বাংলাদেশ থেকে দুবাইকেন্দ্রিক নারী পাচারের অন্যতম রাঘববোয়াল চট্টগ্রামের আজম খান। দুবাইয়ে তিনটি ফোর স্টার ও একটি থ্রি স্টার হোটেলের মালিক তিনি। নারী পাচার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আজম কারাগারে। তবে প্রায় এক বছরেও দুবাইকেন্দ্রিক কারা কীভাবে আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য হয়ে সহযোগিতা করত, তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আট বছরের বেশি সময় নারী পাচার করে এলেও তিনি গত বছরের জুলাইয়ে দেশে ধরা পড়েন। এখন পর্যন্ত শুধু ইন্টারপোলকে চিঠি দিয়ে আজমের দুবাইয়ের সঙ্গীদের ব্যাপারে জানতে চেয়েছে পুলিশ। আজম খানের মানব পাচারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দেশ থেকে ভারতে নারী পাচারের আরেকটি চক্রের তৎপরতা সামনে এসেছে। তাদের সঙ্গে আজম খানের চক্রের কোনো সংশ্নিষ্টতা আছে কিনা, তাও এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত সংশ্নিষ্টরা।

দেশ থেকে নারী পাচারের পর দুবাইয়ে নিজের হোটেলের ড্যান্সবারে তাদের অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করাতেন আজম ও তার চক্র। তার চার সহযোগীও ধরা পড়েছে সিআইডির হাতে। তবে দেশে-বিদেশে চক্রের অনেক সদস্যই ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুবাইয়ে আজম খানের চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের নাম-পরিচয় ও স্থায়ী ঠিকানা জানতে ২ জুন ইন্টারপোলে চিঠি দেয় সিআইডি। তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হওয়ার পর এক তরুণী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। সেই নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ এবং পরবর্তী সেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়। দেখা যায়, অন্য এক নারীসহ কয়েকজন মিলে তরুণীটিকে নগ্ন করে পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে। মেয়েটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে তাকে ছেড়ে দেওয়ার মিনতি জানালেও কেউ কর্ণপাত করছে না। নিপীড়ক দলে থাকা রিফাজুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবুর পরিচয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশ পুলিশ। তার বাসা রাজধানীর মগবাজার এলাকায়। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণীর বাসা মগবাজারে। বাংলদেশ থেকে তরুণী পাচার করে ভারতে নিয়ে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এই চক্র ওই তরুণীসহ পাঁচ শতাধিক নারী পাচার করেছে। টিকটক হৃদয় ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। এ ঘটনার পর নারী পাচারের বিষয়টি আবার সামনে আসে।

নারী পাচারের তদন্তাধীন মামলাগুলো নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে তদন্ত সংশ্নিষ্টরা।

সিআইডির তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া অনেক আগের একটি নারী পাচার মামলায় আজম খানের পাশাপাশি মানব পাচারকারী হিসেবে হৃদয় নামে একজনের নাম রয়েছে। দুবাইয়ে পাচার হওয়া ভুক্তভোগী এক তরুণীর জবানবন্দিতেও হৃদয়ের নাম এসেছে। তবে হৃদয়ের পুরো নাম ও বাসার ঠিকানা এজাহারে নেই। এ কারণে তদন্ত সংশ্নিষ্টরা তাকে শনাক্ত করতে পারেনি। সিআইডি এখন ধারণা করছে, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া রিফাজুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবুই রূপগঞ্জ থানায় থাকা মামলার আসামি হৃদয় হতে পারে। কারণ, এখন পর্যন্ত নারী পাচারকারী হিসেবে একজন হৃদয়কেই শনাক্ত করা গেছে, যার বাসা মগবাজারে। তাহলে কি আজম খানের সহযোগী হিসেবেও এই হৃদয় কাজ করেছে। সে তরুণীদের দুবাইয়ে পাচারের জন্য তুলে দিয়েছে? এসব বিষয় সিআইডি খতিয়ে দেখছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা আজম খানের দুবাইয়ে থাকা হোটেলগুলো হলো- ফরচুন পার্ল হোটেল অ্যান্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল ফরচুন গ্র্যান্ড, হোটেল রয়েল ফরচুন ও হোটেল সিটি টাওয়ার। তার দুই ভাই নাজিম খান ও এরশাদ খান হোটেলের দায়িত্বে রয়েছেন। তারা এখনও দুবাইয়ে। সবকিছু দেখভাল করতেন আজম খান। হোটেলের নেপথ্যে ড্যান্সবার এবং যৌন ব্যবসা চলত। ড্যান্সবার ও যৌন কাজের জন্য দেশ থেকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের পাচার করা হতো। সেখানে নেওয়ার পর যৌন কাজে বাধ্য করানো হতো তরুণীদের। কেউ রাজি না হলে তাকে অন্ধকার রুমে আটকে রেখে দিনের পর দিন নির্যাতন চালানো হতো। পাচারের জন্য তরুণী সংগ্রহ করতে সারাদেশে অর্ধশতাধিক দালাল নিয়োগ করেছিলেন আজম খান। তার টার্গেট ছিল নিম্নবিত্ত পরিবারের সুন্দরী তরুণীরা। বিশেষ করে যে পরিবারে মেয়ের উপার্জনের টাকায় সংসার চলে, সেই তরুণীকে ফাঁদে ফেলতেন দুবাইয়ে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে। মেয়েদের আগে থেকে পছন্দ করতেন আজম খান। দেশে থাকলে সরাসরি কোনো অভিজাত হোটেলে নিয়ে দেখতেন অথবা দুবাইয়ে থাকলে ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন তিনি। পছন্দ হলেই পাচারের জন্য চূড়ান্ত করা হতো। প্রতি তরুণীর জন্য দালাল কমিশন পেত ১০ হাজার টাকা। গত বছরে কয়েকজন তরুণী হোটেল থেকেই দুবাইয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করে আজম খানের বিষয়টি জানান। এ কারণে আজমের পাসপোর্ট বাতিল করে দেয় দুবাই কর্তৃপক্ষ। পরে এক্সিট পাস নিয়ে আজম দেশে এসে নতুন করে পাসপোর্ট তৈরি করে অন্য দেশে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। গত বছরের জুলাই মাসে আজম খান ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার অন্য দু'জন হলেন- আল আমিন হোসেন ওরফে ডায়মন্ড ও আনোয়ার হোসেন ওরফে ময়না। পরে নির্মল ও নৃত্যশিল্পী ইভান শাহরিয়ার সোহাগকে গ্রেপ্তার করা হয়। নারী পাচারের ঘটনায় ২ জুলাই আজম খান ও তার সহযোগীদের আসামি করে লালবাগ থানায় মামলা করেন দুবাই থেকে উদ্ধার হয়ে আসা এক তরুণী।

মামলার তদন্ত সংশ্নিষ্ট সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম আক্তারুজামান সমকালকে বলেন, দুবাইয়ে আজমের হোটেলে যেসব বাংলাদেশি স্টাফ রয়েছে, তাদের নাম-পরিচয় ও স্থায়ী ঠিকানা জানার জন্য ইন্টারপোলে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।