে সামির সঠিক নাম-ঠিকানা ও পরিচয় বের করা যায়নি। তাই সামিসহ আটজনকে অব্যাহতি দিয়ে রমনা থানা পুলিশ চার্জশিট দিয়েছিল। এরপর আদালতের নির্দেশে মামলার অধিকতর তদন্ত করে সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।
দ্বিতীয় দফার তদন্তে কার্টুনিস্ট কিশোর ও সামি ছাড়াও দিদারুল ভূঁইয়া, মিনহাজ মান্নান ইমন, তাসনিম খলিল, আশিক ইমরান ও ওয়াহিদুন নবীকে আসামি করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণে লেখক মোশতাক আহমেদকে চার্জশিটভুক্ত করা হয়নি। আর অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন ও সাংবাদিক সাহেদ আলমকে অভিযোগপত্রের বাইরে রাখা হয়েছে। মামলায় নাম থাকলেও ফিলিপ শুমাখা নামের একজনের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। তাই তাকেও অভিযোগপত্রে রাখা যায়নি। বুধবার অভিযোগপত্রটি দাখিল করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিটিসির প্রধান ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, একজন ছাড়া সব অভিযুক্তের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তদন্তে তাদের যে ধরনের অপরাধ উঠে এসেছে, তার আলোকে আসামি করা হয়। যে সাতজনকে চার্জশিটভুক্ত করেছে, তারা সাইবার জগতে অনেক দিন ধরেই নানা বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে আসছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তরা 'আই অ্যাম বাংলাদেশি' পেজ ছাড়াও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি, করোনাভাইরাস সম্পর্কে গুজব ছড়িয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। এতে বলা হয়, চার্জশিটভুক্ত সাতজনের মধ্যে চারজন পলাতক। তারা হলেন- ওয়াহিদুন নবী, সামিউল ইসলাম, তাসনিম খলিল ও আশিক মোহাম্মদ ইমরান।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, 'আই অ্যাম বাংলাদেশি' ফেসবুক পেজের অন্যতম এডিটর ছিলেন 'আমি কিশোর'। রমনা থানাধীন ১২২/১ নম্বর বাসার চতুর্থ তলার সিঁড়ির পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে তাদের কর্মকাণ্ড ছিল। গত বছরের ৫ মে সেখানে অভিযান চালিয়ে কার্টুনিস্ট কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তার হেফাজত থেকে মোবাইল ফোনসেট, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ধরনের ২০০ সিডি জব্দ করা হয়। পরে তার ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটিং লিস্ট পরীক্ষা করে তাসনিম খলিল, সামিসহ কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। এরপর র‌্যাব বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা করে।
ওই মামলায় প্রথমে তিনজনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন- কার্টুনিস্ট কিশোর, মোশতাক আহমেদ ও দিদারুল ভূঁঁইয়া। তাদের মধ্যে মোশতাক কারাবন্দি থাকা অবস্থায় মারা যান। এরপর ওই মামলায় জামিনে মুক্তি পান কিশোর।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আলজাজিরায় সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরই সামির বর্তমান ও অতীতের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয় সামনে আসে। অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. আবদুল বাসেত খানের চার সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। শৈশব থেকে নানা অপকর্মে জড়ান সামি। ১৭ বছর বয়সের সময় একটি ট্র্যাকস্যুট চুরি করেছিলেন। ১৭ ইসিবিতে কর্মরত তৎকালীন মেজর ওয়াদুদের বিদেশ থেকে আনা ওই ট্র্যাকস্যুট চুরি করে ধরা পড়েন তিনি। অভিযোগ আছে, ২০০০ সালের জুলাই মাসে টাইগার অফিসার্স থেকে হাতির দাঁত চুরি করেন তিনি। এরপর তা চট্টগ্রামে নিউমার্কেটের অঙ্গনা জুয়েলার্সে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। বাবার চাকরির সুবাদে নিজেকে কখনও সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, কখনও ক্যাপ্টেন হিসেবেও পরিচয় দিতেন। নানা অপকর্মের জন্য সেনানিবাস এলাকায় অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধও ছিলেন সামি।
২০০৬ সালের ২০ জুলাই র‌্যাব-১-এর একটি দল কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে সামিকে গ্রেপ্তার করে। ভুয়া ক্যাপ্টেন পরিচয় দিয়ে প্রতারণার ঘটনায় ধরা পড়েন তিনি। তখন জানা যায়, সামি নিজেকে তানভীর মো. সাদাত খান হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তার কাছে ছিল 'র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন' লেখা একটি আইডি কার্ড। সেখানে লেখা ছিল 'তানভীর মো. সাদাত খান'। র‌্যাঙ্ক 'ক্যাপ্টেন'। কার্ডের অপর পাশে র‌্যাবের মনোগ্রাম ছিল। তার কাছে পাওয়া যায় কয়েকটি ব্যাংকের চেকের ফটোকপি। এসব চেকে র‌্যাব কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়। বর্তমানে সামি থাকেন হাঙ্গেরিতে।