রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক হাজি। ১৮ হাজার বর্গফুট জায়গা শিল্পকারখানার জন্য লিজ নিয়ে ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি পরিবারসহ সেখানে বসবাস করছেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্তৃপক্ষ তিনবার চিঠি দিয়েও তার পরিবারকে সরাতে পারেনি। উল্টো তার অভিযোগ, শিল্পনগরীর নেতা হওয়ায় অন্যায়ভাবে তার প্লট বাতিলের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।

শুধু আবদুল মালেক হাজি নন, তার মতো বেশ কয়েকজন মালিক শিল্পপ্লট বরাদ্দ নিয়ে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে ১১ জনকে পরিবারসহ অন্যত্র সরে যেতে চিঠি দিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ। আবদুল মালেক হাজির প্লটের বরাদ্দ বাতিল এবং অন্য ১০ জনকে সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়।

বিসিকের চিঠি পেয়ে বেবী আইসক্রিমের মালিক এহসানুল হক দুলু নিজের প্লটটি বিক্রি করেছেন গোল্ডেন অ্যালুমিনিয়ামের মালিক শহিদুল ইসলামের কাছে। নর্দার্ন এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুল জলিল তার প্লটটি শাহী ল্যাবরেটরির মালিক সামিউল হুদার কাছে বিক্রি করে আবাসিকতা ছাড়েন। এ ছাড়া বিসিকের চিঠি পেয়ে শিল্পনগরীর আবাসিকতা ছেড়েছেন রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক রেজাউল করিম রাজা ও রিফা সিল্ক্কের মালিক সুফিয়া খাতুন।

বিসিক সূত্র জানায়, আসিফ অ্যালফাবেটের মালিক লোকমান হোসেন, রাজ মেটালের মালিক রাসেল আহমেদ, লাকী বুটিকের মালিক লাকী খাতুন, আল মদিনা সিল্ক্কের মালিক আবুল হাসান, সুমী হোমিও হলের মালিক সুমী খাতুন, রাহী ইন্ডাস্ট্রির মালিক সেলিম আল রাহী ও খাজা আহমেদ ইন্ডাস্ট্রির মালিক হাসনা বেগমও শিল্পনগরীর প্লটে বছরের পর বছর বসবাস করছেন। এ ছাড়া পরিবার নিয়ে বিসিকের প্লটে বসবাস করছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও। শিল্পনগরীতে অবস্থিত বিএডিসির কোয়ার্টার, প্রসেসিং অফিস ও পরিত্যক্ত বীজ ভবনে তাদের বসবাস।

সম্প্রতি বিসিকের আবদুল মালেক হাজির মডার্ন ফুড কোম্পানির সামনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি শিশু কোম্পানি ভবনের সামনে খেলাধুলা করছে। এ প্রতিবেদককে দেখার পর তারা ভবনের ভেতরে চলে যায়। এ সময় ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন আবদুল মালেক হাজি ও তার ছেলে আবদুর রহমান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবদুল মালেক হাজি ১৯৭২ সালে ছয় হাজার বর্গফুট জমি মডার্ন ফুডের নামে লিজ নেন। ১৯৭৬ সালে আরও ৯ হাজার বর্গফুট জমি লিজ নেন মডার্ন টেক্সটাইল করার জন্য। পরে আরও তিন হাজার বর্গফুট জমি নেন আল আমিন ডাইংয়ের নামে। এর পর থেকেই তিনি সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

সম্প্রতি বিসিক কর্তৃপক্ষ আবদুল মালেক হাজির প্লট বরাদ্দ বাতিল করে পরপর তিনটি চিঠি দিয়ে পরিবার নিয়ে সরে যেতে নির্দেশ দেয়। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি তাকে চূড়ান্ত লাল নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে উল্লেখ আছে, 'প্লট বরাদ্দের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বরাদ্দকৃত প্লট শুধু শিল্পকারখানা স্থাপন ও চালু করার কাজে ব্যবহার হবে। অন্য কোনো কাজে প্লট ব্যবহার করা যাবে না। যেহেতু আপনি প্লট বরাদ্দপত্রের শর্ত ভঙ্গ করেছেন এবং আপনাকে একাধিকবার সুযোগ দেওয়া হলেও আপনি তা গ্রহণ করেননি, সে ক্ষেত্রে এ পত্রটি আপনার প্লট বাতিলের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ হিসেবে বিবেচিত হবে।'

এসব বিষয়ে আবদুল মালেক হাজির ভাষ্য, 'আমি মালিক সমিতির নেতা বলেই ষড়যন্ত্র করে এ চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার নানা সমস্যা নিয়ে আমাকে কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হয়। এসব কারণে তারা আমার ওপর ক্ষুব্ধ।'

তবে বিসিক শিল্পনগরীর উপমহাব্যবস্থাপক জাফর বায়েজীদ বলেন, অডিট আপত্তির মধ্যেই আবদুল মালেক হাজি পরিবার নিয়ে শিল্পনগরীতে যে থাকছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে কোনো ষড়যন্ত্র নেই।

আবদুল মালেক হাজির দাবি, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই আরও অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষ বসবাস করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসির কোয়ার্টারেও অন্তত ৩০টি পরিবারের বসবাস। তবে সরেজমিনে সেখানে চার/পাঁচটি পরিবার দেখা গেছে।

