বড় একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন তিনি। বেতন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। রক্তদানসহ নানা রকম স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন। ১০৯ বার রক্ত দিয়ে তিনি রয়েছেন সর্বোচ্চ রক্তদাতাদের তালিকায়। করোনাকালের শুরুতে আরও অনেকের মতো তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। নিজের বেতনের টাকায় উত্তরা ও বাড্ডা এলাকার শতাধিক পরিবারে পৌঁছে দেন এক সপ্তাহ চলার মতো খাদ্যপণ্য। সামষ্টিকভাবেও নেন নানা উদ্যোগ। কিন্তু করোনা সংকট অব্যাহত থাকার এক পর্যায়ে নিজের চাকরিই হারিয়ে ফেলেন সেই মানুষটি। পরিবারের খরচ মেটাতে তাকে এখন মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন ও বিভিন্ন গন্তব্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই তাতে চাহিদা মিটছে না তার। গত ঈদের আগে অন্য স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে তাকেই কিনা নিতে হয়েছে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য।
করোনার ধাক্কায় আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার এমন ঘটনা শুধু এটিই নয়। অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়া অনেক স্বেচ্ছাসেবক এখন নিজেই রয়েছেন বিপদে। কারও চাকরি চলে গেছে, কারও বন্ধ হয়েছে ব্যবসা। নিজের সংকটের কথা কাউকে মুখ ফুটে বলতেও পারছেন না উচ্চ, মধ্যম বা নিম্ন আয়ের এসব মানুষ। কেউ এখনও পুরোপুরি বেকার, আবার কেউ ছোটখাটো কাজ জোটাতে পারলেও তাতে বিশেষ সুবিধা হচ্ছে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশের মিডিয়া অ্যাডভোকেসি অফিসার সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন সমকালকে বলেন, করোনাকালে আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের অনন্য ভূমিকা দেখেছি। বরাবরের মতোই এ কাজের সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। তবে যখন তারা নিজেরাই দুর্দশাগ্রস্ত, তখন সরকারের দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে নজর দেওয়া উচিত। তাদের জন্য প্রণোদনামূলক কিছু করে কর্মসংস্থান বা স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ এসব মানুষ ভালো থাকলে যে কোনো দুর্যোগে বহু মানুষ সেবা পাবেন। আর তারা ঝরে গেলে এখানে একটি শূন্যতা তৈরি হবে।
করোনায় স্বেচ্ছাসেবা দেওয়া অনেকেই বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আবার ব্যক্তি উদ্যোগেও কাজ করেছেন অনেকে। তেমন বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই এখন কম-বেশি আর্থিক সমস্যাকবলিত। প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লিখিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাব্যবস্থাপকের (নাম প্রকাশ করা হলো না) বর্তমান আয় আগের বেতনের এক-চতুর্থাংশ মাত্র। তাও অনিয়মিত। কারণ তার নতুন কর্মস্থলের ব্যবসায়িক চুক্তি মূলত পাঁচ তারকা হোটেল ও এয়ারলাইন্সের সঙ্গে। দুই ক্ষেত্রেই এখন কাজের পরিমাণ খুব কম। অথচ ছেলেমেয়ের পড়ালেখার পেছনে তার ব্যয় কম নয়। তার ছেলে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী।
এমনই আরেকজন স্বেচ্ছাসেবী আসাদুল্লাহ আল গালিব। ষোল আনা গ্রুপে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। ছিল অনলাইনকেন্দ্রিক ব্যবসাও। করোনাকালে তিনি নানা রকম সেবা দিয়েছেন। প্রতিদিন রাতের বেলায় দুই-তিনশ প্যাকেট খাবার সরবরাহ করতেন ভাসমান মানুষ ও পথশিশুদের। তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হিউম্যান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গোপনে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দিয়েছে অনেক নিরুপায় মধ্যবিত্ত পরিবারে। বিনামূল্যে রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া ও দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ তাদের নিয়মিত কার্যক্রম। তবে করোনার ধাক্কায় তারও চাকরি চলে যায়। বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা। সম্প্রতি তিনি একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। তবে চুক্তিভিত্তিক কাজ হওয়ায় এখানে তার আয় খুবই কম। আর্থিকভাবে তিনিও বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
শুধু সচ্ছল নয়; স্বল্প আয়েরও অনেক মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন করোনাকালে। তাদেরই একজন দেলোয়ার হোসেন। ঢাকার কাফরুলের কচুক্ষেত এলাকায় তিনি তৈরি পোশাক ভ্যানে বিক্রি করতেন। দুঃসময়ে তিনি করোনা রোগীর চিকিৎসা পেতে সহায়তা, মৃতদের দাফন, অসহায়দের খাবার বিতরণের কাজ করেছেন। করোনার কারণে তার ব্যবসা বন্ধ; আছেন চরম অর্থকষ্টে। ঋণ করে চলছে সংসার। তবে এখনও তিনি রোগীদের সেবা দিয়ে চলেছেন।
স্বেচ্ছাসেবী ইয়াসির আরাফাতের গল্পটি অন্যরকম। নোয়াখালীতে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সামান্য আয়ে টেনেটুনে চলে সংসার। তবে আগে থেকেই রক্তদান কার্যক্রমে যুক্ত এ যুবক করোনাকালে সাধ্যমতো কাজ করেছেন। সাংগঠনিক উদ্যোগে অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। সহায়তা দিয়েছেন চিকিৎসাপ্রার্থীদের। অনেক দিন ধরে নিয়মিত কাজ জুটছে না বলে তিনি আছেন বিপাকে। এদিকে তার মা-বাবা দু'জনই অসুস্থ। তাদের চিকিৎসার জন্যও প্রয়োজন অর্থের।
প্রায় একই রকম গল্প ইসলামিক ফাউন্ডেশনের খণ্ডকালীন কম্পিউটার অপারেটর মাহমুদুল হাসান, একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ার নাভেল আকন ও হার্ডওয়্যার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মী মনিরুল ইসলামের। তারা সবাই সাধ্যমতো দাঁড়িয়েছেন অসহায় মানুষের পাশে। প্রথম দু'জন কাজ হারিয়ে এবং তৃতীয়জনও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংকটে রয়েছেন।
করোনাকালে নানামুখী সেবা দেওয়া বিডি আর্তসেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জুনায়েদ আহসান বলেন, বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো অনেকেই এখন দুর্দশাগ্রস্ত। করোনাকাল দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারছেন না অনেকে। এমন কিছু মানুষকে আর্তসেবার পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে এভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের জন্য সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন