বিসিকের কালুরঘাট পুরোনো শিল্পনগরীর প্রবেশমুখেই চোখে পড়বে বিশাল একটি প্লট। বিসিকের এ-১, ২, ৯, ১০ এবং সি- ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর প্লট নিয়ে এই প্লট গঠিত। আটটি প্লটের সমন্বয়ে গড়া এই প্লটের আয়তন ৮২ হাজার ৯৪১ বর্গফুট।

ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান থেরাপিউটিকস লিমিটেডের মালিকানাধীন বিশাল এই প্লটের একাংশে জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবন। ভবনটির পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। ভেঙে পড়ছে ভবনের দরজা-জানালাও। কারখানায় ঢুকতে অন্তত তিনটি প্রবেশদ্বার।

সরেজমিনে কারখানা ভবনের পূর্ব পাশে তালাবদ্ধ লোহার গেট দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, ভবনের এই অংশে জমে আছে হাঁটুপানি। কচুরিপানায় ভর্তি ভবনের পেছনের অংশ। কারখানার উত্তর পাশের সামনের অংশে মূল গেটসহ দুটি গেট রয়েছে। এই অংশেও কচুরিপানা আর ঝোপঝাড়ে ভরা বড়সর সমতল ভূমি। অনেকটা জলাবদ্ধ হয়ে থাকা এই অংশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে নাম না-জানা অনেক লতা-গুল্ম ও বৃক্ষরাজি। তাতে ফুটেছে ফুল। এমন ফুল পথচারীর মন জুড়ালেও কারখানাটি এখন একেবারে নীরব, নিস্তব্ধ; যেন ভূতুড়ে বাড়ি। ২০০৭ সাল থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে এই এক প্লটের মধ্যেই 'বেকার' পড়ে আছে বিসিকের অন্তত আটটি প্লট।

থেরাপিউটিকস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমআর সিদ্দিকী। পরে এটি কিনে নেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিল্পপতি এম মোরশেদ খান। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি রুগ্‌ণ হতে থাকে। গত এপ্রিলে কালুরঘাট শিল্প এলাকায় এই প্লটের মূল ফটকে গিয়ে দেখা যায়, চারজন গার্ড পাহারায়। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। প্লটটি থেরাপিউটিকস ফার্মাসিউটিক্যালসের হলেও সিকিউরিটি গার্ড সদস্যরা বেতন নিচ্ছেন টিকে গ্রুপ থেকে। থেরাপিউটিকসের গার্ডের বেতন টিকে দেবে কেন, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, অনেক আগেই হাতবদল হয়ে গেছে প্লটটি। থেরাপিউটিকসের হাত থেকে মালিকানা চলে গেছে টিকে গ্রুপের কাছে। কিন্তু অফিসিয়ালি বিষয়টি জানানো হয়নি বিসিক কর্তৃপক্ষকে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্লট বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী, প্রতি একর সমান প্লট হাতবদলের ক্ষেত্রে বিসিককে অর্থাৎ সরকারকে ১১ কোটি টাকা 'প্লট ট্রান্সফার ফি' দিতে হয়।

বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোরশেদ খান এখন দেশের বাইরে। তার অবর্তমানে থেরাপিউটিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন তার চাচাত ভাই এম সলিমুল্লাহ খান। তাকেই থেরাপিউটিকসের প্লট বিক্রির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়া হয়েছে।

সলিমুল্লাহ খান বলেন, বিসিকের কালুরঘাট শিল্পপার্কের প্লট তারা আর ধরে রাখছেন না। টিকে গ্রুপের সঙ্গে তাদের পাকাপাকি কথা হয়েছে। তারা কিছু অ্যাডভান্সও করায় প্লটের দখল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি অফিসিয়ালি তারা বিসিককে জানাননি।

বিসিকের কালুরঘাট পুরোনো শিল্পনগরীর তালিকায় বন্ধ ও রুগ্‌ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ১ নম্বরে থাকা থেরাপিউটিকস লিমিটেডকে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১৯৮১ সালে। সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করে কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস সামগ্রী উৎপাদন করা হয়েছিল। এক পর্যায়ে এটি 'রুগ্‌ণ' হতে হতে ২০০৭ সালে একেবারে বন্ধই হয়ে যায়। তখন থেকে এই কারখানায় যে তালা ঝুলছে সেটি এখনও খোলেনি। এটি আইএফআইসি ব্যাংকের মতিঝিল শাখার কাছে দায়বদ্ধ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৯ কোটি টাকার ওপরে। এ অবস্থায় প্লটটির ভাগ্য চলে গেছে টিকে গ্রুপের কাছে।

বিসিক সূত্র জানায়, কোনো প্লট বরাদ্দের পর সেই প্লটে বিনিয়োগের জন্য প্লট মালিক কোনো ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হলে বিসিক থেকে 'নো অবজেকশন সার্টিফিকেট-এনওসি' নিতে হয়। কোনো কারণে সেই প্লট মালিক অর্থাৎ মালিক কারখানা বন্ধ করে দিলেও ব্যাংকের আপত্তির কারণে প্লটের বরাদ্দ বাতিল করতে পারে না বিসিক। আর এই 'ফাঁদে' পড়ে রুগ্‌ণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও অনেক প্লটের বরাদ্দ বাতিল করতে পারছে না বিসিক কর্তৃপক্ষ। একই কারণে থেরাপিউটিকসের কারখানা বন্ধের পরও বরাদ্দ বাতিল করতে পারেনি তারা।

বিসিকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে বিসিকের শিল্পাঞ্চলগুলোতে যারা প্লটের মালিক তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী। তাই কারখানা বন্ধ থাকার পরও প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা যাচ্ছে না।

বিসিক চট্টগ্রাম জেলার উপ-মহাব্যবস্থাপক আহমেদ জামাল নাসের চৌধুরী বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো চালু করাই হচ্ছে বিসিকের মূল চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপরও মালিক পক্ষ চালু করতে ব্যর্থ হলে কেবল সেই শিল্প-কারখানার প্লট বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এ ধরনের ২২টি প্লট বাতিল করা হয়েছে।

কালুরঘাট শিল্পনগরীর সম্প্রসারিত অংশের বি-৪৫ ও ৪৬ নম্বর প্লটে গড়ে তোলা হয়েছে চয়েস ওয়াশিং প্লান্ট। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এসএম ফজলুল হক। ৬ হাজার ১৬২ বর্গফুটের সমন্বয়ে গঠিত এ প্লট বরাদ্দ মেলে ১৯৯৭ সালে। বিসিকের তালিকায় এটি এখন দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান। বস্ত্র ও বস্ত্রজাত এ প্রতিষ্ঠানটি মিউচুয়াল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দায়বদ্ধ হয়ে এখন বন্ধ। কারখানায় তালা ঝুলছে।

চয়েস ওয়াশিং প্লান্টের কর্ণধার ফজলুল হক বলেন, 'ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ নিয়ে জটিলতার কারণে ওয়াশিং প্লান্টটি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি। সাড়ে চার কোটি ঋণ নিয়েছি। সুদসহ প্রায় সাত কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। এরপরও ঋণ পরিশোধ তো হচ্ছেই না, উল্টো বেড়েই চলেছে। তবে আমরা কারখানা আবার চালু করতে চাই। কিন্তু ঋণদাদাতা ব্যাংকের যে সমস্যায় পড়েছি, সেটা কাটিয়ে উঠতে পারব কিনা সংশয় রয়েছে।'

শিল্পনগরীর অনেকটা মাঝামাঝি স্থানে একটি রাস্তার একপাশে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল লিমিটেড এবং আরেক পাশে সিঅ্যান্ডএ ফেব্রিক্স-২। বিসিকের ৭২ ও ৭৩ নম্বর প্লটে গড়ে তোলা সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলে ভূমির পরিমাণ ৯ হাজার ৪৫০ বর্গফুট। আর সিঅ্যান্ডএ ৪৯ ও ৫০ নম্বর প্লটে গড়ে তোলা সিঅ্যান্ডএ ফেব্রিক্সের ভূমি ৪ হাজার ৯৫০ বর্গফুট। প্রায় ৫ কোটি টাকা করে ঋণ নিয়ে দুটি কারখানাই ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার কাছে দায়বদ্ধ। দীর্ঘদিন ধরে কারখানা দুটি বন্ধ। কিন্তু ব্যাংককে এনওসি দেওয়ায় কারখানা দুটির বরাদ্দ বাতিল করতে পারছে না বিসিক।

সরেজমিনে দেখা গেল, ওয়েল গ্রুপের ওয়েল ফ্যাশনের বিশাল সুদৃশ্য একটি কারখানা ভবনে যখন কর্মযজ্ঞ চলছে, তখন পাশের এই দুই কারখানায় সুনসান নীরবতা। দীর্ঘদিনের অবহেলায় কারখানা ভবন দুটির জীর্ণদশা। সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলে প্রবেশমুখের বন্ধ দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে বের হন আবদুস সাত্তার নামের এক গার্ড। তিনি জানালেন, ঋণের মামলায় জেতায় কারখানাটি এখন ব্যাংকের সম্পত্তি। পাহারা দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বেতনও ব্যাংক থেকে দেওয়া হচ্ছে।

বিসিকের কালুরঘাট শিল্পনগরীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ভূমি কর্মকর্তা বলেন, 'সিঅ্যান্ডএ ফেব্রিক্‌স ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের মালিক চট্টগ্রামভিত্তিক দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন শিল্পপতির শ্যালক। যতদূর জানতে পেরেছি তিনি অনেক দিন ধরে দেশের বাইরে। তার সঙ্গে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি।'

সরেজমিনে থেরাপিউটিকস, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, সিঅ্যান্ডএ ফেব্রিক্স-২, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল লিমিটেড ও চয়েস ওয়াশিং প্লান্টের মতো প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ইফকো গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড, রণি টোয়াইনস লিমিটেড ও মেসার্স পারফিউম কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের কারখানায়ও।

এ ছাড়া এখানে বন্ধ আছে ওয়ার্ল্ড লাক এক্সেসরিজ লিমিটেড, বেঙ্গল ফ্রেন্ডস নিটিং লিমিটেড, মেসার্স এরাবিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা বিস্কুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মেসার্স ফেয়ার প্যাক লিমিটেড, কেটিএস টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এশিয়ান ওয়্যারস, একেবি টিউবস, রিগাল পলি লিমিটেড, রয়েল টেক (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও ফিলটোনিক্স (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এর বাইরে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাতিল করা হয়েছে শিল্পনগরীর সম্প্রসারিত অংশের তিন শিল্প-কারখানা। এগুলো হলো- মেসার্স রহমানিয়া এন্টারপ্রাইজ, সুলতানা থ্রেড ইন্ডাস্ট্রিজ ও মেসার্স এমএন ইউ ইন্ডাস্ট্রিজ।

বিষয় : চট্টগ্রাম বিসিক সমকাল সমকালের আয়না শিল্পনগরী

মন্তব্য করুন