অ্যালফাবেট কোম্পানির মালিক লোকমান হোসেনও পরিবার নিয়ে শিল্পনগরীতে বসবাস করেন। তারও ভাষ্য, শিল্পকারখানার নিরাপত্তা না থাকায় তার পরিবার এখানে বসবাস করছে।

বিএডিসির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলুবীজ হিমাগারের কোয়ার্টারে সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান থাকেন। প্রসেসিং সেন্টারে উপপরিচালক মিজানুর রহমান পরিবার নিয়ে থাকেন। আলুবীজের পরিত্যক্ত ভবনে থাকেন বেশ কয়েকজন গাড়িচালক ও অন্য কর্মচারীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপপরিচালক হাসান তৌফিকুর রহমান বলেন, বিএডিসির কোয়ার্টার ও পরিত্যক্ত ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলো মেরামত করে তারা বসবাস করেন। তবে বিসিক কর্তৃপক্ষ শিল্পমালিকদের যেভাবে চিঠি দিয়েছে, সেভাবে বিএডিসিকে চিঠি দেয়নি। তারা আপত্তি করলে কেউ এখানে থাকবে না।

বিসিক শিল্পনগরীর উপমহাব্যবস্থাপক জাফর বায়েজীদ বলেন, বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বসবাসের অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সরিয়ে উৎপাদনের দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

বিসিক শিল্পনগরীর এস্টেট অফিসার ওয়ায়েস কুরুনী বলেন, তাদের নজরে ১১ জন প্লট মালিক পরিবার নিয়ে শিল্পনগরীতে বসবাস করছেন বলে তথ্য আছে। তাদের মধ্যে একজনের প্লট বাতিল করে চূড়ান্ত চিঠি এবং অন্যদের সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

নানাবিধ সংকট :নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনায় রয়েছে রাজশাহীর বিসিক শিল্পনগরী। সম্প্রতি শিল্পনগরী ঘুরে দেখা যায়, ভেতরের রাস্তাঘাট বেহাল। কোথাও কোথাও পিচ উঠে বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিস্কাশনের নালাগুলোর অবস্থাও করুণ। ময়লা-মাটিতে কয়েকটি নালা প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। শিল্পমালিকদের অভিযোগ, সুযোগ-সুবিধার অভাবে কেউ কেউ দেউলিয়া হওয়ায় কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

কারখানার মালিকরা বলছেন, এখানে তারা পর্যাপ্ত কাঁচামাল পান না। রাজশাহীর সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয়। ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের পর্যাপ্ত কাঁচামাল আনতে পারছেন না। কেউ কেউ আনলেও বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। এতে করে স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তাদের কাঁচামালের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

রাজশাহী বিসিকে প্রায় ১০০ একরের ওপর ২০২টি প্লট। তবে কারখানা রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ। এর মধ্যে ১৫-১৬টি কারখানা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।

শিল্পকারখানার মালিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। তারা দীর্ঘদিন ধরে আলাদা ফিডার লাইন দাবি করে এলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তা ছাড়া বিকেল ৫টার পর পিকআওয়ার ধরায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পানির বিলও বেশি। শিল্পনগরীর ভেতরে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির নিজস্ব গ্যাসলাইন নেই। ১০-১২টি কারখানা নিজস্ব উদ্যোগে গ্যাসলাইন সংযোগ নিয়েছে। নতুন সংযোগ নিতে খরচ বেশি হওয়ায় অন্য কারখানাগুলো গ্যাস সংযোগ নিচ্ছে না। অথচ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলে বিদ্যুতের চেয়ে তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি খরচ কমবে।

আগে একরপ্রতি জমির জন্য বিসিককে বার্ষিক ১২ হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ দেওয়া লাগত। এখন তা বাড়ানো হয়েছে, নেওয়া হচ্ছে বর্গফুট হিসাবে। এখন বর্গফুটপ্রতি এলাকার জন্য বার্ষিক সাড়ে তিন টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হচ্ছে। এই চার্জের সঙ্গে ভ্যাট হিসাবে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ টাকা দিতে হচ্ছে।

শিল্পনগরী শিল্পমালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, রাজশাহী বিসিকে নানা সংকট। এখানে সরাসরি রেললাইন বা নৌপথে যোগাযোগ নেই। বিমানেও পণ্য আনা-নেওয়া করার মতো কার্গো বিমান নেই। ফলে তারা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আনতে পারেন না, আবার উৎপাদিত পণ্যও সহজে সরবরাহ দিতে পারেন না। নিজস্ব পরিবহনে পণ্য আনা-নেওয়ায় খরচ বেড়ে যায়। তা ছাড়া সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাটের তুলনায় সেবা পাওয়া যায় না।

বিসিক শিল্পনগরী শিল্পমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের মোল্লা বলেন, বিসিকের চেয়ারম্যানসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে সমস্যাগুলো বেশ কয়েকবার জানিয়েছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনার চেয়ে রাজশাহীতে ভৌগোলিক কারণে উৎপাদন খরচ বেশি। ব্যবসায়িক যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় তারা ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ছেন।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর বায়েজীদ বলেন, গ্যাস সংযোগ চাইলেই যে কেউ নিতে পারবেন। সবাই গ্যাস সংযোগ নিলে খরচ কম পড়বে। কিন্তু সবাই গ্যাস সংযোগ নিতে চান না বলেই খরচ বেশি পড়ছে। বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটের সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চলছে।

বিষয় : বিসিক সমকালের আয়না

মন্তব্য করুন