পশ্চিবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে দরিদ্র প্রার্থী হিসেবে বিজেপির মনোনয়ন পান নির্মল ধাড়া। পেশা প্রাইভেট টিউশনি উল্লেখ করেন হলফনামায় তার সম্পত্তির পরিমাণ জানিয়েছিলেন ১৭০০ রুপি। পরবর্তীতে নির্বাচনে জিতে তিনি ইন্দাসের বিধায়ক নির্বাচিত হন। কিন্তু বিধায়ক হলেও তাকে টিউশনি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কারণ শিক্ষার্থী থেকে অভিভাবক— সকলেই তার পড়ানোর দক্ষতায় এতটাই মুগ্ধ যে কোনও ভালো শিক্ষক ঠিক না হওয়া পর্যন্ত তারা নির্মলকে ছাড়তে চাইছেন না।

ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাইভেট টিউটর থেকে নির্মলের বিধায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। এজন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া শহর থেকে ৯৫ কিলোমিটার দূরে কুশমুড়ি গ্রাম। খাল, বিল, পুকুরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া গোটা গ্রামের মানুষই অভাবি। আটপৌরে চেহারার কুশমুড়ি গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই তাই উচ্চশিক্ষা বিলাসিতার সামিল। সেই গ্রামের এক বর্গাচাষী নয়ন ধাড়া। নিজে বর্গাচাষী হলেও ছেলে নির্মল ধাড়াকে নিয়ে তিনি সবসময় বড় স্বপ্ন দেখতেন। চাইতেন ছেলে যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়। ছেলেও বাবার সেই স্বপ্ন বিফলে যেতে দেয়নি। একে একে স্কুল-কলেজ শেষ করে নির্মল পড়েছেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করে ফিরেছেন নিজ গ্রামেই। এরপর গ্রামেই শুরু করেন প্রাইভেট টিউশনি। কিন্তু কখনই তিনি বিধায়ক হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেননি।

নির্মল বলেন, আমায় অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছেন বাবা। আমাকেও কষ্ট করতে হয়েছে। দরকার থাকলেও প্রাইভেট টিউশন নিতে পারিনি। সেই রকম কষ্ট যাতে কুশমুড়ির শিক্ষার্থীদের না হয় তাই খুবই কম টিউশন ফি নিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াতে শুরু করি। একটা সময় ওটাই পেশা হয়ে যায় নির্মলের। এর মধ্যেই নরেন্দ্র মোদির প্রতি একটা টান তৈরি হয় নির্মলের। সেই টানেই বিজেপি করতে শুরু করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।

বিধায়ক নির্মল জানান, বিধানসভার বেতন শুরু হয়ে গেলে নিজের গ্রামে একটা অবৈতনিক টিউটোরিয়াল সেন্টার খুলবেন তিনি। তিনি বলেন, ভেবেছি, ওই টিউটোরিয়াল সেন্টারে বেতন দিয়ে গ্রামের শিক্ষিত ছেলেদেরই শিক্ষক হিসেবে রাখব। কিন্তু যারা পড়বে তাদের কোনও বেতন দিতে হবে না। এতে অনেকের রোজগার হবে। বাকিদের হবে লেখাপড়া।

ইংরেজির ছাত্র হলেও নির্মল বাংলা, ইতিহাস, ভূগোলও পড়ান ছাত্রছাত্রীদের। শিক্ষার্থীরাও খুশী এমন শিক্ষককে পেয়ে। দশম শ্রেণির ছাত্রী সুলেখা বড়া বলেন, সেই ক্লাস ফাইভ থেকে স্যারের কাছে পড়ছি। খুব ভালবেসে পড়ান। স্যার এমএলএ হয়ে গেছেন বলে ভালো লাগছে। কিন্তু তার কাছে পড়ার সুযোগ পাব না ভাবলেই মন খারাপ লাগছে।

নির্মলের ছাত্রী পারমিতার বাবা অসিত মাঝি বলেন, নির্মল আমাদের গর্ব। আমার মেয়েকে তার হাতে দিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম। এখন উনি যদি টিউটোরিয়াল সেন্টার তৈরি করেন, তার পাশে থাকব।

শিক্ষকতা ছাড়াও বিধায়ক নির্মলের আরও গুণ আছে। ফুটবল থেকে ক্রিকেট, গ্রামের সব টিমেই ভরসার খেলোয়াড় তিনি। ভালো বক্তা হিসেবেও খ্যাতি তৈরি হয় বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পরে।

নির্মল বলেন, দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছি। কিন্তু এখন বিধায়ক হয়েছি বলে অতীত ভুলে যেতে চাই না। গোটা বিধানসভা এলাকার দায়িত্ব সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের গ্রামের মানুষের সঙ্গেও থাকব। মাঠে নেমে খেলতে না পারলেও মাঠের পাশেই থাকব বলেও জানান তিনি।

বিষয় : বিধানসভা নির্বাচন প্রাইভেট টিউটর বিধায়ক

মন্তব্য করুন